Friday, 3 October 2008

সূরা নাসর

তৃতীয় আয়াতে বলা হয়েছেঃ তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কোরো এবং তাঁর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা কোরো, তিনি তো তওবা কবুলকারী

এখানে ফাসাব্‌বিহ্‌ বিহামদি রব্বিকঅর্থ তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কোরোকথাটি প্রথম আয়াতের যখন’ (ইজা) শর্তের পরিণতিআর এখানকার বিহামদিকথাটির সম্পর্ক রয়েছে একটি অনুক্ত ক্রিয়ার সঙ্গেএভাবে কথাটি দাঁড়ায়ঃ হে আমার প্রিয়তম নবী! আপনি তখন পাঠ করুন সুবহানাল্লহি ওয়া বিহামদিহীঅর্থাৎ আল্লাহ্‌ আপনাকে যে অচিন্তনীয় মহাবিজয় দান করে আপনাকে অনুগৃহীত করলেন, তার জন্য আপনি বর্ণনা করুন তাঁর প্রশংসা, পবিত্রতা ও মহিমা

হজরত আনাস বলেছেন, মহানবী স. যখন মহাবিজয়ীর বেশে মক্কা নগরীতে প্রবেশ করেছিলেন, তখন জনতা তাঁর অতুলনীয় মর্যাদা ও সম্ভ্রম দর্শন করে বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলোআর তিনি স. এ দৃশ্য দেখে মনে মনে আল্লাহ্‌কে জানাচ্ছিলেন অসংখ্য কৃতজ্ঞতা, যা প্রকাশ পাচ্ছিলো তাঁর বাহ্যিক অবয়বেওতিনি স. তাঁর মস্তক মোবারক করে রেখেছিলেন নিম্নমুখীমনে হচ্ছিলো তা বুঝি স্পর্শ করে আছে উটের গদিঅত্যুত্তম সূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন হাকেমহজরত আবু হোরায়রা থেকে আবু ইয়ালা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. এর সবিনয় অবনমিত মস্তক তখন স্পর্শ করেছিলো তাঁর উটের আসনের মধ্যবর্তী স্থানআর যখন লোকেরা দলে দলে এসে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করলো, তখন তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে উচ্চারণ করেছিলেন, হে আমার পরমতম আরাধ্য! পারলৌকিক জীবনই হচ্ছে প্রকৃত জীবন

ওয়াস্‌তাগফিরহুঅর্থ এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কোরোএকথার অর্থঃ হে আমার প্রিয়তম রসুল! আপনি আপনার উম্মতের প্রতি অতিমমতাময়তার কারণে কখনো কখনো অত্যুৎকৃষ্ট আমল ছেড়ে গ্রহণ করেছিলেন কেবল উৎকৃষ্ট আমলকে, আপনার অতুলনীয় মর্যাদার পক্ষে যা ছিলো কিঞ্চিত অনুত্তমসে কারণে আপনি আজ আমা সকাশে মার্জনাপ্রার্থনা করুনঅথবাঃ আপনি ক্ষমাপ্রার্থনা করুন আপনার উম্মতের জন্যকেননা তাদের মধ্যে অনেকেই তো হবে গোনাহ্‌গারউল্লেখ্য, এমতো নির্দেশনার কারণেই রসুল স. প্রতিদিন সত্তরবার ক্ষমাপ্রার্থনা করতেনকোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে একশতবার ক্ষমা প্রার্থনা করার কথাএরূপ হাদিস হজরত আবু হোরায়রা, হজরত আনাস এবং হজরত শাদ্দাদ ইবনে আউস থেকে বর্ণনা করেছেন বোখারী, নাসাঈ, ইবনে মাজা, তিবরানী ও আবু ইয়ালা

লক্ষণীয়, এখানে ক্ষমাপ্রার্থনা করার আগে উল্লেখ করা হয়েছে প্রশংসাসহ পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করার কথাবিষয়টি বিসদৃশ মোটেও নয়কেননা এটাই হচ্ছে অবরোহণের (নুজুলের) প্রকৃত পদ্ধতিআর এমতো পদ্ধতি কার্যকর করতে গেলে কিছু না কিছু ভুল হতেই পারেতাই সব শেষে বলা হয়েছে ক্ষমা প্রার্থনার কথাউল্লেখ্য, এভাবে এখানে রসুল স.কে লক্ষ্য করে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে মলত তাঁর উম্মতকেইতবে উম্মতের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার সুন্নত পদ্ধতি হচ্ছে, প্রার্থনার পূর্বে পাঠ করে নিতে হবে দরূদ শরীফ

ইন্‌নাহু কানা তাও্‌ওয়াবাঅর্থ তিনি তো তওবা কবুলকারীঅর্থাৎ আল্লাহ্‌ ক্ষমাপ্রার্থীদের প্রার্থনা গ্রহণকারী তখন থেকে, যখন থেকে তিনি তাদের উপরে চাপিয়ে দিয়েছেন আমানত বহনের ভারছায়লাবী লিখেছেন, রসুল স. এর কণ্ঠে একবার এই আয়াতের পাঠ শুনে হজরত ইবনে আব্বাস কেঁদে ফেললেনতিনি স. জিজ্ঞেস করলেন, কাঁদলে কেনো? তিনি জবাব দিলেন, এই সুরায় তো রয়েছে আপনার মহাতিরোধানের সংবাদতিনি স. বললেন, তুমি ঠিকই বলেছোবায়যাবী লিখেছেন, এই সুরায় বলা হয়েছে ইসলামের আহ্বানের পরিপূর্ণতার কথাসে কারণেই বলা হয়, এখানে রয়েছে রসুল স. এর অন্তিমযাত্রার সংবাদঅন্য এক আয়াতে বিষয়টি প্রকাশ করা হয়েছে এভাবে আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম....আর এখানকার ক্ষমাপ্রার্থনা করোকথাটির মধ্যে সুস্পষ্টরূপে একথাটি ফুটে উঠেছে যে, তাঁর মহা অভিযাত্রা সন্নিকটবর্তী

বোখারী বর্ণনা করেছেন, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, মান্যবর ওমর আমাকে মহান বদরযোদ্ধাগণের অন্তর্ভূত বলে মনে করতেনএকবার এক সাধু পুরুষ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি একে বদর যোদ্ধাগণের মধ্যে গণনা করেন কেনো? এতো আমাদের সন্তানদের বয়সীওমর জবাব দিলেন, আপনারা যাদেরকে ভালো বলে জানেন, এতো তাদেরই দলেরতিনি আরো বলেছেন, একবার খলিফা ওমর বদর যোদ্ধাদেরকে নিমন্ত্রণ দিলেনতার সঙ্গে নিমন্ত্রণ জানালেন আমাকেওসর্বসমক্ষে আমার পরিচয় তুলে ধরাই ছিলো তাঁর এমতো নিমন্ত্রণের উদ্দেশ্যপানাহারপর্ব শেষে তিনি নিমনিত অতিথিবর্গকে উদ্দেশ্য করে বললেন, বলুন তো দেখি, সুরা নাসর সম্পর্কে আপনারা কে কী জানেন? একজন বললেন, যেহেতু আল্লাহ্‌ আমাদেরকে সাহায্য করেছেন এবং বিজয় দান করেছেন, সেহেতু আমাদেরকে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনারআর একজন বললেন, আমি এ সম্পর্কে কিছুই জানি নাঅন্যেরা রইলেন নীরবশেষে মান্যবর খলিফা আমাকে বললেন, এবার তুমি কী জানো, বলোআমি বললাম, সুরাখানি রসুল স. এর মহাতিরোভাবের ইঙ্গিতবাহী, আল্লাহ্‌ এখানে তাঁর রসুলকে জানাচ্ছেনঃ হে আমার প্রিয়তম রসুল! আমার সাহায্য সমাগতমক্কাবিজয়ও সুসম্পন্নসুতরাং আপনি আল্লাহ্‌র সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করুন, তাঁর সকাশে ক্ষমাপ্রার্থনা করুন আপনার প্রিয় উম্মতের জন্য, যিনি পরম ক্ষমাপরবশ ও ক্ষমাপ্রার্থীদের প্রার্থনা গ্রহণকারীআর আপনি প্রস্তুতি গ্রহণ করুন পরকালযাত্রারসে পরমলগ্ন যে অত্যাসন্ন খলিফা মহোদয় আমার কথা শুনে বললেন, বৎস! তুমি যা জানো, আমিও তা-ই জানি

ইমাম আহমদের বর্ণনায় এসেছে, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, যখন সুরা ইজা জ্বাআঅবতীর্ণ হলা, তখন রসুল স. আমাকে একানেডেকে বললেন, আমাকে এবার অন্তিমযাত্রার সংবাদ দেওয়া হলো

হজরত আনাস থেকে তিরমিজি বর্ণনা করেছেন, সুরা ইজা জ্বাআ নাসরুল্লহ্‌সমগ্র কোরআনের এক চতুর্থাংশজননী আয়েশা থেকে বোখারী উল্লেখ করেছেন, রসুল স. তাঁর রুকু ও সেজদায় পাঠ করতেন সুবহানাকা আল্লহুম্মা ওয়া বিহামদিকা আল্লহুম্মাগ্‌ফিরতাঁর নিকট থেকে মুসলিম বর্ণনা করেছেন, রসুল স. অত্যধিক পরিমাণে পাঠ করতেন সুবহানাল্লহি ওয়া বিহামদিহী আস্‌তাগফিরুল্লহা ওয়া আতূবু ইলাইহিরসুল স. বলেছেন, আমার পরম প্রভুপালয়িতা আমাকে বললেন, অচিরেই আপনি আপনার উম্মতের মধ্যে দেখতে পাবেন একটি নিদর্শনতখন পাঠ করবেন সুবহানাল্লহি ওয়া বিহামদিহী আস্‌তাগফিরুল্লহা ওয়া আতূবু ইলাইহিআমি সে নিদর্শন প্রদর্শন করেছিআর তা হচ্ছে ইজা জ্বাআ নাসরুল্লহি...... ইন্‌নাহু কানা তাওওয়াবাহাসান বসরী বলেছেন, যখন রসুল স. এর অন্তিমযাত্রার সময় হলো, তখন আল্লাহ্‌পাক তাঁকে জানালেন, আপনার শেষ বিদায়ের সময় অতীব সন্নিকটবর্তীসুতরাং আপনি অধিক হারে বর্ণনা করতে থাকুন আমার সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমাঅভিমুখী হন কেবল আমার, যেনো আপনার পৃথিবীর জীবনের সমাপ্তি ঘটে অত্যুত্তম পুণ্যসম্ভার সহযোগেনিশ্চয় আমি আমার প্রতি অভিমুখীদেরকে গ্রহণ করি পরম সমাদরেকাতাদা ও মুকাতিল বলেছেন, এই সুরা অবতীর্ণ হওয়ার পর রসুল স. পৃথিবীর আলো-ছায়ায় বাস করেছিলেন আর মাত্র দুইটি বছর

No comments: