Saturday, 4 October 2008
সূরা কাফিরূন
হজরত ইবনে আব্বাস থেকে তিবরানী ও ইবনে আবী হাতেম বর্ণনা করেছেন, একবার কুরায়েশেরা রসুল স.কে আহ্বান জানালো এবং বললো, মোহাম্মদ! শোনো, আমরা তোমাকে এতো ধন-সম্পদ দিবো, যাতে করে তুমি হয়ে যেতে পারো মক্কার সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদপতি। আর যে রমণীকে তুমি বিয়ে করতে চাও, তার সঙ্গেই আমরা তোমাকে দিবো পরিণয়বদ্ধ করে। বিনিময়ে আমরা শুধু চাই, তুমি আমাদের দেব-দেবীদের দুর্নাম করবে না। অথবাঃ এক বৎসর তুমি আমাদের দেব-দেবীদের উপাসনা যদি করো, তবে পরের বছর আমরা উপাসনা করবো তোমার আল্লাহ্র। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের মধ্যে আর কোনো দ্বন্দ্ব ফ্যাসাদ থাকবে না। রসুল স. বললেন, দেখি! আমার পরম প্রভুপালয়িতা এ সম্পর্কে কী নির্দেশ দান করেন। ওয়াহাবের বক্তব্যানুসরণে আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, কুরায়েশরা বলেছিলো, তোমার ও আমাদের মধ্যে মীমাংসা হোক এভাবেঃ এক বছর তুমি আমাদের মাবুদ গুলোর ইবাদত করো, আর এক বছর তোমার আল্লাহ্র ইবাদত করবো আমরা। এভাবেই বছরের পর বছর বেঁচে থাকতে পারে আমাদের উভয়ের ধর্মমত।
সাঈদের বর্ণনা থেকে ইবনে আবী হাতেম উল্লেখ করেছেন, একবার ওলীদ ইবনে মুগীরা, আস ইবনে ওয়াইল, আসওয়াদ ইবনে আবুল মুত্তালিব এবং উমাইয়া ইবনে খালফ রসুল স. সকাশে উপস্থিত হয়ে প্রস্তাব রাখলো, মোহাম্মদ! এসো আমরা এক সঙ্গেই সব করি। পূজা করি আমাদের দেব-দেবীদের এবং তোমার আল্লাহ্র। তাদের এমতো অপবচনের প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়ঃ
সূরা কাফিরূনঃ আয়াত ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬
১. বল, ‘হে কাফিররা!
২. ‘আমি তাহার ‘ইবাদত করি না যাহার ইবাদত তোমরা কর
৩. এবং তোমরাও তাঁহার ইবাদতকারী নহ যাঁহার ইবাদত আমি করি,
৪. ‘এবং আমি ইবাদতকারী নহি তাহার, যাহার ইবাদত তোমরা করিয়া আসিতেছ।
৫. ‘এবং তোমরাও তাঁহার ইবাদতকারী নহ, যাঁহার ইবাদত আমি করি।
৬. ‘তোমাদের দীন তোমাদের, আমার দীন আমার।’
প্রথমে বলা হয়েছেঃ ‘ক্বুল ইয়া আয়্যুহাল কাফিরূণ’। একথার অর্থঃ হে আমার রসুল! আপনি তাদেরকে সম্বোধন করে বলুন, হে সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীরা! এভাবে এখানে সম্বোধন করতে বলা হয়েছে তাদেরকে, যারা রসুল স. এর কাছে উত্থাপন করেছিলো সত্য-মিথ্যার মিশ্রণের প্রস্তাব। আল্লাহ্পাক জানতেন, তারা চিরসত্যপ্রত্যাখ্যানকারী। তাই তিনি রসুল স. কে এখানে সম্বোধন করতে বলেছেন এভাবে।
পরের আয়াতে বলা হয়েছেঃ ‘আমি তার ইবাদত করি না, যার ইবাদত তোমরা করো’(২)। একথার অর্থঃ তোমরা ইবাদত করো অলীক দেব-দেবীদের। ওরকম অযথার্থ ইবাদত তো আমি করি না। করবোও না কোনো কালে। এখানে বক্তব্যটির শুরুতে ব্যবহার করা হয়েছে নেতিবাচক ‘লা’। এভাবে এখানে একথাটিই বুঝানো হয়েছে যে, অংশীবাদিতা ও বিশ্বাসের মিশ্রণ চিরনিষিদ্ধ। বায়যাবী লিখেছেন, শুধু ‘লা’ (না) ভবিষ্যতকালার্থক। অর্থাৎ এখন যা হচ্ছে না, তা ভবিষ্যতেও হবে না।
এরপরের আয়াতদ্বয়ে বলা হয়েছেঃ ‘এবং তোমরা তার ইবাদতকারী নও, যার ইবাদত আমি করি (৩) এবং আমি ইবাদতকারী নই তার, যার ইবাদত তোমরা করে আসছো’ (৪)। এই বক্তব্যটিও ভবিষ্যতকালজ্ঞাপক। অর্থাৎ আমি যে এক-একক-অবিভাজ্য সত্তার ইবাদত করি, তাঁর ইবাদত তোমরা যেমন এখন করো না, তেমনি করবে না ভবিষ্যতেও।
‘মান’ শব্দটি ব্যবহৃত হয় বিবেকসম্পন্নদের ক্ষেত্রে এবং বিবেকহীনদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় ‘মা’। কিন্তু এখানে বিবেকবানদের ক্ষেত্রে ‘মা’ ব্যবহৃত হয়েছে কেবল শাব্দিক সামঞ্জস্য রক্ষাকল্পে। অর্থাৎ এখানে ‘মা’ আনা হয়েছে আগের আয়াতের ‘মা’ এর সঙ্গে সমতা রক্ষার্থে। এভাবে লক্ষ্য রাখা হয়েছে কেবল পারসরিক উপাস্যের গুণাগুণের প্রতি। বিবেকবান-বিবেকহীনের প্রসঙ্গটিকে সামনে আনা হয়নি। ‘মা’ এখানে ব্যবহৃত হয়েছে ধাত্যর্থে। এভাবে বক্তব্যটি দাঁড়িয়েছেঃ আমি যেমন কোনোদিন তোমাদের কাল্পনিক দেব-দেবীদের পূজা করবো না, তেমনি তোমরাও কোনোদিন আরাধনা করবে না মহাসৃষ্টির মহাপ্রভুপালয়িতার।
এরপরের আয়াতে (৫) বলা হয়েছেঃ ‘এবং তোমরাও তাঁর ইবাদতকারী নও, যাঁর ইবাদত আমি করি’। বাক্যটি আগের বাক্যেরই পুনরাবৃত্তি। অধিকাংশ ভাষাবিদ বলেন, কোরআন যেহেতু আরবী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে, সেহেতু এর প্রকাশভঙ্গি হবে আরবী ভাষার রীতি অনুসারেই। সম্বোধনরীতিও হবে তেমনই। আর আরবীতে বার বার একই কথা বলা হয় বক্তব্যের গুরুত্ব প্রকাশার্থে। যেমন বাক্যসংকোচনের উদ্দেশ্য থাকে বক্তব্যসংক্ষেপণ। এখানেও সেরকমই করা হয়েছে। কুরতুবী বলেছেন, এখানে একত্ববাদ ও বহুত্ববাদের বক্তব্যগত সম্মিলন ঘটার ফলে বাক্যগুলিও হয়ে পড়েছে পুনরাবৃত্তিমূলক। কেননা বক্তব্যটি এসেছে কাফের কুরায়েশদের একটি নির্দিষ্ট অপপ্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে। তারা বলেছিলো, একবছর আমরা হবো বহুত্ববাদী, আর এক বছর একত্ববাদী। কিন্তু এরকম হওয়া যে কোনোক্রমেই সম্ভব নয়, সে কথাটিও এখানে বার বার উচ্চারণ করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরকমও বলা হয়েছে যে, প্রতিটি বাক্যের প্রথম ‘মা’ যোজক এবং পরের ‘মা’ ধাতুমূলক। অর্থাৎ উপাস্যের একিভূতী এবং ইবাদতের একিভূতীর অবাস্তবতা বুঝানোই এখানে উদ্দেশ্য।
শেষোক্ত আয়াতে (৬) বলা হয়েছেঃ ‘তোমাদের দ্বীন তোমাদের, আমার দ্বীন আমার’। এই আয়াতের দু’টি বাক্যই বিজ্ঞপ্তিমূলক। কিন্তু এমতো ভাবনার কোনো অবকাশ নেই যে, বক্তব্যটির (তোমাদের দ্বীন তোমাদের) দ্বারা এখানে কাফেরদের কুফরীর ব্যাপারে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, অথবা মুসলমানদেরকে জেহাদ করতে নিষেধ করা হয়েছে। বরং বলা যেতে পারে, এই আয়াতে প্রকাশ করা হয়েছে পূর্ববর্তী বক্তব্যের গুরুত্ব ও পরিণতিকে। সুতরাং এই আয়াত দ্বারা জেহাদের আয়াতকে রহিত করা হয়েছে, এরকম ভাবা যেতেই পারে না। কুফরী যেহেতু কল্যাণকর নয়, সেহেতু এরকম চিন্তাও অসমীচীন যে, সমঝোতার মাধ্যমে এখানে ইমানদার ও কাফেরদেরকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে স্ব স্ব অবস্থানে থাকতে। তাই তো আমরা দেখতে পাই, এর পরেও রসুল স. বার বার কাফের কুরায়েশদেরকে ইমান ও ইসলামের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তারা তাঁকে এবং তাঁর প্রিয় সহচরবর্গকে দিয়েছে নানা প্রকারের যাতনা। সুতরাং আলোচ্য আয়াতের মর্মার্থ এরকম হওয়াই সমীচীন যেঃ তোমরা প্রতিফল লাভ করবে তোমাদের কৃতকর্মের এবং আমি লাভ করবো আমার কৃতকর্মের প্রতিফল।
ইতোপূর্বে সুরা যিলযালের তাফসীরের একস্থানে হজরত আনাস ও হজরত ইবনে আব্বাসের এক হাদিসে বলা হয়েছে, রসুল স. বলেছেন, পুণ্যের দিক দিয়ে সুরা কাফিরূন সমগ্র কোরআনের এক চতুর্থাংশের সমান। জননী আয়েশা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, কতোই না উত্তম হতো, যদি ফজরের দুই রাকাত সুন্নত নামাজে পাঠ করা হতো সুরা কাফিরূন এবং সুরা ইখলাস। ইবনে হিশাম। ওরওয়া ইবনে নওফেল ইবনে হজরত মুয়াবিয়া বর্ণনা করেছেন, আমার পিতা একবার রসুল স.কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, হে আল্লাহ্র বার্তাবাহক! আমাকে এমন একটি সুরা শিক্ষা দিন, যা আমি পাঠ করতে পারি রাতে শয্যাগ্রহণকালে। তিনি স. বলেছিলেন, সুরা কাফিরূন পাঠ করো। কেননা এতে রয়েছে অংশীবাদিতার প্রতি তীব্র অনীহা।
হজরত যোবায়ের বর্ণনা করেছেন, রসুল স. একবার আমাকে বললেন, তুমি কি চাও, প্রবাসকালে তোমার বাসস্থান হোক সর্বোন্নত এবং পাথেয় হোক সর্বাধিক? আমি বললাম, অবশ্যই। তিনি স. বললেন, সর্বদা পাঠ কোরো সুরা কাফিরূন, ইখলাস, নাসর, ফালাক্ব ও নাসঃ এই পাঁচটি সুরা। আর প্রতিটি সুরা আবৃত্তির শুরু থেকে শেষে পাঠ কোরো বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম। হজরত যোবায়ের বলেছেন, আমি ছিলাম বিত্তশালী। কিন্তু প্রবাসে আমি হয়ে যেতাম দুর্দশাকবলিত। পাথেয় হয়ে যেতো নিঃশেষ। কিন্তু যখন থেকে প্রবাসকালে আমি এই পাঁচটি সুরা পাঠ করতে শুরু করলাম, তখন থেকে দুর্দশা আমার নাগাল পেতো না। পাথেয় থাকতো প্রচুর। গৃহে প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত আমি প্রাচুর্যের মধ্যেই থাকতাম।
হজরত আলী বলেছেন, একবার রসুল স.কে দংশন করলো একটি বৃশ্চিক। তিনি স. সঙ্গে সঙ্গে লবণ ও পানি আনতে বললেন। আর ক্ষতস্থানে লবণ পানি প্রবাহিত করে দিতে দিতে দম করতে লাগলেন সুরা কাফিরূন, সুরা ফালাক, সুরা নাস পড়ে পড়ে। আল্লাহই সমধিক অবগত।
Friday, 3 October 2008
সূরা নাসর
তৃতীয় আয়াতে বলা হয়েছেঃ ‘তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কোরো এবং তাঁর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা কোরো, তিনি তো তওবা কবুলকারী’।
এখানে ‘ফাসাব্বিহ্ বিহামদি রব্বিক’ অর্থ তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কোরো। কথাটি প্রথম আয়াতের ‘যখন’ (ইজা) শর্তের পরিণতি। আর এখানকার ‘বিহামদি’ কথাটির সম্পর্ক রয়েছে একটি অনুক্ত ক্রিয়ার সঙ্গে। এভাবে কথাটি দাঁড়ায়ঃ হে আমার প্রিয়তম নবী! আপনি তখন পাঠ করুন ‘সুবহানাল্লহি ওয়া বিহামদিহী’। অর্থাৎ আল্লাহ্ আপনাকে যে অচিন্তনীয় মহাবিজয় দান করে আপনাকে অনুগৃহীত করলেন, তার জন্য আপনি বর্ণনা করুন তাঁর প্রশংসা, পবিত্রতা ও মহিমা।
হজরত আনাস বলেছেন, মহানবী স. যখন মহাবিজয়ীর বেশে মক্কা নগরীতে প্রবেশ করেছিলেন, তখন জনতা তাঁর অতুলনীয় মর্যাদা ও সম্ভ্রম দর্শন করে বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলো। আর তিনি স. এ দৃশ্য দেখে মনে মনে আল্লাহ্কে জানাচ্ছিলেন অসংখ্য কৃতজ্ঞতা, যা প্রকাশ পাচ্ছিলো তাঁর বাহ্যিক অবয়বেও। তিনি স. তাঁর মস্তক মোবারক করে রেখেছিলেন নিম্নমুখী। মনে হচ্ছিলো তা বুঝি স্পর্শ করে আছে উটের গদি। অত্যুত্তম সূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন হাকেম। হজরত আবু হোরায়রা থেকে আবু ইয়ালা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. এর সবিনয় অবনমিত মস্তক তখন স্পর্শ করেছিলো তাঁর উটের আসনের মধ্যবর্তী স্থান। আর যখন লোকেরা দলে দলে এসে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করলো, তখন তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে উচ্চারণ করেছিলেন, হে আমার পরমতম আরাধ্য! পারলৌকিক জীবনই হচ্ছে প্রকৃত জীবন।
‘ওয়াস্তাগফিরহু’ অর্থ এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কোরো। একথার অর্থঃ হে আমার প্রিয়তম রসুল! আপনি আপনার উম্মতের প্রতি অতিমমতাময়তার কারণে কখনো কখনো অত্যুৎকৃষ্ট আমল ছেড়ে গ্রহণ করেছিলেন কেবল উৎকৃষ্ট আমলকে, আপনার অতুলনীয় মর্যাদার পক্ষে যা ছিলো কিঞ্চিত অনুত্তম। সে কারণে আপনি আজ আমা সকাশে মার্জনাপ্রার্থনা করুন। অথবাঃ আপনি ক্ষমাপ্রার্থনা করুন আপনার উম্মতের জন্য। কেননা তাদের মধ্যে অনেকেই তো হবে গোনাহ্গার। উল্লেখ্য, এমতো নির্দেশনার কারণেই রসুল স. প্রতিদিন সত্তরবার ক্ষমাপ্রার্থনা করতেন। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে একশতবার ক্ষমা প্রার্থনা করার কথা। এরূপ হাদিস হজরত আবু হোরায়রা, হজরত আনাস এবং হজরত শাদ্দাদ ইবনে আউস থেকে বর্ণনা করেছেন বোখারী, নাসাঈ, ইবনে মাজা, তিবরানী ও আবু ইয়ালা।
লক্ষণীয়, এখানে ক্ষমাপ্রার্থনা করার আগে উল্লেখ করা হয়েছে প্রশংসাসহ পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করার কথা। বিষয়টি বিসদৃশ মোটেও নয়। কেননা এটাই হচ্ছে অবরোহণের (নুজুলের) প্রকৃত পদ্ধতি। আর এমতো পদ্ধতি কার্যকর করতে গেলে কিছু না কিছু ভুল হতেই পারে। তাই সব শেষে বলা হয়েছে ক্ষমা প্রার্থনার কথা। উল্লেখ্য, এভাবে এখানে রসুল স.কে লক্ষ্য করে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে ম�লত তাঁর উম্মতকেই। তবে উম্মতের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার সুন্নত পদ্ধতি হচ্ছে, প্রার্থনার পূর্বে পাঠ করে নিতে হবে দরূদ শরীফ।
‘ইন্নাহু কানা তাও্ওয়াবা’ অর্থ তিনি তো তওবা কবুলকারী। অর্থাৎ আল্লাহ্ ক্ষমাপ্রার্থীদের প্রার্থনা গ্রহণকারী তখন থেকে, যখন থেকে তিনি তাদের উপরে চাপিয়ে দিয়েছেন আমানত বহনের ভার। ছায়লাবী লিখেছেন, রসুল স. এর কণ্ঠে একবার এই আয়াতের পাঠ শুনে হজরত ইবনে আব্বাস কেঁদে ফেললেন। তিনি স. জিজ্ঞেস করলেন, কাঁদলে কেনো? তিনি জবাব দিলেন, এই সুরায় তো রয়েছে আপনার মহাতিরোধানের সংবাদ। তিনি স. বললেন, তুমি ঠিকই বলেছো। বায়যাবী লিখেছেন, এই সুরায় বলা হয়েছে ইসলামের আহ্বানের পরিপূর্ণতার কথা। সে কারণেই বলা হয়, এখানে রয়েছে রসুল স. এর অন্তিমযাত্রার সংবাদ। অন্য এক আয়াতে বিষয়টি প্রকাশ করা হয়েছে এভাবে ‘আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম....’। আর এখানকার ‘ক্ষমাপ্রার্থনা করো’ কথাটির মধ্যে সুস্পষ্টরূপে একথাটি ফুটে উঠেছে যে, তাঁর মহা অভিযাত্রা সন্নিকটবর্তী।
বোখারী বর্ণনা করেছেন, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, মান্যবর ওমর আমাকে মহান বদরযোদ্ধাগণের অন্তর্ভূত বলে মনে করতেন। একবার এক সাধু পুরুষ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি একে বদর যোদ্ধাগণের মধ্যে গণনা করেন কেনো? এতো আমাদের সন্তানদের বয়সী। ওমর জবাব দিলেন, আপনারা যাদেরকে ভালো বলে জানেন, এতো তাদেরই দলের। তিনি আরো বলেছেন, একবার খলিফা ওমর বদর যোদ্ধাদেরকে নিমন্ত্রণ দিলেন। তার সঙ্গে নিমন্ত্রণ জানালেন আমাকেও। সর্বসমক্ষে আমার পরিচয় তুলে ধরাই ছিলো তাঁর এমতো নিমন্ত্রণের উদ্দেশ্য। পানাহারপর্ব শেষে তিনি নিমনি�ত অতিথিবর্গকে উদ্দেশ্য করে বললেন, বলুন তো দেখি, সুরা নাসর সম্পর্কে আপনারা কে কী জানেন? একজন বললেন, যেহেতু আল্লাহ্ আমাদেরকে সাহায্য করেছেন এবং বিজয় দান করেছেন, সেহেতু আমাদেরকে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনার। আর একজন বললেন, আমি এ সম্পর্কে কিছুই জানি না। অন্যেরা রইলেন নীরব। শেষে মান্যবর খলিফা আমাকে বললেন, এবার তুমি কী জানো, বলো। আমি বললাম, সুরাখানি রসুল স. এর মহাতিরোভাবের ইঙ্গিতবাহী, আল্লাহ্ এখানে তাঁর রসুলকে জানাচ্ছেনঃ হে আমার প্রিয়তম রসুল! আমার সাহায্য সমাগত। মক্কাবিজয়ও সুসম্পন্ন। সুতরাং আপনি আল্লাহ্র সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করুন, তাঁর সকাশে ক্ষমাপ্রার্থনা করুন আপনার প্রিয় উম্মতের জন্য, যিনি পরম ক্ষমাপরবশ ও ক্ষমাপ্রার্থীদের প্রার্থনা গ্রহণকারী। আর আপনি প্রস্তুতি গ্রহণ করুন পরকালযাত্রার। সে পরমলগ্ন যে অত্যাসন্ন। খলিফা মহোদয় আমার কথা শুনে বললেন, বৎস! তুমি যা জানো, আমিও তা-ই জানি।
ইমাম আহমদের বর্ণনায় এসেছে, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, যখন সুরা ‘ইজা জ্বাআ’ অবতীর্ণ হলা, তখন রসুল স. আমাকে একানে� ডেকে বললেন, আমাকে এবার অন্তিমযাত্রার সংবাদ দেওয়া হলো।
হজরত আনাস থেকে তিরমিজি বর্ণনা করেছেন, সুরা ‘ইজা জ্বাআ নাসরুল্লহ্’ সমগ্র কোরআনের এক চতুর্থাংশ। জননী আয়েশা থেকে বোখারী উল্লেখ করেছেন, রসুল স. তাঁর রুকু ও সেজদায় পাঠ করতেন ‘সুবহানাকা আল্লহুম্মা ওয়া বিহামদিকা আল্লহুম্মাগ্ফির’। তাঁর নিকট থেকে মুসলিম বর্ণনা করেছেন, রসুল স. অত্যধিক পরিমাণে পাঠ করতেন ‘সুবহানাল্লহি ওয়া বিহামদিহী আস্তাগফিরুল্লহা ওয়া আতূবু ইলাইহি’। রসুল স. বলেছেন, আমার পরম প্রভুপালয়িতা আমাকে বললেন, অচিরেই আপনি আপনার উম্মতের মধ্যে দেখতে পাবেন একটি নিদর্শন। তখন পাঠ করবেন ‘সুবহানাল্লহি ওয়া বিহামদিহী আস্তাগফিরুল্লহা ওয়া আতূবু ইলাইহি’। আমি সে নিদর্শন প্রদর্শন করেছি। আর তা হচ্ছে ‘ইজা জ্বাআ নাসরুল্লহি...... ইন্নাহু কানা তাওওয়াবা’। হাসান বসরী বলেছেন, যখন রসুল স. এর অন্তিমযাত্রার সময় হলো, তখন আল্লাহ্পাক তাঁকে জানালেন, আপনার শেষ বিদায়ের সময় অতীব সন্নিকটবর্তী। সুতরাং আপনি অধিক হারে বর্ণনা করতে থাকুন আমার সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা। অভিমুখী হন কেবল আমার, যেনো আপনার পৃথিবীর জীবনের সমাপ্তি ঘটে অত্যুত্তম পুণ্যসম্ভার সহযোগে। নিশ্চয় আমি আমার প্রতি অভিমুখীদেরকে গ্রহণ করি পরম সমাদরে। কাতাদা ও মুকাতিল বলেছেন, এই সুরা অবতীর্ণ হওয়ার পর রসুল স. পৃথিবীর আলো-ছায়ায় বাস করেছিলেন আর মাত্র দুইটি বছর।
সূরা নাসর
রসুল স.এর প্রিয় পিতৃব্য হজরত আব্বাস ছিলেন হাজীদের পানি পান করানোর দায়িত্বে। তিনি ওই সময় বেরিয়ে পড়েছিলেন মক্কা থেকে। উদ্দেশ্য ছিলো হিজরত। সৌভাগ্যবশত তিনি রসুল স. এর সাক্ষাত পেলেন জুহফা নামক স্থানে। তাঁর চাচাতো ভাই আবু সুফিয়ান ইবনে হারেছ এবং তাঁর পুত্র জাফর ইবনে আবু সুফিয়ান রসুল স. এর সঙ্গে মিলিত হলেন আবওয়ায়। তাঁরাও ইসলাম গ্রহণ করলেন। অপর এক বর্ণনায় এসেছে, আবু সুফিয়ান এবং আতেকার পুত্র আবদুল্লাহ্ ইবনে উমাইয়া আবওয়া নামক স্থানে রসুল স. এর সঙ্গে সাক্ষাত করলেন। তিনি স. তাদের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, ওদের কোনো প্রয়োজন আমার নেই। ওরা আমার সম্পর্কে অনেক অবান্তর কথা বলেছে। আমার মর্যাদাহানি করেছে। তাঁরা শরণ গ্রহণ করলেন উম্মতজননী উম্মে সালমার। জননী তাঁদের পক্ষে সুপারিশ করলেন। রসুল স. আর তাঁদেরকে প্রত্যাখ্যান করলেন না।
কাদীরে পৌঁছেই যুদ্ধের পতাকা উড্ডীন করবার আদেশ দিলেন রসুল স.। পতাকা ভাগ করে দিলেন বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে। তাঁর ব্যক্তিগত দলের পতাকাবাহী হলেন হজরত যোবায়ের। এরপর যাত্রা শুরু করলেন। ইশার নামাজের সময় পৌঁছে গেলেন মাররুজ জাহরান নামক স্থানে। তখন পর্যন্ত কুরায়েশরা রসুল স. এর অভিযান সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেনি। ওই রাতেই আবু সুফিয়ান ইবনে হারব, হাকীম ইবনে হাযাম এবং বুদাইল ইবনে ওয়ারাকা গোপনে সংবাদ সংগ্রহের জন্য মক্কা থেকে বের হলো। রসুল স. তাঁর সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে অগ্নিকুণ্ড প্রজ্জ্বলিত করার আদেশ দিলেন। আদেশ প্রতিপালিত হলো। এক সঙ্গে আগুন জ্বলে উঠলো প্রায় দশ হাজার স্থানে। হজরত আব্বাস আপন মনে বলে উঠলেন, এই রাত্রিশেষের ভোর হবে কুরায়েশদের জন্য অত্যন্ত অশুভ। আল্লাহ্র শপথ! আজ যদি মোহাম্মদ মহাপ্রতাপের সঙ্গে মক্কায় প্রবেশ করে, তবে কুরায়েশদের দাপট নিভে যাবে চিরতরে। এরপর তিনি একটি খচ্চরের পিঠে চড়ে সম্মুখের দিকে অগ্রসর হলেন এই উদ্দেশ্যে যে, যদি মক্কার দিকে গমনকারী কোনো জ্বালানী সংগ্রহকারী, দুগ্ধ বিতরণকারী, অথবা অন্য কোনো পথিকের মাধ্যমে কুরায়েশদেরকে এই সংবাদটি পৌঁছে দেওয়া যায় যে, বাঁচতে যদি চাও, তবে আল্লাহ্র রসুলের নিকট উপস্থিত হয়ে নিরাপত্তাপ্রার্থী হও। কিছুদূর অগ্রসর হতেই তিনি আবু সুফিয়ানের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন। তিনি বলছিলেন, আল্লাহ্র শপথ! আজ রাতের মতো আলোর মেলা আমি জীবনে দেখিনি। হজরত আব্বাস তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, শোনো আবু সুফিয়ান! মোহাম্মদ তাঁর বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে এসেছেন। তাঁকে প্রতিহত করা অসম্ভব। আবু সুফিয়ান বললেন, তাহলে উপায়? হজরত আব্বাস বললেন, তুমি যদি ধরা পড়ো, তবে নিশ্চয় তোমার মস্তক ছেদন করা হবে। তার চেয়ে আমার বাহনে উঠে পড়ো। আমি তোমাকে তাঁর কাছে পৌঁছে দেই। তুমি তাঁর কাছে নিরাপত্তা ভিক্ষা করো। আবু সুফিয়ান তাঁর প্রস্তাবে সম্মত হলেন। রসুল স. এর কাছে পৌঁছার আগেই তাঁরা ধরে পড়ে গেলেন হজরত ওমরের চোখে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, আরে, আরে, এতো দেখছি আল্লাহ্র দুশমন। বিনা চেষ্টায় এসে গ্যাছে আমাদের দখলে। একথা বলেই তিনি আবু সুফিয়ানকে আঘাত করার জন্য ছুটে এলেন। তার আগেই হজরত আব্বাস তাঁকে নিয়ে দ্রুত উপস্থিত হলেন রসুল স. সকাশে। রসুল স. তাঁর কথা শুনে বললেন, আজ রাতের জন্য আপনি তাঁকে আপনার সঙ্গেই রাখুন।
সকাল হলো। হজরত আব্বাস আবু সুফিয়ানকে নিয়ে উপস্থিত হলেন রসুল স. এর মহান সান্নিধ্যে। রসুল স. বললেন, হে কুরায়েশ গোত্রপতি! এখনো কি লা ইলাহা ইল্লাল্লহ্ মোহাম্মাদুর রসুলুল্লহ্ কলেমায় বিশ্বাসী হবার সময় আসেনি? আবু সুফিয়ান বললেন, আমার পিতামাতা আপনার উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত হোক। আপনি সহিষ্ণু, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী। আল্লাহ্র শপথ! আমার ধারণা, দ্বিতীয় কোনো আল্লাহ্র অস্তিত্ব যদি থাকতো, তবে তুমিই হতে সেই আল্লাহ্। রসুল স. বললেন, আমি যে আল্লাহ্র রসুল, এ বিষয়ে তোমার হৃদয়ে এখনো কি প্রতীতি জন্মেনি? আবু সুফিয়ান বললো, না। এখনো আমার মনে রয়ে গেছে কিছুটা খটকা। হজরত আব্বাস বললেন, আরে অবুঝ! ইসলাম গ্রহণ করো। মস্তক ছেদিত হওয়ার আগেই বলো লা ইলাহা ইল্লাল্লহ্ মুহাম্মাদুর রসুলুল্লহ্। আবু সুফিয়ান আর কথা বাড়ালেন না। পবিত্র কলেমা উচ্চারণ করলেন উদাত্ত কণ্ঠে। হজরত বুদাইল ও হাকীম তো ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এর আগেই।
তিবরানী লিখেছেন, রসুল স. তখন বলেছিলেন, হে আল্লাহ্র বান্দাগণ! আবু সুফিয়ান ওই পিলু গাছের আড়ালেই আছে। তাকে বন্দী করে আনো। ইবনে আবী শায়বা বর্ণনা করেছেন, আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীদেরকে বন্দী করেছিলেন রসুল স. এর দেহরক্ষীগণ। আর সেদিন তাঁর দেহরক্ষীগণের প্রধান ব্যবস্থাপক ছিলেন হজরত ওমর। তাঁর বর্ণনায় আরো এসেছে, আবু সুফিয়ান তখন বলেছিলেন, আব্বাস কোথায়? আর এক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, আবু সুফিয়ানকে যখন রসুল স. এর কাছে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো, তখন তাঁর সাথে হজরত আব্বাসও ছিলেন। রসুল স. তখন ঘোষণা দিয়েছিলেন, ওই ব্যক্তিদেরকে নিরাপত্তা দেওয়া হলো, যারা আশ্রয় গ্রহণ করবে কাবাপ্রাঙ্গণে, আবু সুফিয়ানের গৃহে, অথবা নিজ নিজ বাড়িতে। আবু সুফিয়ান মক্কায় পৌঁছে ঘোষণা করেছিলেন, হে কুরায়েশ জনতা! আজ মোহাম্মদ এমন একটি শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে আগমন করেছেন, যার অগ্রযাত্রা প্রতিহত করার সাধ্য তোমাদের নেই। সুতরাং তোমরা তাঁর ঘোষিত নিরাপত্তা গ্রহণ করো। আশ্রয় নাও কাবাপ্রাঙ্গণে, আমার বাড়িতে, অথবা নিজ নিজ ঘরে। লোকজন সেরকমই করলো।
হাকীম ইবনে হাযাম এবং বুদাইল ইবনে ওয়ারাকা রসুল স. এর পবিত্র হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করলেন। রসুল স. তাঁদেরকে আহবায়করূপে প্রেরণ করলেন কুরায়েশদের কাছে। তাঁরা মক্কায় উপনীত হলেন। এরপর তিনি স. মুহাজির ও আনসার বাহিনীর সৈনাপত্যের দায়িত্ব দিলেন হজরত যোবায়েরকে। নির্দেশ দিলেন, মক্কার উজানে হাজ্জন নামক স্থানে পৌঁছে পতাকা উত্তোলন কোরো। পুনরাদেশপ্রাপ্তির পূর্বে স্থানত্যাগ কোরো না। তিনি পতাকা হাতে অগ্রসর হলেন। ওই হাজ্জন এলাকা দিয়েই রসুল স. মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন। সেখানে তাঁর জন্য নির্মাণ করা হয়েছিলো তাঁবু। তিনি স. তখন হজরত খালেদ ইবনে ওলীদকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তুমি বনী খাজাআ ও বনী সুলাইমকে নিয়ে প্রবেশ কোরো মক্কার ভাটি এলাকা দিয়ে। কুরায়েশ এবং আবদে মানাফের বংশদ্ভূতরা ইতোপূর্বে বনী বকরকে ভাটি অঞ্চলের দিকে তাড়িয়ে দিয়েছিলো। সেজন্যই রসুল স. হজরত খালেদকে ভাটির দিক থেকে অগ্রাভিযান শুরু করতে বলেছিলেন। আরো বলেছিলেন, যদি তোমাদের বিরুদ্ধে কেউ লড়তে না আসে, তবে তোমরাও লড়াই কোরো না।
রসুল স. তখন হজরত সা’দ ইবনে উবাদার হাতেও নিশান তুলে দিয়েছিলেন। তিনি স. কিছুসংখ্যক সৈন্য নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন কাদার পথ দিয়ে। প্রবেশ কালে জনতার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আজ লড়াইয়ের দিন। আজ নিষিদ্ধতা বৈধ (আজ রক্তপাতের নিষিদ্ধতা স্থগিত)। জনৈক মুহাজির একথা শুনে বললেন, হে আল্লাহ্র রসুল! শুনুন, সা’দ কী বলছে? সে তো কুরায়েশদের উদ্দেশ্যে এরকম বলতে পারে না। রসুল স. তখন হজরত আলীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ঠিক আছে। পতাকা উত্তোলন করো তুমি। অগ্রসর হও কাদার পথ দিয়ে। হজরত আলী তাই করলেন। তারপর তাঁর পতাকা উড্ডীন করলেন কাবাপ্রাঙ্গণের রুকনে ইয়েমেনে।
আবু ইয়ালা বর্ণনা করেছেন, হজরত যোবায়ের বর্ণনা করেন, রসুল স. তখন ঝাণ্ডা তুলে দিয়েছিলেন আমার হাতে। আর তিনি স. মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন দু’টি ঝাণ্ডা নিয়ে। আলী আমার আগে মক্কার চড়াই অঞ্চলে পৌঁছুতে পারেননি। আর নিম্নাঞ্চল দিয়ে প্রবেশকালে খালেদ সম্মুখীন হয়েছিলেন প্রচণ্ড প্রতিবন্ধকতার। কুরায়েশ ও অন্যান্য অংশীবাদী গোত্রের লোকেরা তাঁর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। তিনিও তাদের উপরে আক্রমণ পরিচালনা করেছিলেন বীর বিক্রমে। ওই সংঘর্ষে নিহত হয় কুরায়েশদের চব্বিশ জন এবং হুজাইল গোত্রের চার জন। ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, ওই সংঘর্ষে নিহত হয়েছিলো বারো অথবা তেরো জন। এর পরেই অংশীবাদীরা পরাভব স্বীকার করে। কেউ কেউ পালিয়ে যায়। তখন মুসলমানদের মধ্যে শহীদ হয়েছিলেন জুহাইনা গোত্রের হজরত সালমা ইবনে খাইলা, হজরত ইবনে জাবের ফেহরী এবং হজরত হারীশ ইবনে খালেদ। অবশ্য রসুল স. তাঁর সকল সেনানায়ককে নির্দেশ দিয়েছিলেন, মক্কায় প্রবেশকালে কাউকে হত্যা করা যাবে না। তবে কেউ আক্রমণ করলে কেবল তাকে হত্যা করা যাবে। আবার তিনি স. নির্দিষ্ট করে কয়েকজনের নাম উচ্চারণ করে বলেছিলেন, ওদেরকে কোনোক্রমে রেহাই দেওয়া যাবে না, তারা যদি কাবাগৃহের গেলাফের নিচেও আশ্রয় নেয়, তবুও। তাদের নামঃ ১. আবদুল্লাহ্ ইবনে আবী সাররাহ্। সে মুসলমান হওয়ার পরে ধর্মত্যাগ করেছিলো। মক্কাবিজয়ের দিবসে হজরত ওসমানের সুপারিশে তাকে রেহাই দেওয়া হয়। এরপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ২. ইকরামা ইবনে আবু জেহেল। মক্কাবিজয়ের দিন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ৩. হুয়াইরিছ ইবনে নকীদ। হিজরতের পূর্বে সে মুসলমানদেরকে খুবই কষ্ট দিয়েছিলো। তাকে হত্যা করেছিলেন হজরত আলী। ৪. হাকীম ইবনে সাবাবা। সে মুসলমানও হয়েছিলো। জি-কারার যুদ্ধে জনৈক আনসারী ভুলক্রমে শত্রুসেনা মনে করে হত্যা করেছিলেন তার ভাইকে। ওই মান্যবর আনসারী থেকে সে রক্তপণ আদায় করেছিলো। তারপর সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করে তাঁকেই আবার হত্যা করে সে ধর্মত্যাগী হয়ে যায়। তাকে হত্যা করে তার নিজের সম্প্রদায়ের গাইলা ইবনে আবদুল্লাহ্। ৫. হুব্বার ইবনে আসওয়াদ, খুবই নিষ্ঠুর চরিত্রের লোক ছিলো সে। মুসলমানদেরকে সে অত্যাচারে অত্যাচারে অতিষ্ঠ করে তুলতো। রসুল স. এর প্রিয় পুত্রী হজরত জয়নাবকে সে এমন আঘাত করেছিলো যে, এতে তাঁর গর্ভপাত ঘটে। ওই আঘাতজনিত রোগেই তিনি পরলোকগমন করেন। মক্কারবিজয়ের দিন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। রসুল স. তাঁকে মার্জনা করেন। ৬. হারেছ ইবনে তিল্লাল খাজায়ী। তাকে হত্যা করেছিলেন হজরত আলী। ৭. কবি কা’ব ইবনে জুহাইর। সে রসুল স.কে অপবাদ দিয়ে কবিতা রচনা করতো। মক্কাবিজয়ের দিন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রসুল স. এর প্রশংসায় রচনা করেন অনবদ্য কবিতা। ৮. ওয়াহশী ইবনে হারব। তিনি ছিলেন রসুল স. এর প্রিয় খুল্লতাত শহীদশ্রেষ্ঠ হজরত হামযার হত্যাকারী। মক্কাবিজয়ের দিন তিনি তায়েফে পালিয়ে গিয়েছিলেন। পরে তায়েফ থেকে ফিরে আসেন এবং আশ্রয় গ্রহণ করেন ইসলামের চিরনিরাপত্তা ও শান্তির ছায়ায়। ৯. আবদুল্লাহ্ ইবনে হানযাল। প্রথমে তার নাম ছিলো আবদুল উজ্জা। ইসলাম গ্রহণের পর রসুল স. তাঁর নাম রাখেন আবদুল্লাহ্। একবার রসুল স. তাকে জাকাত সংগ্রাহকরূপে এক স্থানে পাঠালেন। সহযোগীরূপে সঙ্গে দিলেন হজরত আবদুল্লাহ্ খাজায়ীকে। তিনি ছিলেন পাচক। পথিমধ্যে উভয়ে এক সরাইখানায় যাত্রাবিরতি করলেন। একদিন দুপুর বেলা জাকাতসংগ্রাহক আবদুল্লাহ্ পাচক হজরত আবদুল্লাহ্কে বললো একটা কিছু জবাই করে তার গোশত রান্না করো। কিন্তু পাচক হজরত আবদুল্লাহ্ তাঁর নির্দেশ পালনে আলস্য করলেন। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে সে তাঁকে হত্যা করলো। আর পালিয়ে গেলো ধর্মত্যাগী হয়ে। তার সঙ্গে থাকতো দু’জন নৃত্যগীতপটিয়সী ক্রীতদাসী। তারা তাদের গানের মাধ্যমে রসুল স. এর কুৎসা রটনা করতো। মক্কাবিজয়ের দিবসে রসুল স. মুরতাদ আবদুল্লাহ্ এবং ওই ক্রীতদাসীদ্বয়কে হত্যার নির্দেশ দেন। হজরত সাঈদ ইবনে হারেছ মাখজুমী ও হজরত আবু বারযাহ্ আসলামী ওই মুরতাদ ও তার একজন ক্রীতদাসীকে হত্যা করতে সমর্থ হন। অপর ক্রীতদাসী যায় পালিয়ে। পরে সে ইসলাম গ্রহণ করে। ১০. আমর ইবনে হাশেমের মুক্তকৃতা ক্রীতদাসী সারা। সে ছিলো মক্কার প্রসিদ্ধ গায়িকা। তার কাছ থেকেই উদ্ধার করা হয়েছিলো হজরত হাতেব ইবনে আবী বালতার চিঠি। মক্কাবিজয়ের পর সে মুসলমান হয়ে গিয়েছিলো। ১১. হজরত আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা। সে উহুদ যুদ্ধে চর্বণ করেছিলো রসুল স. এর প্রিয় পিতৃব্য শহীদশ্রেষ্ঠ হজরত হামযার কলিজা। রসুল স. তাঁকে মার্জনা করেছিলেন। ১২. সাফওয়ান ইবনে উমায়ইয়া। মক্কাবিজয়ের দিন সে জেদ্দায় পালিয়ে গিয়েছিলো। ভেবেছিলো, সে হয়তো সেখান থেকে কোনো জাহাজযোগে ইয়েমেনের দিকে পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করতে সক্ষম হবে। রসুল স. তাকে নিরাপত্তা দেন হজরত উমাইর ইবনে ওয়াহাবের সুপারিশে। তাই সে জেদ্দা থেকে ফিরে আসে এবং ইসলাম গ্রহণের বিষয়ে চিন্তাভাবনার জন্য অবকাশ প্রার্থনা করে দুই মাসের। রসুল স. তাকে চার মাসের অবকাশ দেন। পরে তিনি মুসলমান হয়ে যান।
ইমাম আহমদ ও তিরমিজির বর্ণনায় এসেছে, রসুল স. মক্কায় প্রবেশ করেন পাগড়ীপরিহিত অবস্থায়। বোখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, তখন তাঁর পবিত্র মস্তকে শোভা পাচ্ছিলো শিরোস্ত্রাণ। পরে পাগড়ী। প্রবেশকালে তিনি স. বার বার আবৃত্তি করেন সুরা নাসর। পরিশেষে রসুল স. হাজ্জন নামক স্থানে তাঁর জন্য নির্মিত তাঁবুতে অবস্থান গ্রহণ করলেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর দুই মহাপুণ্যবতী সহধর্মিণীঃ হজরত উম্মে সালমা ও হজরত মায়মুনা। জনৈক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, হে মহাবিজয়ী! আপনি কি আপনার পৈত্রিক নিবাসে উঠবেন না? তিনি স. বললেন, আকীল কি সে সুযোগ রেখেছে? কোথায় গিয়ে উঠবো? উল্লেখ্য, আকীল রসুল স. এর পিতৃপুরুষদের বাড়িঘর বিক্রি করে দিয়েছিলো। জনৈক সাহাবী বললেন, হে মহাবাণীবাহক! সেখানে তো অনেকেরই বাড়িঘর রয়েছে। আপনি তো যে কোনো বাড়িতে গিয়ে উঠতে পারেন। তিনি স. বললেন, না। আমি কারো বাড়িতেই উঠবো না। তাই হলো। রসুল স. তাঁর তাঁবুতেই অবস্থান করতে লাগলেন। নামাজের সময় সেখান থেকেই তিনি স. উপস্থিত হতেন কাবা গৃহে। প্রথম দিন তিনি স. তাঁর তাঁবুতে কিছুক্ষণ বিশ্রামগ্রহণের পর স্নান করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। পানি সংগ্রহ করা হলো। তাঁর প্রিয় পুত্রী হজরত ফাতেমা পর্দার ব্যবস্থা করলেন। স্নান সমাপনের পর তিনি স. পাঠ করলেন আট রাকাত চাশতের নামাজ। মুসলিম।
বোখারীর বর্ণনায় এসেছে, তাঁর চাচাতো বোন হজরত উম্মে হানী বলেছেন, তিনি স. সেদিন স্নান করেছিলেন আমার গৃহে এসে। এরপর নামাজ পাঠ করে তিনি স. উটের পিঠে চড়ে গমন করেন কাবাপ্রাঙ্গণে এবং উষ্ট্রারোহী অবস্থাতেই যষ্টি দ্বারা হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করে তাতে চুম্বন দান করেন। উচ্চারণ করেন তকবীরধ্বনি। সাথে সাথে তার প্রতিধ্বনি ওঠে তাঁর সহচরবর্গের কণ্ঠে। তিনি স. সাতবার কাবাগৃহ প্রদক্ষিণ করেন। প্রদক্ষিণ করেন তাঁর সহচরবৃন্দও। প্রতিবারেই তিনি স. হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করেন তাঁর যষ্টি দ্বারা। কাবাপ্রাঙ্গণে তখন প্রতিষ্ঠিত ছিলো ক্ষুদ্র-বৃহৎ তিন শত ষাটটি প্রতিমা। তিনি সেগুলোকে আঘাত করেন যষ্টি দ্বারা। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিমাগুলো হয়ে পড়ে ছিন্ন-ভিন্ন এবং ভূতলশায়ী। তাঁর পবিত্র কণ্ঠে তখন বার বার উচ্চারিত হতে থাকে ‘জ্বাআল হাক্বক্বু ওয়া যাহাক্বাল বাতিল’ (সত্য সমাগত, মিথ্যা তিরোহিত)। রসুল স. এর যষ্টির আঘাত ছাড়াই তখন অনেক প্রতিমা ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়ে। ফুজালা ইবনে ওমর লাইছি মনে মনে ইচ্ছা করে, তাওয়াফরত অবস্থাতেই সে রসুল স.কে হত্যা করবে। ধীরে ধীরে ভিড় ঠেলে পৌঁছে গেলো তাঁর কাছে। তিনি স. ডাকলেন, ফুজালা! সে জবাব দিলো, এই যে আমি। তিনি স. জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মন কী বলছে? সে বললো, তেমন কিছু না। আমি তো আল্লাহ্র নাম স্মরণ করছি। তার কথায় রসুল স. মৃদু হাসলেন। বললেন, লজ্জিত হও। আল্লাহ্র কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করো। তিনি স. ফুজালাকে আরো কাছে ডেকে এনে তাঁর পবিত্র হস্ত স্থাপন করলেন তাঁর বক্ষদেশে। পরে হজরত ফুজালা নিজেই বর্ণনা করেছেন, রসুল স. তাঁর পবিত্র হস্ত আমার উপর থেকে উঠিয়ে নেওয়ার আগেই আমি গভীর বিস্ময়ের সঙ্গে অনুভব করলাম, এখন তিনি স.ই আমার সর্বাপেক্ষা প্রিয়তম জন। অংশীবাদীরা পর্বত শিখর থেকে এসবকিছুই চাক্ষুষ করেছিলো।
তাওয়াফ পর্ব সমাপ্ত হলো। চতুষ্পার্শ্বে তখনও প্রচণ্ড ভীড়। রসুল স. তাঁর উট থেকে অবতরণ করলেন। উটটিকে কোথাও বসানোর স্থান পাওয়া গেলো না। তাই সেটিকে রেখে আসা হলো কাবা চত্বরের সীমানার বাইরে। রসুল স. মাকামে ইব্রাহিমে উপস্থিত হলেন। তখন তার মাথায় ছিলো উষ্ণীষ। তিনি স. সেখানে দুই রাকাত নামাজ পাঠ করলেন। গেলেন জমজম কূপের পাশে। কূপের ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখে বললেন, যদি আবদুল মুত্তালিবের গোষ্ঠীর জন্য এটা গর্বের বিষয় না হতো, তবে আমি আজ নিজ হাতে এক ডোল পানি উত্তোলন করতাম। এক ডোল পানি উত্তোলন করলেন হজরত আব্বাস, অথবা হারেছ ইবনে আবদুল মুত্তালিব। রসুল স. পান করলেন পবিত্র জমজমের জল। বাদবাকীটুকু দিয়ে সামাধা করলেন ওজু। ওজুর ব্যবহৃত জলাহরণের জন্য সাহাবীগণের মধ্যে লেগে গেলো ঠেলাঠেলি, প্রতিযোগিতা। যারা সে জলের অংশ পেলেন, তারা তা সঙ্গে সঙ্গে মেখে নিলেন নিজেদের মাথায়, চোখে-মুখে-শরীরে। কুরায়েশেরা এমতো অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে বিস্ময়াভিভূত হয়ে গেলো। বলতে লাগলো, আমরা কোনো রাজাকেও এরকম সম্মান পেতে দেখিনি। শুনিওনি। হোবল ছিলো পৌত্তলিকদের সর্ববৃহৎ প্রতিমা। প্রতিমাটি ছিলো কাবাগৃহের সামনের দিকে প্রধান ফটকের কাছে। রসুল স. এর নির্দেশে সেটিকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়া হলো।
হজরত আলী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. কাবাগৃহের ছাদে উঠলেন। আমাকেও বললেন, ওঠো। উঠলাম। ছাদের উপরে ছিলো আর একটি বড় প্রতিমা। আমি সেটিকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিচে ফেলে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো প্রতিমাটি। রসুল স. উদাত্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করলন ‘সত্য সমাগত, অসত্য তিরোহিত। অসত্যের তিরোহিতি তো অবধারিত’।
সূরা নাসরঃ আয়াত ১, ২, ৩
এই সুরাখানিতে রয়েছে মাত্র ৩টি আয়াত। এর অবতরণ স্থল মহাপুণ্যনিকেতন মক্কা নগরী।
আবদুর রাজ্জাক তাঁর ‘মুসান্নাফ’ গ্রন্থে লিখেছেন, মুয়াম্মার সূত্রে জুহুরী বর্ণনা করেছেন, মক্কাবিজয়ের বছর শহরের নিকটে উপস্থিত হয়ে রসুল স. হজরত খালেদের নেতৃত্বে কিছুসংখ্যক সৈন্যকে পাঠালেন মক্কার ভাটি এলাকায়। সেখানে হজরত খালেদের বাহিনীর সঙ্গে কুরায়েশদের একটি দলের সংঘর্ষ উপস্থিত হলো। বিজয়ী হলেন হজরত খালেদ। এরপর রসুল স. এক ঘোষণার মাধ্যমে প্রতিপক্ষীয়দেরকে অস্ত্রসমর্পণের আদেশ দিলেন। সকলেই দলে দলে অস্ত্র সমর্পণ করতে লাগলো এবং গ্রহণ করতে লাগলো ইসলাম। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হলো এই সুরাখানি।
1. যখন আসিবে আল্লাহ্র সাহায্য ও বিজয়
2. এবং তুমি মানুষকে দলে দলে আল্লাহ্র দীনে প্রবেশ করিতে দেখিবে
3. তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁহার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করিও এবং তাঁহার নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করিও, তিনি তো তওবা কবুলকারী।
প্রথমে বলা হয়েছে ‘ইজা জ্বাআ নাসরুল্লহি ওয়াল্ফাতহ্’। মক্কাবিজয়ের সময় এই সুরা অবতীর্ণ হয়েছিলো বলেই এখানকার ‘ইজা’ (যদি) শব্দটির অর্থ করা হয়েছে ‘ইজ’। এভাবে বক্তব্যটি দাঁড়িয়েছেঃ যখন আসবে আল্লাহ্র সাহায্য ও বিজয়। অন্যান্য আয়াতেও ‘ইজা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ‘ইজ’ অর্থে। যেমন ‘ইজা জ্বাআ আম্রুনা ওয়া ফারাত তানূর’ (অবশেষে যখন এসে গেলো আমার আদেশ এবং উচছ্বসিত হয়ে উঠলো ভূপৃষ্ঠ), ‘হাত্তা ইজা বালিগা’ (যখন সে পৌঁছলো)।
‘ওয়াল ফাতহ্’ অর্থ বিজয়। অর্থাৎ মক্কাবিজয়। হজরত আবু সাঈদ খুদরী থেকে তিবরানী বর্ণনা করেছেন, মক্কাবিজয়ের দিন রসুল স. বলেছিলেন, এটা সেই দিন, আল্লাহ্ যে দিনের প্রতিশ্রুতি আমাকে দিয়েছিলেন। এরপর তিনি স. আবৃত্তি করলেন ‘ ইজা জ্বাআ নাসরুল্লহি ওয়াল ফাতহ্’।
ঐতিহাসিকেরা ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন এভাবেঃ হুদায়বিয়া নামক স্থানে রসুল স. কুরায়েশদের সঙ্গে দশ বছরের জন্য একটি অনাক্রমণ চুক্তি করলেন, যার শর্তগুলোর মধ্যে ছিলোঃ এই দশ বৎসর জনগণকে দেওয়া হবে পূর্ণনিরাপত্তা। তারা অবাধে চলাচল করতে পারবে। অন্যান্য গোত্র তাদের ইচ্ছামতো যে কোনো দলে যোগদান করতে পারবে। এই শর্তটির কারণে আরবের বিভিন্ন গোত্র তাদের ইচ্ছামতো যোগ দিতে লাগলো মুসলমান অথবা কাফের কুরায়েশদের সঙ্গে। মুসলিম দলে যোগ দিলো খাজাআ গোত্র এবং বনী বকর যোগ দিলো কুরায়েশদের সঙ্গে। গোত্রদুটির মধ্যে ছিলো দীর্ঘদিনের প্রলম্বিত বিদ্বেষ। কিছুকাল অতিবাহিত হওয়ার পর বনী বকর চড়াও হলো বনী খাজাআদের উপর। কুরায়েশদের মধ্য থেকে তাদের সাহায্যে এগিয়ে গেলো সাফোয়ান ইবনে উমাইয়া, ইকরামা ইবনে আবু জেহেল, সুহাইল ইবনে আমর। শায়বা ইবনে ওসমান, হুয়াইতাব ইবনে আবদুল উজ্জা এবং তাদের সঙ্গী সাথীরা। প্রচণ্ড লড়াই হলো। দু’পক্ষেই হতাহত হলো অনেক লোক। যুদ্ধশেষে কুরায়েশেরা বুঝতে পারলো, রসুল স. এর সঙ্গে চুক্তিভঙ্গ করা হয়েছে। এর জন্য তারা পরস্পরকে দোষারোপ করতে শুরু করলো। আমর ইবনে সালেম খাজায়ী তার গোত্রের চল্লিশ জনকে সঙ্গে নিয়ে সংবাদ জানানোর অভিপ্রায়ে যাত্রা করলো মদীনা অভিমুখে। কিন্তু তারা মদীনায় উপস্থিত হওয়ার আগেই রসুল স. ঘটনাটি জেনে ফেললেন। সাহাবীগণকে বললেন, কুরায়েশরা চুক্তিভঙ্গ করেছে। অবশ্য এটাই ছিলো আল্লাহ্র অভিপ্রায়। জননী আয়েশা জিজ্ঞেস করলেন, নিশ্চয় এর মধ্যে কোনো কল্যাণ রয়েছে? তিনি স. বললেন, হ্যাঁ। জননী আয়েশা থেকে মোহাম্মদ ইবনে আমর এবং জননী উম্মে সালমা থেকে তিবরানীও এরকম বর্ণনা করেছেন।
আমর ইবনে সালেম খাজায়ী তার লোকজনকে নিয়ে মদীনায় পৌঁছলো। রসুল স.কে খুলে বললো সকল বৃত্তান্ত। রসুল স. বললেন, এখন তোমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা আমার কর্তব্য। নতুবা আমরাও তো তোমাদের কাছ থেকে সাহায্য চাইতে পারবো না। ঘটনাটি ঘটেছিলো হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তির বাইশ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর শাবান মাসে। রসুল স. তিনটি শর্ত জানিয়ে তাঁর প্রতিনিধিরূপে মক্কায় পাঠালেন হজরত হামযাকে। শর্ত তিনটি ছিলোঃ ১. বনী খাজাআর নিহত ১৩ জনের জন্য রক্তপণ দিতে হবে ২. অন্যথায় বনী খাজআকে আক্রমণকারী বনী বকরের মিত্রশক্তি বনী নাফাছাকে করে দিতে হবে চুক্তিবহির্ভূত, যেনো মুসলমানগণ তাদের উপর প্রতিশোধ নিতে পারে ৩. অথবা রহিত করে দিতে হবে হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি। শর্ত তিনটির কথা জেনে কুরায়েশরা মহা বিপদে পড়লো। নিজেদের মধ্যে তুমুল তর্কবির্তকের পর একমত হলো যে, সন্ধিচুক্তি রহিত করে দেওয়াই উত্তম। হজরত হামযা সন্ধিচুক্তি বাতিলের সংবাদ নিয়ে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করলেন।
রসুল স. পরামর্শ সভায় বসলেন। হজরত আবু বকর পরামর্শ দিলেন, হে আল্লাহ্র প্রিয়তম রসুল! তাদের প্রতি সহৃদয়তা প্রদর্শন করাই উত্তম। সন্ধিচুক্তিটি পুনর্বহাল করলেই মনে হয় ভালো হয়। কেননা তারা তো আপনারই স্বজাতি। অচিরেই হয়তোবা তারা আপনার অনুগামীও হয়ে যেতে পারে। হজরত ওমর বললেন, যুদ্ধ, কেবল যুদ্ধই হচ্ছে এর একমাত্র সমাধান। হে আল্লাহ্র প্রিয়তম বাণীবাহক! আপনি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করুন। তারা তো সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীদের মধ্যেও নিকৃষ্ট সত্যপ্রত্যাখ্যানকারী। তারা আপনাকে ‘পাগল’ ‘যাদুকর’ কতো কিছু বলে অপবাদ দেয়। সুতরাং যুদ্ধের মাধ্যমেই তাদেরকে শায়েস্তা করতে হবে। তাদেরকে পরাভূত করতে পারলে সমগ্র আরব আপনার করতলগত হবে। আর অনুগামী যদি হয়, তবে সমগ্র আরব হবে আপনার অনুগত।
রসুল স. হজরত ওমরের অভিমতকেই গ্রহণ করলেন। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে লাগলেন নীরবে। আরবের বিভিন্ন গোত্র-শাখাগোত্রকে উদ্বুদ্ধ করতে লাগলেন কুরায়েশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে। ফলে আসলাম, গিফার, মুজাইনা, হরফিয়া, আশজা ও সুলাইম গোত্রের লোকেরা যুদ্ধ করার উদ্দেশ্য নিয়েসমবেত হলো মদীনায়। অন্যান্য গোত্রগুলো সংবাদ পাঠালো, তারা পথে তাদের লোকজন নিয়ে মিলিত হবে। এভাবে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ালো দশ হাজার, মতান্তরে বারো হাজারে। সম্ভবত মদীনা থেকে যাত্রার প্রাক্কালে সৈন্যসংখ্যা ছিলো দশ হাজার। পথে অন্যান্যরা যোগ দিলে সে সংখ্যা হয়ে যায় বারো হাজার।
ওদিকে কুরায়েশরা চিন্তিত হয়ে পড়লো। মদীনায় পাঠালো তাদের প্রিয় নেতা আবু সুফিয়ানকে। তিনি মদীনায় এসে সোজাসুজি উপস্থিত হলেন তাঁর কন্যা উম্মতজননী উম্মে হাবীবার গৃহে। রসুল স. এর শয্যায় উপবেশনের উদ্যোগ করতেই জননী উম্মে হাবীবা বিছানা গুটিয়ে নিলেন। বললেন, এটা রসুলুল্লাহ্ স. এর বিছানা। এর উপরে কোনো মুশরিক উপবেশন করতে পারে না। আবু সুফিয়ান বললেন, তুমি আমার কন্যা হয়ে আমার সঙ্গে এরকম আচরণ করতে পারলে? জননী উম্মে হাবীবা বললেন, হ্যাঁ, আমি আপনার কন্যা, কিন্তু আল্লাহ্ তো দয়া করে আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন পবিত্র ইসলামের ছায়ায়। অথচ আপনি একজন গোত্রপতি হলেও এখনো অংশীবাদী। আপনার তো উচিত এই মুহূর্তে মহাসত্য ইসলামকে গ্রহণ করা।
আবু সুফিয়ান সেখানে আর দাঁড়ালেন না। বাইরে এসে সাক্ষাত করলেন রসুল স. এর সঙ্গে। তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন অনেক কথা। রসুল স. তার একটিরও জবাব দিলেন না। তিনি তখন সুপারিশকারী হিসেবে নিযুক্ত করলেন হজরত আবু বকরকে। তিনি তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। সরাসরি বলে দিলেন, আপনার জন্য আমি কোনো সুপারিশ করতে পারি না। হজরত ওমর রাগান্বিত হলেন। তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন, যুদ্ধই সকল সমস্যার সমাধান। আমার কাছে যদি মাত্র একটি ছড়িও থাকে, তবুও তো আমি তাই নিয়ে যুদ্ধ করবো আপনাদের বিরুদ্ধে। আবু সুফিয়ান এবার দেখা করলেন হজরত আলী ও হজরত ফাতেমার সঙ্গে। তাঁরাও তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। শেষে বিফল মনোরথ হয়ে তিনি ফিরে গেলেন মক্কায়। কিছুকাল পরে হজরত ইবনে উম্মে মকতুম, অথবা হজরত আবু জর গিফারীকে মদীনার প্রশাসক নিযুক্ত করে রসুল স. ৮ম হিজরী সনের ১০ই রমজানে সদলবলে যাত্রা করলেন মক্কা অভিমুখে। দোয়া করলেন, হে আমাদের প্রভুপালক! গুপ্তচরের অপপ্রভাব থেকে আমাদেরকে রক্ষা কোরো।
বোখারীর বর্ণনায় এসেছে, হজরত আলী বলেছেন, রসুল স. যোবায়ের, মেকদাদ ও আমাকে আদেশ করলেন, এক্ষুণি মক্কার দিকে যাত্রা করো। বুস্তানখাখে পৌঁছে এক উষ্ট্রারোহিনীর সাক্ষাত পাবে। তার কাছে একটি পত্র আছে, পত্রটি ছিনিয়ে নিয়ে এসো। আমরা যাত্রা করলাম। বুস্তানখাখে পৌঁছে দেখা পেলাম কথিত উষ্ট্রারোহিনীর। তার গতিরোধ করে বললাম, চিঠিটা দাও। সে বললো, আমার কাছে কোনো চিঠি নেই। আমি বললাম, ভালোয় ভালোয় বের করে দাও। নয়তো তোমাকে বিবস্ত্র করে তল্লাশী করা হবে। সে এবার বিনা বাক্যে বের করে দিলো চিঠিটি। আমরা চিঠি নিয়ে ফিরে এলাম মদীনায়। চিঠিটি লিখেছিলেন হাতেব ইবনে আবী বালতা। ওই চিঠির মাধ্যমে তিনি মক্কায় অবস্থানরত তাঁর আত্মীয়স্বজনদেরকে রসুল স. এর মক্কা অভিযানের সংবাদ জানিয়ে দিয়েছিলেন। রসুল স. তাঁকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, হাতেব! কী ব্যাপার? হাতেব বললেন, আমি মার্জনাপ্রার্থী। তবে হে আল্লাহ্র প্রিয়তম রসুল! এর মধ্যে আমার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিলো না। আমার পরিবার-পরিজন রয়েছে মক্কায়। আমার কিছুসংখ্যক মুহাজির ভাইদের স্বজন-পরিজনও রয়েছে সেখানে। চিঠির মাধ্যমে আমি কেবল তাদের নিরাপত্তা কামনা করেছিলাম। ভেবেছিলাম, এই সংবাদ পাওয়ার কারণে তারা হয়তো কুরায়েশদের ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকতে পারবে। বিজয় তো হবে আপনারই। রসুল স. বললেন, হাতেব সত্য কথাই বলেছে। হজরত ওমর বললেন, হে আল্লাহ্র রসুল! তার আচরণ তো মুনাফিকদের মতো। অনুমতি দিন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেই। রসুল স. বললেন, রসনা সংযত করো। তুমি কি জানো না হাতেব বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন গাজী। ওই যুদ্ধবিজয়ীদের সম্পর্কে কি আল্লাহ্ এই বলে শুভসমাচার দান করেননি যে ‘তোমাদেরকে ক্ষমা করা হয়েছে। এখন তোমরা যা খুশী তাই করতে পারো’। হজরত ওমর অনুতপ্ত হলেন। প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হলো। ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে বরণ কোরো না’।
Thursday, 14 August 2008
সূরা লাহাব
বোখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন, রসুল স. এর উপরে যখন অবতীর্ণ হলো ‘আর আপনি আপনার নিকটজনদেরকে ভীতি প্রদর্শন করুন’ তখন তিনি স. তাঁর আত্মীয় স্বজনদেরকে সমবেত করলেন। যথারীতি তাঁদেরকে ভয় প্রদর্শন করলেন আল্লাহ্র। বোখারী প্রমুখের বর্ণনায় এসেছে, তখন রসুল স. একদিন আরোহণ করলেন সাফা পর্বতের চূড়ায়। শংকাজড়িত কণ্ঠে উচ্চস্বরে তাঁর আত্মীয় স্বজনদের নাম ধরে ডাকলেন। কুরায়েশ জনতা জড়ো হলো পর্বতের সানুদেশে। তিনি স. উদাত্ত কণ্ঠে বললেন, হে জনতা! এখন আমি যদি বলি, পর্বতের অপর প্রান্তে একদল শত্রু সেনা লুকিয়ে আছে। তারা তোমাদেরকে আক্রমণ করবে সন্ধ্যায়, অথবা সকালে, তাহলে তোমরা কি আমার একথা বিশ্বাস করবে? জনতা সমস্বরে জবাব দিলো, নিশ্চয়। তুমি যে আল আমীন (সত্যবাদী)। তিনি স. বললেন, তাহলে শোনো, আল্লাহ্র পক্ষ থেকে শাস্তি অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বেই তোমরা সাবধান হও। আবু লাহাব বললো, তুমি ধ্বংস হও। এ জন্যই কি তুমি আমাদেরকে এখানে ডেকেছো? একথা বলেই সে একটি প্রস্তরখণ্ড হাতে তুলে নিয়ে রসুল স. এর প্রতি নিক্ষেপোদ্যত হলো। তখনই অবতীর্ণ হলো আলোচ্য সুরার প্রথম তিনটি আয়াত।
সূরা লাহাবঃ আয়াত ১, ২, ৩, ৪, ৫
তাফসীরে মাযহারী/৬৩২
* ধ্বংস হউক আবু লাহাবের দুই হস্ত এবং ধ্বংস হউক সে নিজেও।
* উহার ধন-সম্পদ ও উহার উপার্জন উহার কোন কাজে আসে নাই।
* অচিরে সে প্রবেশ করিবে লেলিহান অগ্নিতে
* এবং তাহার স্ত্রীও যে ইন্ধন বহন করে,
* তাহার গলদেশে পাকান রজ্জু।
প্রথমোক্ত আয়াতত্রয়ের মর্মার্থ হচ্ছে চিরহতভাগ্য আবু লাহাবের দুই হাত ধ্বংস হোক। ধ্বংস নেমে আসুক তার নিজের উপরেও। তার অর্থবিত্ত ও উপার্জন তার কোনো উপকারে আসেনি। আসবেও না। দোজখের লেলিহান অগ্নিকুণ্ডে তার প্রবেশের ক্ষণ অত্যাসন্ন।
এখানে ‘তাব্বাত’ অর্থ ধ্বংস হোক। এর ধাতুমূল ‘তাবাব’ যার অর্থ, এমনই এক গহবর, যা সমূহ বিপদ ডেকে আনে। ‘ইয়াদা আবী লাহাব’ অর্থ আবু লাহাবের দুই হস্ত। অর্থাৎ আবু লাহাব স্বয়ং। যেমন বলা হয় ‘ওয়ালা তুলক্বু বিআইদী কুম ইলাত তাহলুকাহ্, (তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ কোরো না)। এখানেও ‘আইদী’ অর্থ নিজেকে, নিজেদেরকে। কোনো কোনো বিদ্বান বলেছেন, আবু লাহাব রসুল স.কে আঘাত করার জন্য হাতে পাথর তুলে নিয়েছিলো। তাই এখানে বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছে তার হস্তদ্বয়ের কথা। আবার কেউ কেউ বলেছেন, এখানে হস্তদ্বয় অর্থ ইহজগত ও পরজগত। অর্থাৎ তার ইহকাল-পরকাল দুই কালই ধ্বংসের মধ্যে নিপতিত। অথবা এখানে ‘হস্তদ্বয়’ কথাটির দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে তার বিত্ত ও প্রভুত্বকে।
আবু লাহাবের আসল নাম ছিলো আবদুল উজ্জা (উজ্জা দেবীর দাস) মুকাতিল বলেছেন, সে সুদর্শন চেহারার লোক ছিলো বলেই তাকে বলা হতো আবদুল উজ্জা। পরে তার উপনাম হয় আবু লাহাব। আবদুল উজজা নামটা অতি জঘন্য। তাই এখানে তাকে বলা হয়েছে আবু লাহাব, যার অর্থ ধ্বংসের পিতা, চরম ধ্বংসাত্মক। ‘ওয়া তাববা’ অর্থ ধ্বংস হোক সে নিজেও। অর্থাৎ সে তো ধ্বংসই হয়ে গিয়েছে। অথবা বলা যেতে পারে, ‘তাববাত’ শব্দটির মাধ্যমে এখানে তার ধ্বংস কামনা করা হয়েছে এবং ‘তাব্বা’ এখানে এসেছে তার ধ্বংসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের লক্ষ্যে। এভাবে বক্তব্যটি দাঁড়িয়েছে আবু লাহাব বিনাশপ্রাপ্ত হোক, বরং সে তো বিনাশ হয়েই গিয়েছে। অর্থাৎ তার বিনাশপ্রাপ্তির বিষয়টি সুনিশ্চিত। একারণেই এখানে ভবিষ্যতকালজ্ঞাপক ক্রিয়া ব্যবহার না করে ব্যবহার করা হয়েছে অতীতকালবোধক ক্রিয়া।
হজরত ইবনে মাসউদ বলেছেন, রসুল স. যখন তাঁর স্বজনদেরকে ইসলাম গ্রহণের আমন্ত্রণ জানালেন, তখন আবু লাহাব বললো, ভাতিজা! তুমি আমাকে শাস্তির ভয় দেখাচ্ছো। কিন্তু আমি তো শাস্তির পরোয়াই করি না। প্রয়োজন হলে আমি আমার সন্তান-সন্ততি-ধন-সম্পদ সবকিছুর বিনিময়ে তোমার কথিত শাস্তি থেকে পরিত্রাণ লাভ করবো। তখন অবতীর্ণ হয় পরবর্তী আয়াত। বলা হয়
তাফসীরে মাযহারী/৬৩৩
‘মা আগনা আ’নহু মালুহূ ওয়ামা কাসাব’ অর্থ তার ধন সম্পদ ও তার উপার্জন তার কোনো কাজে আসেনি। অর্থাৎ তার সঞ্চিত বিপুল বিত্ত-বৈভব ও উপার্জিত সম্পদ তাকে আল্লাহ্র শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না। অথবা তার পুঞ্জীভূত ধন-সম্পদ ও তার উপার্জন কি তাকে আল্লাহ্র শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারবে? পারবে না। ‘ওয়ামা কাসাব’ অর্থ তার উপার্জন। অথবা তার সন্তান-সন্ততি। মাতা মহোদয়া আয়েশা সিদ্দীকা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, নিজস্ব উপার্জনজাত আহার্য সর্বোত্তম ও পবিত্রতম। তোমাদের সন্তান-সন্ততিও তোমাদের উপার্জন। বোখারী, তিরমিজি।
উল্লেখ্য, আবু লাহাবের জ্যেষ্ঠ পুত্র উতবা যখন বাণিজ্যব্যপদেশে সিরিয়া অভিমুখে যাত্রা করেছিলো, তখন তাকে পথিমধ্যে ভক্ষণ করেছিলো একটি নেকড়ে। আর আবু লাহাব মারা গিয়েছিলো বসন্ত রোগে, বদর যুদ্ধের কয়েকদিন পর। কয়েকজন হাবশী ক্রীতদাসের সহায়তায় তাকে বালিচাপা দেওয়া হয়।
‘সা ইয়াস্লা নারান জাতা লাহাব’ অর্থ অচিরে সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে। ‘জাতা লাহাব’ অর্থ লেলিহান অগ্নি। অর্থাৎ সেদিন আর বেশী দূরে নয়, যখন আবু লাহাব দগ্ধীভূত হতে থাকবে দোজখের লেলিহান আগুনে।
পরের আয়াতদ্বয়ে বলা হয়েছে ‘এবং তার স্ত্রীও, যে ইন্ধন বহন করে (৪) তার গলদেশে পাকানো রজ্জু’ (৫)। এখানে ‘ওয়াম্রাআতুহু’ অর্থ তার স্ত্রীও। অর্থাৎ আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিলকেও ভোগ করতে হবে একই পরিণতি। উল্লেখ্য, সে ছিলো হরব ইবনে উমাইয়ার কন্যা এবং হজরত আবু সুফিয়ানের ভগ্নি।
‘হাম্মালাতাল হাত্বব’ অর্থ যে ইন্ধন বহন করে। আরবী ভাষায় পরনিন্দুককে বলা হয় কাষ্ঠ, বা ইন্ধন বহনকারিণী। অর্থাৎ পর নিন্দাকারিণী। ইবনে ইসহাক হামাদান খান্দানের জনৈক ব্যক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, রসুল স. এর গমনাগমনের পথে আবু লাহাবের স্ত্রী কাঁটা পুঁতে রাখতো। সেদিকে ইঙ্গিত করেই অবতীর্ণ হয় এই আয়াত। জুহাক ও ইকরামা সূত্রে ইবনে মুনজিরও এরকম বর্ণনা করেছেন। আতিয়াও এরকম বর্ণনা করেছেন হজরত ইবনে আব্বাসের উক্তিরূপে। কিন্তু কাতাদা, মুজাহিদ এবং সুদ্দী বলেছেন, ‘হাম্মালাতাল হাত্বব’ অর্থ পর নিন্দুক। উম্মে জামিলের স্বভাবই ছিলো পরনিন্দা করে বেড়ানো, একের বিরুদ্ধে অপরের কথা লাগিয়ে ওই দু’জনের মধ্যে শত্রুতার আগুন জ্বালানো, যেমন কাষ্ঠ খণ্ডের ঘর্ষণে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় আগুন। সাঈদ ইবনে যোবায়ের বলেছেন, এখানে ‘হাম্মালাতাল হাত্বব’ অর্থ পাপের গুরুভার বহনকারিণী। যেমন এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘তারা তাদের পিঠে বহন করে পাপের বোঝা’।
‘ফী জ্বীদিহা হাবলুম্ মিম্ মাসাদ্’ অর্থ তার গলদেশে পাকানো রজ্জু। ‘জ্বীদ’ অর্থ গলদেশ, গলা। আর ‘মাসাদ’ অর্থ লৌহশৃঙ্খল, যার দৈর্ঘ্য সত্তর হাত। ওই লৌহশৃঙ্খল তার গলায় আটকিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে তার পিঠের উপর দিয়ে
তাফসীরে মাযহারী/৬৩৪
কটিদেশ পর্যন্ত। আবার শব্দটির অর্থ পাকানো মজবুত রজ্জুও হয়, খেজুর গাছের ছালের হোক, অথবা পাট জাতীয় অন্য কোনো তন্তুর। এরকম বলেছেন হজরত ইবনে আব্বাস এবং ওরওয়া ইবনে যোবায়ের। মুজাহিদ সূত্রে আখফাশ বলেছেন, লোহার শিকলকেই ‘মাসাদ’ বলে। শা’বী এবং মুকাতিল বলেছেন, উম্মে জামিল শক্ত রশি দিয়ে তার লাকড়ির বোঝা বাঁধতো। একদিন সে এভাবে বাঁধা একটি লাকড়ির বোঝা মাথায় নিয়ে একটি পাথরের উপরে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিছলো। এমন সময় একজন ফেরেশতা সেখানে উপস্থিত হয়ে তার লাকড়ির বোঝাটি ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। ফলে তার গলায় ফাঁস লেগে যায় এবং ওই অবস্থাতেই অক্কা পায় সে। ইবনে জায়েদ বলেছেন, ইয়েমেন অঞ্চলে এক প্রকার গাছ জন্মে, তার নাম ‘মাসাদ’। আর তার আঁশ দ্বারা তৈরী রশিকেও বলে ‘মাসাদ’। কাতাদা বলেছেন, ‘মাসাদ’ অর্থ গলার হার। হাসান বসরী বলেছেন, উম্মে জামিলের গলার মোতির মালাকে এখানে বলা হয়েছে ‘মাসাদ’। সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যেব বলেছেন, রমণীটি সুন্দর একটি কণ্ঠহার ব্যবহার করতো। সেই কণ্ঠহারটিকেই এখানে বলা হয়েছে ‘মাসাদ’। সে বলতো, মোহাম্মদের সাথে শত্রুতার পাথেয় হবে আমার এই গলার হার।
‘মাসাদ’ অর্থ যদি এখানে লোহার শিকল হয়, তবে বুঝতে হবে, এখানে বলা হয়েছে তার পরকালের অশুভ পরিণতির কথা। আর এর অর্থ যদি হয় সাধারণ রশি, তবে বুঝতে হবে, প্রসঙ্গটি ইহজগতের। লক্ষণীয়, ঘটনাটি এখানে বর্ণিত হয়েছে রূপকভাবে। উম্মে জামিলকে লাঞ্ছিত ও হেয় প্রতিপন্ন করাই এখানে উদ্দেশ্য। তবে এখানে শা’বী যে বর্ণনাটি উপস্থাপন করেছেন, তার অর্থ বোধগম্য নয়। কেননা আবু লাহাব ও তার স্ত্রী তখনকার সমাজে পরিচিত ছিলো কুলীন ও রক্ষণশীল রূপে। সুতরাং উম্মে জামিল যে লাকড়ির বোঝা বহন করতো, এরকম কথা কষ্টকল্পনা বৈ কি।
সূরা ইখলাস
হজরত উবাই ইবনে কা’ব থেকে আবুল আলিয়া বর্ণনা করেছেন, পৌত্তলিকেরা একবার রসুল স. এর কাছে আল্লাহ্র বংশপরিচয় জানতে চায়। তখন অবতীর্ণ হয় এই সুরা। তিরমিজি, হাকেম, ইবনে মাজা। হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ্ থেকে তিবরানী এবং ইবনে জারীরও এরকম বর্ণনা করেছেন।
ইবনে আবী হাতেমের বর্ণনায় এসেছে, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, একবার কা’ব ইবনে আশরাফ, হুয়াই ইবনে আখতাব এবং আরো কয়েকজন ইহুদী রসুল স. এর মহান সংসর্গে উপস্থিত হয়ে বললো, যে আল্লাহ্ আপনাকে প্রেরণ করেছেন, তাঁর কিছু গুণ বর্ণনা করুন। তখন অবতীর্ণ হয় এই সুরা। সাঈদ ইবনে যোবায়েরের বরাত দিয়ে ইবনে জারীর, কাতাদা এবং ইবনে মুনজিরও
তাফসীরে মাযহারী/৬৩৫
এরকম বলেছেন। জুহাক, কাতাদা ও মুকাতিল সূত্রে বাগবী উল্লেখ করেছেন, একবার কিছুসংখ্যক ইহুদী পণ্ডিত রসুল স. এর সুমহান সাহচর্যে উপস্থিত হয়ে বললো, ‘আল্লাহ্র গুণাবলী সম্পর্কে কিছু বলুন। হতে পারে, আমরা ইমান গ্রহণ করবো। তওরাত কিতাবে তো আল্লাহ্ তাঁর অনেক গুণের উল্লেখ করেছেন। বলুন, তিনি কিসের তৈরী? তিনি কী আহার করেন, না করেন না? কেউ তার অংশীদার কিনা। যদি থাকে, তবে সে কে? তাদের এমতো অপবচনের প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয় সুরা ইখলাস।
আবান সূত্রে আবু শায়েখ বর্ণনা করেছেন, হজরত আনাস বলেছেন, খায়বরের কতিপয় ইহুদী একবার রসুল স. সকাশে উপস্থিত হয়ে বললো, আবুল কাসেম! আল্লাহ্পাক তাঁর অন্তরালবর্তী জ্যোতি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন ফেরেশতামণ্ডলীকে, আসমানকে সৃষ্টি করেছেন গলিত কর্দম দ্বারা, আগুনের স্ফুলিঙ্গ দ্বারা ইবলিসকে। তেমনি ধোঁয়া থেকে আকাশ এবং পানির বুদ্বুদ থেকে পৃথিবীকে। এখন বলুন, আপনার পালনকর্তা কিসের তৈরী? রসুল স. নীরব হয়ে রইলেন। তখন সুরা ইখলাস নিয়ে আবির্ভূত হলেন হজরত জিবরাইল। এ সকল বর্ণনা দৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে, সুরা ইখলাস অবতীর্ণ হয়েছে মদীনায়।
ইবনে জারীরের বর্ণনায় এসেছে, আবুল আলিয়া বলেছেন, বিভিন্ন গোত্রের গোত্রপ্রধানেরা একবার রসুল স. এর পবিত্র সংসর্গে উপস্থিত হয়ে বললো, আপনি আমাদের কাছে আপনার প্রভুপালকের বংশপরিচয় প্রকাশ করুন। তাদের এরকম অপবিত্র উক্তির প্রেক্ষিতে হজরত জিবরাইল আনেন এই সুরাখানি। এই বর্ণনাটিও একথা প্রমাণ করে যে, সুরাখানির অবতরণস্থল মদীনা। ইতোপূর্বে হজরত উবাই ইবনে কা’ব কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে যে অংশীবাদীদের কথা বলা হয়েছে, সম্ভবত তারাই বিভিন্ন গোত্রের গোত্রপ্রধান। আর এরকমও হতে পারে যে, অংশীবাদী ও ইহুদী উভয় গোত্রের গোত্রপ্রধানেরা তখন একসঙ্গে উপস্থিত হয়ে রসুল স.কে এরকম অপপ্রশ্ন করেছিলো।
আবু জুবিয়ান ও আবু সালেহ সূত্রে বাগবী বর্ণনা করেছেন, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, একবার আমের ইবনে তোফায়েল ও আব্বাদ ইবনে রবীয়া রসুল স. এর সুমহান সান্নিধ্যে উপস্থিত হলো। আমের বললো, মোহাম্মদ! তুমি আমাদেরকে কার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে? তিনি স. জবাব দিলেন, মহান আল্লাহ্র প্রতি। আমের পুনরায় জিজ্ঞেস করলো, আল্লাহ্ কীভাবে সৃষ্ট হলেন, সে সম্পর্কে কিছু বলো। তিনি সোনার, না রূপার? না কাষ্ঠনির্মিত? তাদের এরকম মন্দ উক্তির পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয় সুরা ইখলাস। আব্বাদ ভস্মীভূত হয়েছিলো বজ্রাঘাতে এবং আমের ধ্বস হয়েছিলো মহামারীতে।
সূরা ইখলাসঃ আয়াত ১, ২, ৩, ৪
তাফসীরে মাযহারী/৬৩৬
* বল, ‘তিনিই আল্লাহ্, এক-অদ্বিতীয়,
* ‘আল্লাহ্ কাহারও মুখাপেক্ষী নহেন, সকলেই তাঁহার মুখাপেক্ষী;
* ‘তিনি কাহাকেও জন্ম দেন নাই এবং তাঁহাকেও জন্ম দেওয়া হয় নাই,
* ‘এবং তাঁহার সমতুল্য কেহই নাই।’
প্রথমে বলা হয়েছে ‘ক্বুল হুয়াল্লহু আহাদ’ (বলো, তিনিই আল্লাহ্, এক-অদ্বিতীয়)। এখানকার ‘হুয়া’ (তিনি) সর্বনামটি অভিজাত শ্রেণীর। এখানে ‘তিনি’ উদ্দেশ্য এবং বিধেয় এর পরের বাক্যটি। অথবা এখানকার ‘হুয়া’ একটি সাধারণ সর্বনাম; যা সম্পর্কযুক্ত হবে সেই প্রভুপালনকর্তার সঙ্গে, যার সম্পর্কে করা হয়েছে জিজ্ঞাসাবাদ। এভাবে বক্তব্যটি দাঁড়ায় হে আমার প্রিয়তম বাণীবাহক! আপনি তাদেরকে বলুন, হে অংশীবাদীর দল! তোমরা আমার নিকট যাঁর পরিচয় জানতে চেয়েছো, জেনে রাখো তিনি এক-একক-অদ্বিতীয়’। এখানকার ‘আহাদুন’ ‘আল্লাহ্র’ অনুবর্তী। অথবা বলা যায়, ‘আহাদুন’ এখানে বিধেয় হয়েছে ‘হুয়া’ সর্বনাম থেকে। আর এখানকার ‘আহাদুন’এর মূলরূপ ছিলো ‘ওয়াহাদা’। ‘ওয়াহাদা’ এবং ‘ওয়াহিদ’ সমার্থক। হজরত ইবনে মাসউদের ক্বেরাতে ‘হুয়াল্লহু আহাদ’ স্থলে রয়েছে ‘লাওয়াহিদ’। হজরত ওমরের ক্বেরাতেও তা-ই।
যদি ‘হুয়া’ সর্বনামকে অভিজাত সর্বনাম ধরে নেওয়া হয়, ‘আল্লাহ্’কে ধরে নেওয়া হয় উদ্দেশ্য এবং ‘আহাদ’কে বিধেয়, তাহলে বাক্যের বিশুদ্ধ মর্মার্থ প্রকাশ্য অর্থে হবে না। কারণ একটি অবিভাজ্য প্রকৃত সত্তার নাম আল্লাহ্। আর যা অবিভাজ্য, তাতে একাধিকতা অসম্ভব। যেমন জায়েদ একজনের নাম, যা একজনকেই বুঝায় এবং নাকচ করে দেয় একাধিকতাকে। আর তা কোনোকিছুর সমষ্টিও নয়। কেননা এখানে বিদ্যমান সামষ্টিকতার একক। এরপর পুনরায় তাকে এক বলা সঙ্গত নয়। তাই ‘আল্লাহ্’ পদটির দ্বারা এমন এক সাধারণ সত্তাকে মেনে নিতে হয়, যিনি একক উপাস্য হওয়ার প্রকৃত যোগ্য। কারো উপাস্য হওয়ার যোগ্য হতে পারেন কেবল তিনিই, যিনি তাকে অনস্তিত্ব থেকে আনেন অস্তিত্বে এবং সেই সঙ্গে পূর্ণ করে দেন তার স্থিতিলাভের প্রয়োজনসমূহকে। আর যিনি স্বয়ম্ভু, তিনিই অপরকে অস্তিত্ব দান করতে সক্ষম। সেই অবিভাজ্য সত্তার গুণাবলীও পূর্ণ ও পরিণত, নশ্বরতা ও অসম্পূর্ণতা থেকে চিরপবিত্র। সৃষ্টি তাঁর সত্তা ও গুণবত্তা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। তিনিও সৃষ্টির সত্তা ও গুণবত্তা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। সৃষ্টির সত্তা ও গুণবত্তার সঙ্গে তাঁর সত্তা ও গুণবত্তার কোনো সংযোগই নেই। যা স্বয়ম্ভু ও স্বাধিষ্ঠ নয়, তা অপরকে অধিষ্ঠিত করতে পারবে কীভাবে? বরং তার নিজের বিদ্যমানতাই তো সেই স্বয়ম্ভু সত্তা ও গুণবত্তার প্রতিবিম্ব, শাখা-প্রশাখা কদাচ নয়। কেননা শাখা-প্রশাখার সংযোগ থাকে মূলের সঙ্গে। কিন্তু সৃষ্টির সঙ্গে সত্তার এমতো সম্পর্ক কল্পনা করা যায় না। সুতরাং সৃষ্টি কেবলই প্রতিবিম্ব, যে প্রতিবিম্বে আল্লাহ্ই দয়া করে দান করেছেন অস্তিত্ব ও স্থায়িত্ব। সুতরাং আল্লাহ্ই কেবল আনুরূপ্যবিহীন, এক-একক-অবিভাজ্য-অসমকক্ষ ও অংশীবিহীন এরকম ব্যাখ্যাই
তাফসীরে মাযহারী/৬৩৭
অধিক ফলপ্রসূ সঙ্গতিপূর্ণ ও সমীচীন। কিন্তু এরকম ব্যাখ্যা আবার অংশীবাদী ও ইহুদীদের প্রশ্নের যথাযথ জবাবও নয়। কেননা তারা প্রশ্ন করেছিলো ভিন্নভাবে। অর্থাৎ আল্লাহ্র এককত্বের স্বরূপ জানতে চেয়ে তারা কিছু বলেনি। কারণ রসুল স. তাদেরকে প্রথম থেকেই একটি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন কলেমার প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। সে কলেমা হচ্ছে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লহ’ (আল্লাহ্ ভিন্ন অন্য কোনো উপাস্যই নেই)। তাদের প্রশ্ন ছিলো অত্যন্ত অযথার্থ ও স্থুল। তারা বলেছিলো, যিনি তোমাকে প্রেরণ করেছেন, তাঁর উপাদানগত বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করুন। বলো তিনি কিসের তৈরী সোনা, রূপা, লোহার, না কাঠের।
যদি এখানকার ‘হুয়া’ (তিনি) সর্বনামকে ওই অবিভাজ্য সত্তার স্থলাভিষিক্তও ধরা হয়, যেরূপ উল্লেখ করা হয়েছিলো প্রশ্নকারীদের প্রশ্নে, তবুও এ বাক্যটি তাদের প্রশ্নের সঠিক উত্তর হবে না। অর্থাৎ কথাটি তাদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর নয়। আল্লাহ্র এককত্ব সম্পর্কে তারা তো প্রশ্নই করেনি। বরং নবী প্রেরণকারী ওই সত্তার যৌগিক তত্ত্ব সম্পর্কে তারা প্রশ্ন তুলেছিলো। একারণেই উভয় অবস্থায় আল্লাহ্ হবেন যাবতীয় সংযোজন, বিয়োজন, পরিযোজন, পরিবর্ধন, এক কথায় সকল যৌগিকত্বের যাবতীয় অনিবার্যতা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত, পবিত্র। অর্থাৎ তিনি চির অমুখাপেক্ষী আকার-নিরাকার, প্রকার-প্রকৃতি থেকে। তাঁর সাত্তিক তত্ত্ব চির অসমকক্ষ। গুণবত্তার ক্ষেত্রেও কেউ অথবা কোনোকিছু তাঁর তুল্য নয়। অংশীদার তো নয়ই। সুতরাং কেউ অথবা কোনোকিছুই তাঁর মতো নয়। তিনি যে অনুরূপ্যবিহীন। একারণেই আল্লাহ্র পরিচয় ধন্য সুফী-আউলিয়াগণ বলেন, আল্লাহ্র সত্তা-গুণবত্তা ও কার্যকলাপে কারো অথবা কোনোকিছুর কোনোই অংশ নেই। তাঁর অবোধ্য সত্তা তাঁরই গুণবত্তার সমাহার, কিন্তু তাঁর ভিত্তি নয়। বরং তিনি তাঁর গুণরাজিরও ভিত্তি। আর তাঁর গুণরাজির মূল হচ্ছে তাঁরই চিরজীবিতা (হায়াত) গুণ (সিফাত)। ওই হায়াত সিফাতের ভিত্তিতেই দাঁড়িয়ে আছে তাঁর অন্যান্য গুণ জ্ঞান (এলেম) শক্তিমত্তা (কুদরত) অভিপ্রায় (এরাদা) বাণী (কালাম) দর্শন (বাসার) শ্রবণ (সামা) ইত্যাদি। আর হায়াত হচ্ছে তাঁরই সত্তার শাখা বা ভিত্তি। অর্থাৎ তাঁর সত্তা (জাত) যেনো মৌলিক অসমাধ্য একটি বিষয়, যার উৎস হচ্ছে তাঁরই অস্তিত্ব। সেকারণেই সুফি-সাধকগণ বলেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লহ্ অর্থ লা মাওজুদা ইল্লাল্লহ্ (তাঁর বিদ্যমানতা ছাড়া আর কারো বিদ্যমানতাই নেই)। কেননা প্রকৃত বিদ্যমানতা রয়েছে কেবল আল্লাহ্র। সমগ্র বিশ্বজগত যেনো ওই বিদ্যমানতারই ছায়া-প্রচ্ছায়া। যেমন এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘আল্লাহ্ই চিরস্থায়ী, মৌলিক মহাসত্য। যারা তাঁকে ছাড়া অন্যকে ডাকে তারা মিথ্যা’। আর এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘তিনি ব্যতীত অন্য সকল কিছুই ধ্বংসশীল’। অর্থাৎ সকলকিছুই নশ্বর, অনশ্বর কেবল আল্লাহ্। সুতরাং প্রকৃত কথা এই যে, আল্লাহ্র অস্তিত্ব ও গুণবত্তার সঙ্গে সৃষ্টির অস্তিত্ত্ব ও গুণবত্তার সাদৃশ্য রয়েছে কেবল নামত। প্রকৃতপ্রস্তাবে স্রষ্টা ও সৃষ্টি মিলিত বা পরস্পর সম্পৃক্ত নয়। যারা এমতো ব্যাখ্যা বুঝতে অক্ষম, তাদের উচিত, তারা যেনো
তাফসীরে মাযহারী/৬৩৮
সুফি-আউলিয়াগণের সাহচর্য-সম্পৃক্ত হয়। তাহলে হয়তো তাদের সম্মুখে উন্মুক্ত হতে পারে তত্ত্বজ্ঞানের দুয়ার। আল্লাহ্তায়ালার আনুরূপ্যহীন এককত্বই কি তাঁর চিরবিদ্যমানতা ও তাঁর প্রতিপালনযোগ্যতার জন্য যথেষ্ট নয়? সকল কিছুই যে তাঁর জ্ঞানগোচর। অথচ অজ্ঞ সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীরা এ বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করে। এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে না যে, তাঁর আনুরূপ্যহীন জ্ঞান ও ক্ষমতা সকল কিছুকেই আনুরূপ্যবিহীন ভাবে সতত পরিবেষ্টন করে রয়েছে। আর এই আয়াতটি তাঁর পরিপূর্ণ সত্তা ও গুণবত্তার প্রতি ইঙ্গিতবহ।
‘ক্বুল’ অর্থ বলো। অর্থাৎ হে আমার প্রিয়তম রসুল! আপনি তাদেরকে বলুন। ‘ক্বুল হুয়াল্লহু আহাদ’ অর্থ তিনিই আল্লাহ্, এক-অদ্বিতীয়। এই বাক্যটিতে প্রকাশ পেয়েছে নবী-রসুলগণ কর্তৃক প্রচারিত বাণীর সারমর্ম। আর এই বাণীটি এমন এক জ্ঞানগর্ভ ও মহান বাণী যে, বিশাল বিশাল গ্রনে'র বক্তব্যাবলী যেনো এর কাছে কিছুই নয়। আর এই মহান বাণীর জটিল জটিলতর ব্যাখ্যার আবশ্যকও কিন্তু নেই। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্র অবোধ্য সত্তা ও গুণবত্তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আলোচনা অবশেষে অন্তর্ভূত হয় যুক্তিবিদ্যাতেই। যারা প্রজ্ঞার ক্ষেত্রে অনুপযুক্ত, তাদের কাছে বরং এরকম জটিল আলোচনা ধ্বংসাত্মক। যেমন এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘আপনাকে তারা রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আপনি তাদেরকে বলুন, রূহ হচ্ছে আমার প্রভুপালকের পক্ষে থেকে একটি আদেশ’। রূহও আল্লাহ্র সৃষ্টি। সেই রূহের রহস্যোদ্ধারই যখন নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে, তখন রূহের স্রষ্টার সত্তাগুণবত্তার রহস্যোদ্ধারকর্মও নিশ্চয় সাধারণভাবে নিষিদ্ধ। বরং বুঝতে হবে, এ প্রসঙ্গে যে ব্যক্তি তার অক্ষমতার পরিচয় পায়, সে-ই আসলে জ্ঞানী। আর এ জ্ঞান লাভ হতে পারে কেবল তাদের, যারা পায় তাঁর ব্যবধানরহিত আনুরূপ্যহীন সামীপ্য ও সান্নিধ্য। হজরত আবু হোরায়রা বর্ণনা করেছেন, একবার আমরা নিয়তি সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। এমন সময় রসুল স. সেখানে উপস্থিত হয়ে আমাদের কথা শুনলেন। দেখলাম, তিনি রোষতপ্ত। মুখমণ্ডল রক্তিমাভ। মনে হচ্ছিলো, তাঁর পবিত্র মুখাবয়বে ঘষে দেওয়া হয়েছে আনারের লাল দানা। বললেন, এ প্রসঙ্গে আলোচনা করার জন্য কি তোমরা আদেশপ্রাপ্ত? এজন্যই কি তোমাদের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে আমাকে? এ সম্পর্কে তর্কাতর্কি করতে গিয়েই তো তোমাদের পূর্ববর্তীরা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। সাবধান! এ প্রসঙ্গে আর আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়ো না। তিরমিজি, ইবনে মাজা, শোয়ায়েব থেকে আমর ইবনে শোয়ায়েব।
পরের আয়াতে (২) বলা হয়েছে ‘আল্লহুস্ সমাদ’ (আল্লাহ্ কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী)। হজরত ইবনে আব্বাস, হাসান বসরী এবং সাঈদ ইবনে যোবায়ের বলেছেন, ‘সমাদ’ অর্থ নির্ভীক, বেপরোয়া। হজরত বুরাইদা এবং ইবনে জারীরও এরকম বলেছেন। আমার ধারণা, সম্ভবত বর্ণনাটি সুপরিণত সূত্রজাত। আর কথাটি রূপকার্থক। কেননা তিনি জ্ঞানাতীত, বোধ্য গুণাতীত, ধারণা-কল্পনার অতীত।
তাফসীরে মাযহারী/৬৩৯
শা’বী বলেছেন, তিনিই ‘সমাদ’ যিনি পানাহারের প্রয়োজন থেকে মুক্ত। কেউ কেউ বলেছেন, শব্দটির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে পরবর্তী বাক্যে। এরকম বলেছেন হজরত উবাই ইবনে কা’ব থেকে আবুল আলিয়া। আবু ওয়াইল শাকিক ইবনে সালমা বলেছেন ‘সমাদ’ অর্থ সর্বদিক দিয়ে যার কর্তৃত্ব শিখরস্পর্শী। আবু তালহা সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, হজরত ইবনে আব্বাস শব্দটির এরূপই মর্মার্থ করেছেন। সাঈদ ইবনে যোবায়ের বলেছেন, যিনি যাবতীয় গুণে ও কর্মে পরিপূর্ণ, তিনিই ‘সমাদ’। কেউ কেউ বলেছেন, প্রতিটি কর্মের যিনি মূল উদ্দেশ্য, প্রতিটি প্রয়োজন যার উপরে নির্ভরশীল, তিনিই ‘সমাদ’। আবার কেউ কেউ বলেছেন, ‘সমাদ’ ওই অধিপতি, যাঁর কাছে রয়েছে সকলের চাওয়া ও পাওয়া। তাই মানুষ প্রয়োজনে তাঁর কাছেই হাত পাতে এবং সাহায্য চায়। সুতরাং তিনিই সকলের একমাত্র উদ্দেশ্য। যেমন আরবী প্রবাদে বলা হয় ‘সমাদতুহু’ (আমি তাকেই উদ্দেশ্য করেছি)।
কাতাদা বলেছেন, সৃষ্টি লয় হওয়ার পর যিনি অবশিষ্ট থাকবেন, তিনিই সমাদ। হজরত আলী বলেছেন, তিনিই সমাদ, যার উপরে আর কেউ নেই। এরকম বর্ণনা করেছেন ইকরামা। রবী ইবনে আনাস বলেছেন, তিনিই সমাদ, বিপদ যাকে স্পর্শ করতে পারে না। মুকাতিল বলেছেন, সমাদ অর্থ নির্দোষ।
আমার মতে সমাদ এর প্রকৃত অর্থ লক্ষ্যস্থল। ‘কামুস’ অভিধানে লেখা রয়েছে, সমাদ অর্থ ইচ্ছাময়। যবরযুক্ত ‘মীম’ দ্বারা গঠিত ‘সমাদ’ অর্থ অধিপতি। কেননা তাঁর দাসগণের প্রতিটি কর্মের লক্ষ্যস্থল তিনিই। আর এখানকার ‘আস্সমাদ’ পদের ‘আলিফ লাম’ তাই প্রমাণ করে যে, তিনি অমুখাপেক্ষিতার চরম শিখরে আরুঢ়। সাধারণ মানুষের বুদ্ধি-বিবেক দুর্দশায়িত। প্রকৃত বিশ্বাস থেকে তাদের অবস্থান অনেক দূরে। পার্থিবতাকেই তারা বানিয়ে নিয়েছে তাদের লক্ষ্যস্থল। কিন্তু সৃষ্ট কোনোকিছু লক্ষ্যস্থল হওয়ার অযোগ্য। লক্ষ্যযোগ্য কেবল তিনিই।
উপর্যুক্ত ব্যাখ্যাসমূহের কোনোটাই শব্দটির প্রকৃত অর্থ নয়। বরং ওগুলো আনুসাঙ্গিক। কেননা সামগ্রিকরূপে লক্ষ্যস্থল কেবল তিনিই, যিনি কারোই মুখাপেক্ষী নন, অথচ সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। সন্দেহাতীতরূপে সকল উৎকর্ষ ও পূর্ণত্ব কেবল তাঁর মধ্যেই বর্তমান। সর্বপ্রকার আধিপত্য তাঁরই কর্তৃত্বাগত। আর তিনি চিরমুক্ত ও চিরপবিত্র সকল ধরনের দোষক্রটি, ক্ষতি-বিনষ্টি ও পানাহার থেকে। তিনি অনাদি। তাঁর স্বামী-ভার্যা-পিতা-সন্তান-বংশধর হওয়া অচিন্তনীয়। কেউই তাঁর সমান্তরাল, সমকক্ষ বা অংশীদার নয়। তিনি আনুরূপ্যবিহীন এক একক-আবিভাজ্য এমন এক সত্তা, যা জ্ঞান-ধারণা-কল্পনার অতীত।
উল্লেখ্য, ‘আল্লহু আহাদ’ বলার পর ‘আল্লহুস্ সমাদ’ বলার প্রয়োজন ছিলো না। কিন্তু তবু এরকম বলা হয়েছে একারণে যে, তাঁর সম্পর্কে তথাকথিত বিভিন্ন মতের লোক বিভিন্ন কথা বলে, যার কোনোটাই তাঁর আনুরূপ্যবিহীন একক সত্তার উপযুক্ত নয়। যেমন কেউ বলে, তিনি এক নন। কেউ বলে, তিনি কারো জনক,
তাফসীরে মাযহারী/৬৪০
অথবা জাত, অথবা কারো বংশসম্ভূত। এ সকল অপউক্তির মূলোৎপাটনার্থেই প্রথমে বক্তব্যটি প্রকাশ করা হয়েছে সংক্ষিপ্তভাবে। পরে করা হয়েছে সে সংক্ষিপ্তির বিস্তারণ। আর সে কারণেই ‘আল্লহুস্ সমাদ’ এর পরের বাক্যগুলো উপস্থাপনা করা হয়েছে যোজক অব্যয় ব্যতিরেকেই। ‘আল্লহু আহাদ’ বলার পর ‘আল্লহুস্ সমাদ’ বলার আর একটি উদ্দেশ্য একথা জানিয়ে দেওয়া যে, যে সত্তা সকলকিছু থেকে চিরঅমুখাপেক্ষী নন, তিনি ইবাদতেরও যোগ্য নন। আর যিনি অমুখাপেক্ষী, তিনিই মানুষের একমাত্র লক্ষ্যস্থল ও একমাত্র উপাস্য। তাঁর এমতো অমুখাপেক্ষিতা দর্শনেই তো মানুষকে বিনয়াবনতচিত্তে মেনে নিতে হয় তার একান্ত আনুগত্য। সুফী-সাধকগণ তাই লা ইলাহা ইল্লাল্লহ্ জিকির করার সময় বিলোপ করতে থাকেন তিনি ব্যতীত অন্য সকলকিছুকে। এটাই তাঁদের মূল সাধনা। বিষয়টি অতীব জটিল। এমতো জাটিল্যের অবসান ঘটাতে পারেন কেবল আল্লাহ্।
এরপরের আয়াতে (৩) বলা হয়েছে ‘লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ’ (তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি)।
মক্কার পৌত্তলিকেরা বলতো, ফেরেশতারা আল্লাহ্র কন্যা। ইহুদীরা বলতো, আল্লাহ্ নবী উযায়েরের জনক। আর খৃষ্টানেরা বলতো, আল্লাহ্ হচ্ছেন নবী ঈসার পিতা। এ সকল অপবিত্র উক্তির মূলোৎপাটনার্থেই এখানে বলা হয়েছে ‘তিনি কাউকে জন্ম দেননি’। এমতো কর্ম তাঁর জন্য অসম্ভব। কেননা তিনি কারো সমগোত্রীয় নন, নন সমকক্ষ, সমজাতীয় বা সমান্তরাল। পিতা-পুত্র-স্বামী-ভার্যা-বংশধর তো হয় সমজাতীয়রা। আর তিনি কোনো বিষয়েই অপারগ নন যে, তাঁকে পুত্রের সাহায্য গ্রহণ করতে হবে। আর ক্ষয়-বিলয় হওয়াও তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় যে, প্রতিনিধি হিসেবে তাঁকে স্থলাভিষিক্ত করতে হবে পুত্রকে।
‘তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি’ অর্থ তাঁর কোনো জনক হওয়াও অসম্ভব। কেননা এ ক্ষেত্রেও সমগোত্রীয়তা ও অমুখাপেক্ষিতা হচ্ছে অনপনেয় বাধা। তাছাড়া জাত সকল কিছুই নশ্বর। কিন্তু তিনি তো অনশ্বর। আর নশ্বরতা তো উপাস্য হওয়ারও অন্তরায়। এখন কথা হচ্ছে, এখানে অতীতকালবোধক ক্রিয়া ব্যবহার করা হলো কেনো? এর জবাবে বলা যেতে পারে যে, সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীদের অপউক্তিগুলো ছিলো অতীতকালবোধক। তাই অতীতকালবোধক ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে এখানে প্রশ্নোত্তরের সঙ্গতি রক্ষার্থে। অথবা বলা যায়, অতীতকালজ্ঞাপক ক্রিয়া ব্যবহৃত হয়েছে পরের বাক্যে। তাই এভাবে এখানে রক্ষা করা হয়েছে ক্রিয়ার কালগত সাযুজ্য।
শেষোক্ত বাক্যে বলা হয়েছে ‘ওয়া লাম ইয়াকুল্ লাহু কুফুওয়ান আহাদ’ (এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই)। এখানে ‘লাম ইয়াকুন’ এর বিধেয় ‘কুফুওয়ান’। এর উদ্দেশ্য ‘আহাদুন’। আর ‘লাহু’ পদটি এখানে সম্পর্কযুক্ত হয়েছে ‘কুফুওয়ান’ এর সঙ্গে। এভাবে বক্তব্যটি দাঁড়িয়েছে আল্লাহ্পাকের পবিত্রতাও
তাফসীরে মাযহারী/৬৪১
অতুলনীয়, নিরূপম। একারণেই এখানে সম্পর্ককে উল্লেখ করা হয়েছে সম্পর্কযুক্ততার অগ্রে। শেষোক্ত তিনটি বাক্যই এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে যোজক অব্যয় সহকারে। এরকম করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, পৃথক পৃথক প্রত্যেক ধরনের অপমন্তব্যের মূলোৎপাটন করা।
হজরত আবু হোরায়রা কর্তৃক বর্ণিত একটি সুপরিণত সূত্রসম্ভূত হাদিসে কুদসীতে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ বলেন, আদমসন্তানেরা আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করে। অথচ এরকম করা তাদের জন্য বৈধ নয়। তারা আমাকে গালি দেয়। এটাও অবৈধ। তার মিথ্যারোপের নমুনা হচ্ছে, তারা বলে, আল্লাহ্ প্রথমবার যা সৃষ্টি করেছেন, পুনর্বার তা করতে সক্ষম হবেন না। অথচ দ্বিতীয় সৃষ্টি প্রথম সৃষ্টি অপেক্ষা সহজতর। আর তাদের গালি হচ্ছে, তারা বলে, আল্লাহ্র সন্তান-সন্ততি আছে। অথচ আমি চির-অসমকক্ষ, এক-একক-অদ্বিতীয়, অমুখাপেক্ষী। আমি না জাতক, না জাত। আমি তো আনুরূপ্যবিহীন।
পরিচ্ছেদঃ হজরত আবু দারদা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. একবার বললেন, তোমরা কি প্রতি রাতে এক তৃতীয়াংশ কোরআন পাঠ করতে পারো না? আমরা বললাম, তা কী করে সম্ভব? তিনি স. বললেন, সুরা ইখলাস পুণ্যের দিক দিয়ে এক তৃতীয়াংশ কোরআনের সমতুল। হজরত আবু সাঈদ খুদরী থেকেও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন বোখারী। এরকম বর্ণনা এসেছে হজরত ইবনে আব্বাস এবং হজরত আনাস থেকেও।
মাতা মহোদয়া আয়েশা বর্ণনা করেছেন, একবার রসুল স. এক লোককে কিছুসংখ্যক সৈন্যসহ এক অভিযানে প্রেরণ করলেন। তিনি তাঁর সৈন্যদেরকে নিয়ে নামাজ পাঠকালে প্রায়শ সুরা ইখলাস তেলাওয়াত করতেন। দলটি ফিরে এলে রসুল স. সমীপে সৈন্যরা বললো, তিনি এভাবে নামাজ পড়ালেন কেনো? রসুল স. বললেন, তাকেই জিজ্ঞেস করে দ্যাখো না, সে কী বলে। সৈন্যরা তাদের দলপতিকে যখন একথা বললো, তখন দলপতি বললো, এতে রয়েছে আল্লাহ্র সত্তা ও গুণবত্তার অতুলনীয় বিবরণ। তাই আমি এ সুরাটিকে ভালোবাসি এবং অধিকাংশ সময় এই সুরা দিয়ে নামাজ পাঠ করি। রসুল স. এর কানে যখন তারা এ জবাব পৌঁছালো, তখন তিনি বললেন, তাকে বলে দিয়ো, আল্লাহ্ তাকে ভালোবাসেন। বোখারী, মুসলিম।
হজরত আনাস বর্ণনা করেছেন, একবার এক লোক রসুল স. এর সুমহান সন্নিধানে উপস্থিত হয়ে বললো, সুরাটি আমার খুব ভালো লাগে। তিনি স. বললেন, এই ভাল লাগাই তোমাকে নিয়ে যাবে জান্নাতে। তিরমিজি। বোখারীও এর সমার্থক হাদিস বর্ণনা করেছেন।
হজরত আবু হোরায়রা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. একবার এক ব্যক্তিকে সুরা ইখলাস পাঠ করতে শুনে বললেন, অপরিহার্য হয়ে গেলো। আমরা সবিনয়ে নিবেদন করলাম, হে আল্লাহ্র রসুল! কী অপরিহার্য হয়ে গেলো? তিনি স. বললেন, জান্নাত। মালেক, তিরমিজি, নাসাঈ। হজরত আনাস থেকে তিরমিজি কর্তৃক
তাফসীরে মাযহারী/৬৪২
বর্ণিত এবং উত্তম ও বিরল শ্রেণীর আখ্যায়িত এক বর্ণনায় এসেছে, রসুল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি শয়নকালে ডান কাতে শুয়ে একশত বার সুরা ইখলাস পাঠ করবে, মহাবিচারের দিবসে আল্লাহ্ তাকে বলবেন, হে আমার বান্দা! ডান দিক দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করো। তিরমিজি ও দারেমী কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, রসুল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি দৈনিক একশতবার সুরা ইখলাস পাঠ করবে, আল্লাহ্পাক ক্ষমা করে দিবেন তার পঞ্চাশ বছরের পাপ। তবে তার ঋণের বোঝার ব্যাপারটি স্বতন্ত্র। অপর এক বর্ণনাতেও পঞ্চাশ বছরের পাপ মাফ করার কথা বলা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে ঋণের উল্লেখ নেই। হজরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যেব থেকে অপরিণত সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রসুল স. একবার বললেন, যে ব্যক্তি এগারো বার ‘ক্বুল হুয়াল্লহু আহাদ’ পাঠ করবে, তার জন্য বেহেশতে নির্মাণ করা হবে একটি গৃহ। আর কুড়িবার পাঠ করলে সেখানে নির্মিত হবে দু’টি প্রাসাদ। একথা শুনে হজরত ওমর নিবেদন করলেন, হে আল্লাহ্র প্রিয়তম প্রত্যাদেশবাহক! তা হলে তো আমাদের জন্য বেহেশতে প্রাসাদ নির্মিত হবে অনেক। তিনি স. বললেন, আল্লাহ্র দান এর চেয়েও অধিক সুপ্রশস্ত। আল্লাহ্ই অধিক জ্ঞাত।
Sunday, 10 August 2008
কোরআনের মাহাত্ম্য
হজরত ওসমান ইবনে আফফান বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে-ই, যে নিজে কোরআন শিক্ষা করে এবং অপরকে তা শিক্ষা দেয়। বোখারী, মুসলিম। বায়হাকী তাঁর ‘আল আসমা’ গ্রন্থে অতিরিক্তরূপে সংযোজন করেছেন এই সকল গ্রন্থের উপরে কোরআনের মর্যাদা ওইরূপ, যে রূপ মর্যাদা স্রষ্টার, তার সৃষ্টির উপর।
হজরত ইবনে ওমর বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, দুই ধরনের লোকের প্রতি ঈর্ষা করা বৈধ। তার মধ্যে এক ধরনের লোক আল্লাহ্ যাকে দান করেছেন কোরআন। আর সে দিবারাত্রি জড়িত থাকে কোরআনের সঙ্গে। অপর ব্যক্তি সে, যাকে আল্লাহ্ দান করেছেন অঢেল সম্পদ, আর সে তার সম্পদ অকাতরে ব্যয় করতে থাকে আল্লাহ্র পথে। বোখারী, মুসলিম।
তাফসীরে মাযহারী/৬৫৩
হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, প্রতিফল দিবসে তিনটি বস্তু আরশের নিচে স্থান পাবে ১. কোরআন, যার রয়েছে দু’টি দিক, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ২. আমানত ৩. স্বজনবন্ধন। স্বজনবন্ধন তখন চীৎকার করে বলতে থাকবে, শোনো, যে আমাকে জড়িয়ে রেখেছিলো, আজ আল্লাহ্ও তাকে তাঁর স্বজন বলে গণ্য করবেন। আর যে আমাকে ছিন্ন করেছিলো, আজ আল্লাহও তাঁর সামীপ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবেন তাকে।
হজরত ইবনে ওমর বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, মহাবিচারের দিবসে কোরআনের বাহককে বলা হবে, পাঠ করো এবং উন্নতমান হও। আবৃত্তি করো মধুর স্বরে, যেমন মধুর কণ্ঠে আবৃত্তি করতে পৃথিবীতে। সেখানে যেখানে শেষ করেছিলে, সে স্থানই তোমার মাকাম। আহমদ, তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসাঈ। হজরত আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত হয়েছে, রসুল স. জ্বিন ও মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, আল্লাহ্ বলেন, যাকে তার কোরআন তেলাওয়াত আমার জিকির থেকে বিরত রাখে, তাকে আমি দান করব প্রার্থনাকারী অপেক্ষা অধিক। সকল বাণীর উপরে আল্লাহ্র বাণীর মর্যাদা ওই রূপ, যেরূপ মর্যাদা স্রষ্টার, তাঁর সৃষ্টির উপর।
হজরত ইবনে মাসউদ কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, রসুল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি কোরআনের একটি অক্ষর পাঠ করে, সে লাভ করে দশটি পুণ্য। আর একটি পুণ্যকে করা হবে দশগুণ। আমি এরকম বলিনা যে, আলিফ-লাম-মীম একটি অক্ষর। বরং আলিফ একটি অক্ষর। তেমনি পৃথক পৃথক অক্ষর লাম ও মীম। তিরমিজি, দারেমী। তিরমিজি বলেছেন, হাদিসটি উত্তম সূত্রপরমরাগত, বিশুদ্ধ ও বিরল শ্রেণীর। হারেছ ইবনে আওয়ার বর্ণনা করেছেন, আমি একবার এক মসজিদের পাশ দিয়ে যেতে যেতে শুনলাম, মসজিদের ভিতরে কিছু লোক হাদিস সম্পর্কে তর্ক-বিতর্ক করছে। আমি খলিফা হজরত আলীর নিকটে উপস্থিত হয়ে ঘটনাটি জানালাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সত্যিই কি তারা এরকম করছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, শোনো, রসুল স. একবার বললেন, সাবধান! অচিরেই ফেৎনার উদ্ভব ঘটবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহ্র প্রিয়তম রসুল! তাহলে আমাদের উপায় কী হবে? তিনি স. বললেন, আল্লাহ্র বাণী পাক কোরআন, যাতে রয়েছে অতীতের ইতিবৃত্ত, ভবিষ্যতের দিক নির্দেশনা। তোমাদের জীবনযাপনের সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে কোরআনে। এ নিয়ে কেউ যেনো কৌতুক না করে। কোনো অত্যাচারীর কারণে যদি কেউ একে পরিত্যাগ করে, তবে আল্লাহ্ ওই অত্যাচারীকে ধ্বংস করে দিবেন। কোরআনকে ছেড়ে কেউ যদি অন্য উপায়ে পথপ্রাপ্তির অভিলাষী হয়, তবে আল্লাহ্ তাকে বিভ্রান্ত করে দিবেন। এটাই আল্লাহ্পাকের সুদৃঢ় রজ্জু। এর মধ্যেই রয়েছে শুভউপদেশমূলক মহাজ্ঞান। এটা এমন মহান গ্রন্থ, যাকে মান্য করে চললে প্রবৃত্তি কখনো বক্র-পথাভিমুখী হবে না। বচনে থাকবে না কোনো দোদুল্যমানতা। জ্ঞানান্বেষীগণ এ গ্রন্থ বার বার পড়েও পরিতৃপ্ত হবে না। পুনঃ পুনঃ পাঠ করলেও
তাফসীরে মাযহারী/৬৫৪
এর আবেদন কখনো ক্ষুণ্ন হবে না। এর বিস্ময় অনিঃশেষ। এটা ওই গ্রন্থ, যার সংস্পর্শে জ্বিন জাতির ঔদাসীন্য দূরীভূত হয়েছিলো। তারা বলেছিলো, আমরা এমন বিস্ময়কর বাণী শ্রবণ করেছি, যা প্রদর্শন করে সরল পথ। আমরা এর উপরে ইমান এনেছি। এই কোরআনের অনুসরণে যে কথা বলবে, সে সত্য বলবে। যে এর বিধানাবলীর উপরে সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করবে, সে উত্তম বিনিময় লাভ করবে। যে এর আলোকে মীমাংসা করবে, সে সুবিচার করবে। এর প্রতি যে আমন্ত্রণ জানাবে, সে পেয়ে যাবে সরল পথ। তিরমিজি, দারেমী।
হজরত মুয়াজ জুহুনী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি কোরআন পাঠ করে, কার্যকর করে কোরআনের নির্দেশাবলী, মহাবিচারের দিবসে আল্লাহ্ তার পিতামাতার মাথায় পরিয়ে দিবেন এমন মুকুট, যা হার মানাবে দিবাকরের প্রখরতাকেও, যে দিবাকরকে তোমরা প্রত্যক্ষ করো তোমাদের আপন আপন আবাস থেকে। এখন অনুমান করো ওই ব্যক্তিটির মর্যাদা হবে কী রকম? আহমদ, আবু দাউদ।
হজরত উকবা ইবনে আমের বর্ণনা করেছেন, আমি স্বকর্ণে শুনেছি, রসুল স. বলেছেন, কোরআন পাক চামড়ার উপরে রেখে ওই চামড়া আগুনের উপরে রাখলে কোরআনপাক আগুনে পুড়বে না। দারেমী। হজরত আলী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি কোরআন মজীদ পাঠ করে এবং একে বানিয়ে নেয় তার পশ্চাতের ঢাল, এতে বর্ণিত হালালকে মেনে নেয় হালাল হিসাবে এবং হারামকে মনে করে হারাম, আল্লাহ্ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর তার পরিবারের এমন দশজনের জন্য তাকে শাফায়াত করবার অনুমতি দিবেন, যাদের জন্য অপরিহার্য হয়েছিলো জাহান্নাম। তিরমিজি, আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজা, দারেমী।
জননী আয়েশা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, নামাজের বাইরে কোরআন তেলাওয়াত করা অপেক্ষা, নামাজের অভ্যন্তরে কোরআন তেলাওয়াত উত্তম। আবার নামাজের বাইরে তেলাওয়াত করা তসবীহ, তকবীর অপেক্ষা উত্তম। আর রোজা দোজখ থেকে রক্ষা পাওয়ার ঢাল। হজরত আউস সাকাফী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, না দেখে কোরআন পাঠ করার মর্যাদা এক হাজার। আর দেখে পাঠ করার মর্যাদা তার দ্বিগুণ। হজরত ইবনে ওমর বর্ণনা করেছেন, রসুল স. একবার বললেন, কোনো কোনো হৃদয়ে মরিচা পড়ে যায়, যেমন লোহাতে মরিচা পড়ে পানির পরশে। নিবেদন করা হলো, হে আল্লাহ্র রসুল! সে মরিচা পরিষ্কার করার উপায় কী? তিনি স. বললেন, মৃত্যুর স্মরণ এবং কোরআন পাঠ। উপরোল্লিখিত হাদিসত্রয় বায়হাকী সংকলন করেছেন তাঁর শো’বুল ইমানে। হজরত আবু হোরায়রা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, আল্লাহ্ এতো অধিক একাগ্রতার সঙ্গে তাঁর নবীর কোরআন তেলাওয়াত শোনেন যে, সেরকম করে অন্য কিছুই শোনেন না। মুসলিম। হজরত আবু হোরায়রার অপর বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ্ উৎকর্ণ হয়ে কারো সুললিত স্বরের কোরআন তেলাওয়াত শোনেন না, যেমন উৎকর্ণ হয়ে শোনেন তাঁর নবীর সুললিত স্বরবিশিষ্ট সশব্দ তেলাওয়াত। তিনি আরো বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, ওই ব্যক্তি আমাদের দলভূত নয়, যে সুললিত কণ্ঠে কোরআন আবৃত্তি করে না।
তাফসীরে মাযহারী/৬৫৫
হজরত জাবের বর্ণনা করেছেন, একবার আমরা কোরআন পাঠ করছিলাম। আমাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলো একজন অনারব গেঁয়ো লোক। এমন সময় রসুল স. সেখানে উপস্থিত হলেন। বললেন, পাঠ করো। তোমাদের প্রত্যেকের পাঠ উত্তম। অচিরেই এমন লোকের আগমন ঘটবে, যারা কোরআনের পাঠপদ্ধতি সোজা করে ফেলবে, যেমন সোজা করা হয় তীর। অর্থাৎ তারা পাঠ করবে অতিদ্রুত। আর এমতো পাঠের বিনিময় তারা এ জগতেই নিয়ে নিবে। পরজগতের পুণ্যলাভের আকাংখাও তাদের থাকবে না। আবু দাউদ, বায়হাকী।
হজরত হুজায়ফা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, কোরআন আবৃত্তি কোরো আরবী পাঠরীতি ও আরবী স্বরে। গায়কদের রাগ-রাগিনী এবং গ্রন্থধারীদের পাঠপদ্ধতি পরিহার কোরো। আগামীতে এমন কিছুসংখ্যক লোকের প্রাদুর্ভাব ঘটবে, যারা কোরআন আবৃত্তি করবে গায়কী ঢঙে, রাগ-রাগিনী সহযোগে। তাদের তেলাওয়াতের প্রভাব তাদের কণ্ঠনালীর নিচে পৌঁছবে না। তাদের হৃদয় হবে ফেৎনাভরা। তারাও ফেৎনায় পতিত হবে, যারা তাদেরকে ভালোবাসবে। বায়হাকী, ইবনে রযীন। হজরত উবায়দা মুলাইকি বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, ওহে কোরআনের অধিকারী! কোরআন মজীদকে উপাধান বানিয়ো না। দিনে রাতে তেলাওয়াত কোরো। তেলাওয়াতের হক আদায় কোরো। পাঠ কোরো সুললিত কণ্ঠে, বিশুদ্ধ উচ্চারণে। এর প্রচার-প্রসারে সচেষ্ট হয়ো এবং এর বিষয়ে গবেষণাও কোরো, যেনো অর্জন করতে পারো সফলতা। পার্থিব বিনিময়প্রাপ্তির প্রত্যাশায় তাড়াহুড়া করে পাঠ কোরো না। এর প্রকৃত বিনিময় তো লাভ হবে পরকালে। বায়হাকী হাদিসটি উল্লেখ করেছেন তাঁর শো’বুল ইমান গ্রন্থে।
হজরত আলী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, কোরআন পাক হচ্ছেউত্তম প্রতিষেধক। ইবনে মাজা। হজরত ইবনে মাসউদ বর্ণনা করছেন, রসুল স. বলেছেন, মধু ও কোরআন সকল ব্যাধির উপশমক। ওয়াইলা ইবনে আসকা বর্ণনা করেছেন, এক লোক রসুল স. এর সুমহান সান্নিধ্যে উপস্থিত হয়ে তার কণ্ঠনালীর ব্যথার কথা জানালো। তিনি স. বললেন, কোরআন পাঠ করতে থাকো। বায়হাকী। হজরত আবু সাঈদ খুদরী বর্ণনা করেছেন, এক লোক রসুল স. এর সুমহান সংসর্গে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলো, আমার বুকে খুব ব্যাথা। তিনি স. বললেন, কোরআন পাঠ করতে থাকো। আল্লাহ্ তো স্বয়ং বলেছেন ‘শিফাউল লিমা ফীস্ সুদুর’ (বক্ষে যা আছে তার নিরাময়ক)।
হজরত তালহা ইবনে মাতরাফের বর্ণনায় এসেছে, যখন কোনো রোগগ্রস্ত ব্যক্তির পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করা হয়, তখন দেখা যায় তার রোগের প্রকোপ কমে আসছে। রসুল স. এর যুগেও এরকম বলা হতো। আবু উবায়দা। আল্লাহ্ই প্রকৃত পরিজ্ঞাতা।
আলহামদু লিল্লাহি রববিল আ’লামীন ওয়া সল্লাল্লহু তায়ালা আ’লা খইরি খলক্বিহী মুহাম্মাদ ওয়া আলিহী ওয়া আসহাবিহী আজ্বমাঈন। আমিন।
সমাপ্ত
তাফসীরে মাযহারী/৬৫৬
সূরা নাস
সূরা নাসঃ আয়াত ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬
তাফসীরে মাযহারী/৬৪৮
বল, ‘আমি শরণ লইতেছি মানুষের প্রতিপালকের,
‘মানুষের অধিপতির,
‘মানুষের ইলাহের নিকট
আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার ‘অনিষ্ট হইতে,
‘যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে,
‘জিন্নের মধ্য হইতে এবং মানুষের মধ্য হইতে।’
প্রথমে বলা হয়েছে ‘ক্বুল আঊ’জু বি রব্বিন্ নাস’ (বলো আমি শরণ গ্রহণ করছি মানুষের প্রতিপালকের)। এখানে ‘বলো’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে রসুল স.কে। আর এখানে ‘রববিন্ নাস’ অর্থ মানুষের প্রভুপালক। এভাবে বক্তব্যটি দাঁড়ায়জ্জ হে আমার প্রিয়তম রসুল! আপনি আপনার প্রার্থনায় বলুন, মানুষের যিনি স্রষ্টা, পালয়িতা ও ব্যবস্থাপয়িতা, আমি সেই মহান প্রভুপালনকর্তারই শরণ যাচনা করি।
পরের আয়াতে (২) বলা হয়েছেজ্জ ‘মালিকিন নাস’ (মানুষের অধিপতির)। অর্থাৎ সেই প্রভুপালয়িতার কাছেই আমি শরণ প্রার্থনা করি, যিনি মানুষের অস্তিত্বেরও অধিপতি।
এরপরের আয়াতে (৩) বলা হয়েছেজ্জ ‘ইলাহিন্ নাস্’ (মানুষের ইলাহের নিকট)। বাক্যটি আগের বাক্যদু’টোর বিস্তৃতি বা বিবৃতি। অর্থাৎ শরণ কামনা করি আমি সেই প্রভুপালক ও অধিকর্তার নিকট, যিনি একমাত্র উপাস্যও। কেননা পালয়িতা তো বলা হয় মাতা-পিতাকে, অথবা অন্যান্য অভিভাবককেও। আবার অধিপতি বলা হয় রাজা-বাদশাহকেও। কিন্তু উপাস্য তারা কদাচ নন। আল্লাহ্র প্রতিপালকত্ব ও অধিপতিত্ব যে অন্য কারো মতো নয়, সেকথা প্রমাণার্থেই তাই অবশেষে বলা হয়েছে ‘মানুষের উপাস্যের নিকট’। অর্থাৎ তিনি পালনকর্তা ও অধিপতিই কেবল নন, তিনি উপাস্যও।
এখানকার ‘আন্ নাস্’ (মানুষ) পদটির নির্দিষ্টবাচক ‘আলিফ লাম’ সীমিতার্থক। এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে সীমিত-সংখ্যকদেরকে। অর্থাৎ রসুল স. ও তাঁর সহচরবৃন্দকে। আল্লাহ্পাকের পালকত্ব, আধিপত্য ও উপাস্য হওয়ার বিষয়টি সার্বজনীন হওয়া সত্ত্বেও এখানে বিশেষভাবে তাঁদেরকে সম্বোধন করার উদ্দেশ্য তাঁদের বিশেষ মর্যাদাকে প্রকাশ করতে। এর আরো একটি কারণ এ-ও হতে পারে যে, এই সুরা দুটো অবতীর্ণই করা হয়েছে রসুল স. এবং তাঁর সহচরবর্গের উপর থেকে যাদুর প্রভাবকে চিরতরে তিরোহিত করা। কেননা পাল্যজনের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব বহন করতে হয় পালনকর্তাকেই। গউছুছ্ ছাকালাইন বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী তাই বলেছেনজ্জ
‘যখন তুমিই আমার পৃষ্ঠদেশের আশ্রয়, তখন আমার কাছে কি লাঞ্ছনা-গঞ্জনা আসতে পারে? পৌঁছতে কি পারে আমার কাছে কোনো জুলুম, যখন তুমিই আমার সাহায্যদাতা? চারণভূমির রক্ষাকর্তা যদি তা রক্ষা করতে সমর্থ হয়, আর এদিকে
তাফসীরে মাযহারী/৬৪৯
হারিয়ে যায় উটের পা বাঁধার রশি, তবে কি তার জন্য এটা লজ্জার ব্যাপার নয়? অবিশ্বাসীরাও আল্লাহ্র প্রভুপালকত্ব ও শাসনকর্তৃত্বের অধীন।। তাই তারা তাঁর হেফাজত থেকে বঞ্চিত। একারণেই আহযাব যুদ্ধের সময় রসুল স. তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আমাদের পালনকর্তা আছেন, তোমাদের কোনো পালনকর্তা নেই।
২ ও ৩ সংখ্যক আয়াতে পুনঃপুনঃ ‘মানুষ’ উল্লেখ না করে সর্বনাম ব্যবহার করলেই যথেষ্ট হতো। কিন্তু তা করা হয়নি ব্যাখ্যাটিকে সুদূরপ্রসারী করণার্থে এবং রসুল স. ও তাঁর একনিষ্ঠ অনুগামীগণের সূউচ মাহাত্ম্য প্রকাশার্থে। উল্লেখ্য, সুরা ফালাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে দৈহিক দুর্বিপাক থেকে আশ্রয় গ্রহণের, যে দুর্বিপাকে পতিত হতে থাকে মানুষসহ অন্য সকল সৃষ্টি। তাই সেখানে বলা হয়েছে ‘রব্বিল ফালাক্ব’। কিন্তু এখানে আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে হৃদয়ঘটিত অনিষ্টতা থেকে, যা কেবল মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সেকারণেই এখানে ‘রব’ (প্রভুপালক)কে সম্বন্ধযুক্ত করা হয়েছে মানুষের সাথে। বলা হয়েছে ‘রববিন্ নাস’। এভাবে এখানকার বক্তব্যটি দাঁড়িয়েছেজ্জ মানুষকে প্রবঞ্চনায় নিক্ষেপকারী প্রবৃত্তির প্ররোচনার অনিষ্টতা থেকে আমি শরণ গ্রহণ করছি কেবল আল্লাহ্র, যিনি মানুষের কার্যাবলীর অধিপতি এবং মানুষের একমাত্র উপাস্য।
উল্লেখ্য, এই সূরার ৬টি আয়াতের মধ্যে ৫টিতেই উল্লেখ করা হয়েছে ‘আন্ নাস’ (মানুষ)। সর্বনাম ব্যবহার করা হয়নি একটিতেও। এভাবে এখানে বক্তব্যকে করে তোলা হয়েছে অধিকতর উদ্দেশ্যপূর্ণ ও গুরুত্ববহ, সর্বনাম ব্যবহার করলে যা হতো না। তাছাড়া এখানে প্রতিটি আয়াতের উদ্দেশ্যও পৃথক পৃথক। সর্বনাম ব্যবহার করলে উদ্দেশ্যের এই পৃথকতাও প্রকাশ পেতো না। বক্তব্যটি হয়ে যেতো একমুখী। তাই কোনো কোনো বিদ্বান বলেছেন ১. প্রথমোক্ত ‘আন্ নাস’ অর্থ মানব শিশু, যারা লালন পালনের মুখাপেক্ষী। সেজন্যই বলা হয়েছে ‘রব্বিন্ নাস’ (মানুষের প্রতিপালকের) ২. দ্বিতীয় আয়াতের ‘আন্ নাস’ অর্থ যুবক, যারা যুদ্ধ করে আল্লাহ্র পথে। রাষ্ট্ররক্ষায় তাদের প্রয়োজন অনিবার্য। তাই বলা হয়েছে ‘মালিকিন্ নাস’ (মানুষের অধিপতির) ৩. তৃতীয় আয়াতের ‘আন্ নাস’ অর্থ বয়োপ্রবীণ, যারা পার্থিব কর্মকাণ্ড থেকে অবকাশ পেয়ে নিমগ্ন হয় এক আল্লাহ্র একনিষ্ঠ ইবাদতে। তাই বলা হয়েছে ‘ইলাহিন্ নাস’ (মানুষের ইলাহের নিকট) ৪. পঞ্চম আয়াতের ‘আন্ নাস’ অর্থ পরিশুদ্ধ মানুষ, যারা শয়তানের শত্রু। তাই আশ্রয় কামনা করতে বলা হয়েছে এভাবে ‘মিন শাররিল ওয়াস্ওয়াসিল্ খন্নাস’ (যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে) ৫. ষষ্ঠ আয়াতের ‘আন্ নাস’ অর্থ শয়তান প্রভাবিত মানুষ। অর্থাৎ শয়তান যেমন মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়, তেমনি কুমন্ত্রণা দেয় তার দলভূত মানুষেরাও। তাই তাদের অপপ্রভাব থেকেও আশ্রয় প্রার্থনা করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে এখানে। রসুল স. বলেছেন, যদি অথর্ব বৃদ্ধ, দুগ্ধপোষ্য শিশু ও চারণশীল চতুষ্পদ জন্তু না থাকতো, তাহলে তোমাদের উপরে নেমে আসতো শাস্তি। হজরত আবু হোরায়রা থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আবু
তাফসীরে মাযহারী/৬৫০
ইয়াসা, বাযযার ও বায়হাকী। এর সমর্থনে রয়েছে আরো একটি অপরিণত সূত্রবিশিষ্ট হাদিস, যা জুহুরী সূত্রে বর্ণনা করেছেন আবু নাঈম। আবার এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘যদি বিশ্বাসী নর-নারী না থাকতো, যাদেরকে তোমরা জানতেনা ......’ শেষ পর্যন্ত।
বায়যাবী লিখেছেন, আলোচ্য সুরার বাক্যগুলোর গতিধারা থেকে একথাই প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ্পাক পুনরুত্থান ঘটাতে সম্পূর্ণ সক্ষম। আর বাক্যগুলোর ধারাবাহিক বিন্যাস থেকে প্রতীয়মান হয়, মানুষের জন্য মর্যাদার স্তরও রয়েছে অনেক। তবে এমন স্তরের রহস্যভেদ করতে পারেন কেবল তাঁরা, যাঁরা আল্লাহ্র পরিচয়ধন্য। তাঁরা আল্লাহ্র বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অনুগ্রহসম্ভারের প্রতি দৃষ্টিপাত করে অভিভূত হয়ে যান। হৃদয় ও মস্তিষ্ক দিয়ে বুঝতে পারেন, অবশ্যই আল্লাহ্ একমাত্র প্রভুপালয়িতা, যিনি কারোরই মুখাপেক্ষী নন, অথচ সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। সৃষ্টির প্রতিটি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করেন সেই আনুরূপ্যবিহীন আল্লাহ্ই, অন্য কেউ নয়। তিনিই মালিক, মোখতার এবং সর্বাধিপতি। সুতরাং তিনিই সকলের একমাত্র উপাস্য।
এরপরের আয়াতে (৪) বলা হয়েছেজ্জ ‘মিন শাররিল ওয়াস্ওয়াসিল খন্নাস’ (আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে)। এখানকার ‘আল ওয়াস্ওয়াসি’ নামপদ, অর্থ কুমন্ত্রণা। হ্রস্ব থেকে অতি হ্রস্ব ধ্বনির নাম ‘ওয়াস্ওয়াসা’, যা কেবল হৃদয়ে অনুভব্য, শ্রুতির অতীত। এখানে ‘ওয়াস্ওয়াসা’ বলে বুঝানো হয়েছে শয়তানের সেরূপ সূক্ষ্ম কুমন্ত্রণাকে। অথবা বলা যায়, আধিক্য বুঝানোর জন্যই এখানে ধাতুমূলকে ব্যবহার করা হয়েছে কর্তৃবাচক শব্দরূপের স্থলে। কিংবা এখানে সম্বন্ধপদ রয়েছে অনুক্ত। অর্থাৎ কুমন্ত্রণা প্রক্ষেপণকারী। এরকম বলেছেন জুজায।
এখানকার ‘আল খন্নাস’ (আত্মগোপনকারী) শব্দটি ‘আল ওয়াস্ওয়াসা’ (কুমন্ত্রণা) এর বিশেষণ। শব্দটির ধাতুমূল ‘খনসুন’ বা ‘খুনসুন’ অর্থ চুপিসারে পশ্চাদপসরণ করা। এটাই শয়তানের রীতি। যখন আল্লাহ্র জিকির করা হয়, তখন সে চুপিসারে পিছনে হটে যায়। এ জন্যই তাকে এখানে বলা হয়েছে ‘আত্মগোপনকারী’। হজরত আবদুল্লাহ্ ইবনে শাকীক বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, মানুষের হৃদয়ে আছে দুইটি কুঠরীজ্জ একটিতে থাকে ফেরেশতা, অপরটিতে শয়তান। মানুষ যখন আল্লাহ্র জিকিরে মগ্ন হয়, তখন শয়তান পিছনে সরে যায়। আর যখন মানুষ জিকির থেকে উদাসীন থাকে, তখন সে তার ঠোঁট দিয়ে হৃদয়ে ঠোকর মারতে থাকে। এভাবে হৃদয়ে প্রক্ষেপ করে প্ররোচনা। আবু ইয়ালা।।
এরপরের আয়াতে (৫) বলা হয়েছেজ্জ ‘আল্ লাজী ইউওয়াস্উইসু ফী সুদূরিন্ নাস’ (যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে)। একথার অর্থজ্জ মানুষ যখন আল্লাহ্র স্মরণচ্যুত হয়, তখন শয়তান তার অন্তরে দেয় কুমন্ত্রণা। এভাবে এখানে বিবৃত হয়েছে ‘ওয়াস্ওয়াসা’ পদের দ্বিতীয় বিশেষণ।।
তাফসীরে মাযহারী/৬৫১
শেষোক্ত আয়াতে বলা হয়েছে ‘মিনাল জ্বিন্নাতি ওয়ান্ নাস’ (জ্বিনের মধ্য থেকে এবং মানুষের মধ্য থেকে)। এই বাক্যটিও ‘ওয়াস্ওয়াসা’র বিবরণ, অথবা বিবরণ ‘আল্ লাজী’র। অর্থাৎ কুমন্ত্রণাদাতা জ্বিনের মধ্য থেকে যেমন হয়, তেমনি হয় মানুষের মধ্য থেকেও। যেমন এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘আমি মানুষ শয়তান ও জ্বিন শয়তানকে প্রত্যেক নবীর জন্য শত্রু বানিয়ে দিয়েছি’। সারকথা হচ্ছে, আলোচ্য সুরার মাধ্যমে আল্লাহ্ তাঁর প্রিয়তম রসুল এবং তাঁর অনুগামীগণকে জ্বিন ও মানুষের অনিষ্টতা থেকে আত্মরক্ষার নিমিত্তে আল্লাহ্ সকাশে আশ্রয় যাচনা করার নির্দেশনা দিয়েছেন।
একটি সংশয়ঃ একজন মানুষ আর এক জন মানুষের হৃদয়ে তো প্রবেশ করতে পারে না। তাহলে মানুষ কুমন্ত্রণাদাতা, এরকম বলার অর্থ কী?
সংশয়ভঞ্জনঃ মানুষও কুমন্ত্রণাদাতা। তবে তাদের কুমন্ত্রণা প্রভাব বিস্তার করে পরিবেশ-পরিসি'তি অনুসারে। মানুষের কথা অন্য মানুষের হৃদয়ে প্রভাব বিস্তার করেই। তখন হৃদয়ে কার্যকর হয় কুমন্ত্রণা। অথবা এখানকার ‘মিনাল জ্বিন্নাতি ওয়ান নাস’ কথাটি সম্পৃক্ত হবে আগের আয়াতের ‘ওয়াস্ওয়াসা’ পদের সাথে। অর্থাৎ মানুষের মনের ভিতর জ্বিন ও মানুষ বিভিন্ন কার্যোপলক্ষে কুমন্ত্রণা সৃষ্টি করে। কালাবী বলেছেন, আগের আয়াতের ‘কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে’ কথাটিতে যে মানুষ উদ্দেশ্য ‘জ্বিনের মধ্য থেকে এবং মানুষের মধ্য থেকে’ বাক্যে দেওয়া হয়েছে তারই পরিচয়। যেনো মানুষ জ্বিন ও মানুষ উভয়ের কুমন্ত্রণার ধারক। ‘নাস’ অর্থ আবার জ্বিনও হয়। যেমন এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘ওয়া আন্নাহু কানা রিজ্বালুম মিনাল ইনসি ওয়া ইয়াউজুনা বি রিজ্বালিম মিনাল জ্বিননি’। এই আয়াতে রিজ্বালুম মিনাল ইনসি’ (অনেক লোক) বলে বুঝানো হয়েছে জ্বিনদেরকে)। বাগবী লিখেছেন, এক বেদুইন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, একদিন তার সামনে একদল জ্বিন উপসি'ত হলো। সে জিজ্ঞেস করলো, তোমরা কে? তারা বললো, আমরা জ্বিনদের লোক। ফাররার বক্তব্যও এরকম। আবার এরকমও বলা যেতে পারে যে, এখানকার বক্তব্যটি হবেজ্জ আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি জ্বিনজাতীয় শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে এবং মানুষের অনিষ্ট থেকে।
হজরত উকবা ইবনে আমের বর্ণনা করেছেন, রসুল স. একবার বললেন, তোমরা কি জানো, আজ রাতে এমন কিছু অবতীর্ণ হয়েছে, যার মতো ইতোপূর্বে আর অবতীর্ণ হয়নি। শোনো, সদ্য অবতীর্ণ সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস। মুসলিম। আহমদের বর্ণনায় বিষয়টির উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে, রসুল স. একবার বললেন, আমি কি তোমাদের এমন সুরা শিক্ষা দিবো না, যার অনুরূপ কোরআনে, যবুরে এবং ইঞ্জিলে নেই? বর্ণনাকারী বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহ্র প্রিয়তম রসুল! অবশ্যই শিক্ষা দিন। তিনি তখন আবৃত্তি করলেন সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস।
তাফসীরে মাযহারী/৬৫২
উম্মতজননী হজরত আয়েশা সিদ্দিকা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. শয্যাগ্রহণের সময় সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস পাঠ করে দুই হাত একত্র করে তাতে ফুঁ দিতেন। তারপর দুই হাত দিয়ে মুছে ফেলতেন তাঁর পবিত্র শরীর। মুছতেন মস্তক, মুখমণ্ডল, দেহের উভয় পার্শ্ব, যতদূর হস্ত প্রসারিত করা যায়। এরূপ করতেন তিনি তিনবার। মুসলিম।
হজরত উকবা ইবনে আমের বর্ণনা করেছেন, এক যাত্রায় আমি ছিলাম রসুল স. এর সহগামী। জুহফা এবং আবওয়ার মাঝখানে পথ চলার সময় হঠাৎ শুরু হলো ঝড়। অন্ধকার আমাদেরকে ঢেকে ফেললো। রসুল স. সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস পাঠ করে আল্লাহ্র সাহায্য কামনা করতে লাগলেন। আমাকে বললেন, উকবা! তুমিও এমন করো। আমিও তাঁর অনুসরণ করলাম। ওভাবে কেউ কখনো আল্লাহ্ সকাশে সাহায্যপ্রার্থী হয়নি। আবু দাউদ।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে হাবীব বর্ণনা করেছেন, এক রাতে মুষল ধারায় বৃষ্টি শুরু হলো। চরাচর ঢেকে গেলো ঘোর অন্ধকারে। আমরা রসুল স. এর শরণাপন্ন হলাম। তিনি স. বললেন, বলো। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, কী বলবো? তিনি স. বললেন, সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস। তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসাঈ। যখন খুব বেশী দুর্বল হয়ে পড়লেন, তখন আমিই সুরা দু’টো পাঠ করে তাঁর উপর ফুঁক দিতে লাগলাম। কিন্তু ফুঁক দিতাম তাঁর হাতে, আর তাঁর হাতই বুলিয়ে দিতাম তাঁর পবিত্র শরীরে। বাগবী। তবুও আল্লাহ্র সঙ্গে তাদের কোনো পরিচয়ই নেই তিনি এই হাদিসটি হজরত আনাস থেকেও বর্ণনা করেছেন শব্দটিতে যের যুক্ত করা হয়েছে সে কারণেই এই তিনটি সুরা সকাল-সন্ধ্যায় তিন বার করে পাঠ করলে তোমরা রক্ষা পাবে যাবতীয় বিপদ-আপদ থেকে জননী আয়েশা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. যখন অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখন সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস পাঠ করে তাঁর নিজের উপরে ফুঁক দিতে লাগলেন