তৃতীয় আয়াতে বলা হয়েছেঃ ‘তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কোরো এবং তাঁর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা কোরো, তিনি তো তওবা কবুলকারী’।
এখানে ‘ফাসাব্বিহ্ বিহামদি রব্বিক’ অর্থ তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কোরো। কথাটি প্রথম আয়াতের ‘যখন’ (ইজা) শর্তের পরিণতি। আর এখানকার ‘বিহামদি’ কথাটির সম্পর্ক রয়েছে একটি অনুক্ত ক্রিয়ার সঙ্গে। এভাবে কথাটি দাঁড়ায়ঃ হে আমার প্রিয়তম নবী! আপনি তখন পাঠ করুন ‘সুবহানাল্লহি ওয়া বিহামদিহী’। অর্থাৎ আল্লাহ্ আপনাকে যে অচিন্তনীয় মহাবিজয় দান করে আপনাকে অনুগৃহীত করলেন, তার জন্য আপনি বর্ণনা করুন তাঁর প্রশংসা, পবিত্রতা ও মহিমা।
হজরত আনাস বলেছেন, মহানবী স. যখন মহাবিজয়ীর বেশে মক্কা নগরীতে প্রবেশ করেছিলেন, তখন জনতা তাঁর অতুলনীয় মর্যাদা ও সম্ভ্রম দর্শন করে বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলো। আর তিনি স. এ দৃশ্য দেখে মনে মনে আল্লাহ্কে জানাচ্ছিলেন অসংখ্য কৃতজ্ঞতা, যা প্রকাশ পাচ্ছিলো তাঁর বাহ্যিক অবয়বেও। তিনি স. তাঁর মস্তক মোবারক করে রেখেছিলেন নিম্নমুখী। মনে হচ্ছিলো তা বুঝি স্পর্শ করে আছে উটের গদি। অত্যুত্তম সূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন হাকেম। হজরত আবু হোরায়রা থেকে আবু ইয়ালা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. এর সবিনয় অবনমিত মস্তক তখন স্পর্শ করেছিলো তাঁর উটের আসনের মধ্যবর্তী স্থান। আর যখন লোকেরা দলে দলে এসে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করলো, তখন তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে উচ্চারণ করেছিলেন, হে আমার পরমতম আরাধ্য! পারলৌকিক জীবনই হচ্ছে প্রকৃত জীবন।
‘ওয়াস্তাগফিরহু’ অর্থ এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কোরো। একথার অর্থঃ হে আমার প্রিয়তম রসুল! আপনি আপনার উম্মতের প্রতি অতিমমতাময়তার কারণে কখনো কখনো অত্যুৎকৃষ্ট আমল ছেড়ে গ্রহণ করেছিলেন কেবল উৎকৃষ্ট আমলকে, আপনার অতুলনীয় মর্যাদার পক্ষে যা ছিলো কিঞ্চিত অনুত্তম। সে কারণে আপনি আজ আমা সকাশে মার্জনাপ্রার্থনা করুন। অথবাঃ আপনি ক্ষমাপ্রার্থনা করুন আপনার উম্মতের জন্য। কেননা তাদের মধ্যে অনেকেই তো হবে গোনাহ্গার। উল্লেখ্য, এমতো নির্দেশনার কারণেই রসুল স. প্রতিদিন সত্তরবার ক্ষমাপ্রার্থনা করতেন। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে একশতবার ক্ষমা প্রার্থনা করার কথা। এরূপ হাদিস হজরত আবু হোরায়রা, হজরত আনাস এবং হজরত শাদ্দাদ ইবনে আউস থেকে বর্ণনা করেছেন বোখারী, নাসাঈ, ইবনে মাজা, তিবরানী ও আবু ইয়ালা।
লক্ষণীয়, এখানে ক্ষমাপ্রার্থনা করার আগে উল্লেখ করা হয়েছে প্রশংসাসহ পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করার কথা। বিষয়টি বিসদৃশ মোটেও নয়। কেননা এটাই হচ্ছে অবরোহণের (নুজুলের) প্রকৃত পদ্ধতি। আর এমতো পদ্ধতি কার্যকর করতে গেলে কিছু না কিছু ভুল হতেই পারে। তাই সব শেষে বলা হয়েছে ক্ষমা প্রার্থনার কথা। উল্লেখ্য, এভাবে এখানে রসুল স.কে লক্ষ্য করে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে ম�লত তাঁর উম্মতকেই। তবে উম্মতের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার সুন্নত পদ্ধতি হচ্ছে, প্রার্থনার পূর্বে পাঠ করে নিতে হবে দরূদ শরীফ।
‘ইন্নাহু কানা তাও্ওয়াবা’ অর্থ তিনি তো তওবা কবুলকারী। অর্থাৎ আল্লাহ্ ক্ষমাপ্রার্থীদের প্রার্থনা গ্রহণকারী তখন থেকে, যখন থেকে তিনি তাদের উপরে চাপিয়ে দিয়েছেন আমানত বহনের ভার। ছায়লাবী লিখেছেন, রসুল স. এর কণ্ঠে একবার এই আয়াতের পাঠ শুনে হজরত ইবনে আব্বাস কেঁদে ফেললেন। তিনি স. জিজ্ঞেস করলেন, কাঁদলে কেনো? তিনি জবাব দিলেন, এই সুরায় তো রয়েছে আপনার মহাতিরোধানের সংবাদ। তিনি স. বললেন, তুমি ঠিকই বলেছো। বায়যাবী লিখেছেন, এই সুরায় বলা হয়েছে ইসলামের আহ্বানের পরিপূর্ণতার কথা। সে কারণেই বলা হয়, এখানে রয়েছে রসুল স. এর অন্তিমযাত্রার সংবাদ। অন্য এক আয়াতে বিষয়টি প্রকাশ করা হয়েছে এভাবে ‘আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম....’। আর এখানকার ‘ক্ষমাপ্রার্থনা করো’ কথাটির মধ্যে সুস্পষ্টরূপে একথাটি ফুটে উঠেছে যে, তাঁর মহা অভিযাত্রা সন্নিকটবর্তী।
বোখারী বর্ণনা করেছেন, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, মান্যবর ওমর আমাকে মহান বদরযোদ্ধাগণের অন্তর্ভূত বলে মনে করতেন। একবার এক সাধু পুরুষ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি একে বদর যোদ্ধাগণের মধ্যে গণনা করেন কেনো? এতো আমাদের সন্তানদের বয়সী। ওমর জবাব দিলেন, আপনারা যাদেরকে ভালো বলে জানেন, এতো তাদেরই দলের। তিনি আরো বলেছেন, একবার খলিফা ওমর বদর যোদ্ধাদেরকে নিমন্ত্রণ দিলেন। তার সঙ্গে নিমন্ত্রণ জানালেন আমাকেও। সর্বসমক্ষে আমার পরিচয় তুলে ধরাই ছিলো তাঁর এমতো নিমন্ত্রণের উদ্দেশ্য। পানাহারপর্ব শেষে তিনি নিমনি�ত অতিথিবর্গকে উদ্দেশ্য করে বললেন, বলুন তো দেখি, সুরা নাসর সম্পর্কে আপনারা কে কী জানেন? একজন বললেন, যেহেতু আল্লাহ্ আমাদেরকে সাহায্য করেছেন এবং বিজয় দান করেছেন, সেহেতু আমাদেরকে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনার। আর একজন বললেন, আমি এ সম্পর্কে কিছুই জানি না। অন্যেরা রইলেন নীরব। শেষে মান্যবর খলিফা আমাকে বললেন, এবার তুমি কী জানো, বলো। আমি বললাম, সুরাখানি রসুল স. এর মহাতিরোভাবের ইঙ্গিতবাহী, আল্লাহ্ এখানে তাঁর রসুলকে জানাচ্ছেনঃ হে আমার প্রিয়তম রসুল! আমার সাহায্য সমাগত। মক্কাবিজয়ও সুসম্পন্ন। সুতরাং আপনি আল্লাহ্র সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করুন, তাঁর সকাশে ক্ষমাপ্রার্থনা করুন আপনার প্রিয় উম্মতের জন্য, যিনি পরম ক্ষমাপরবশ ও ক্ষমাপ্রার্থীদের প্রার্থনা গ্রহণকারী। আর আপনি প্রস্তুতি গ্রহণ করুন পরকালযাত্রার। সে পরমলগ্ন যে অত্যাসন্ন। খলিফা মহোদয় আমার কথা শুনে বললেন, বৎস! তুমি যা জানো, আমিও তা-ই জানি।
ইমাম আহমদের বর্ণনায় এসেছে, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, যখন সুরা ‘ইজা জ্বাআ’ অবতীর্ণ হলা, তখন রসুল স. আমাকে একানে� ডেকে বললেন, আমাকে এবার অন্তিমযাত্রার সংবাদ দেওয়া হলো।
হজরত আনাস থেকে তিরমিজি বর্ণনা করেছেন, সুরা ‘ইজা জ্বাআ নাসরুল্লহ্’ সমগ্র কোরআনের এক চতুর্থাংশ। জননী আয়েশা থেকে বোখারী উল্লেখ করেছেন, রসুল স. তাঁর রুকু ও সেজদায় পাঠ করতেন ‘সুবহানাকা আল্লহুম্মা ওয়া বিহামদিকা আল্লহুম্মাগ্ফির’। তাঁর নিকট থেকে মুসলিম বর্ণনা করেছেন, রসুল স. অত্যধিক পরিমাণে পাঠ করতেন ‘সুবহানাল্লহি ওয়া বিহামদিহী আস্তাগফিরুল্লহা ওয়া আতূবু ইলাইহি’। রসুল স. বলেছেন, আমার পরম প্রভুপালয়িতা আমাকে বললেন, অচিরেই আপনি আপনার উম্মতের মধ্যে দেখতে পাবেন একটি নিদর্শন। তখন পাঠ করবেন ‘সুবহানাল্লহি ওয়া বিহামদিহী আস্তাগফিরুল্লহা ওয়া আতূবু ইলাইহি’। আমি সে নিদর্শন প্রদর্শন করেছি। আর তা হচ্ছে ‘ইজা জ্বাআ নাসরুল্লহি...... ইন্নাহু কানা তাওওয়াবা’। হাসান বসরী বলেছেন, যখন রসুল স. এর অন্তিমযাত্রার সময় হলো, তখন আল্লাহ্পাক তাঁকে জানালেন, আপনার শেষ বিদায়ের সময় অতীব সন্নিকটবর্তী। সুতরাং আপনি অধিক হারে বর্ণনা করতে থাকুন আমার সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা। অভিমুখী হন কেবল আমার, যেনো আপনার পৃথিবীর জীবনের সমাপ্তি ঘটে অত্যুত্তম পুণ্যসম্ভার সহযোগে। নিশ্চয় আমি আমার প্রতি অভিমুখীদেরকে গ্রহণ করি পরম সমাদরে। কাতাদা ও মুকাতিল বলেছেন, এই সুরা অবতীর্ণ হওয়ার পর রসুল স. পৃথিবীর আলো-ছায়ায় বাস করেছিলেন আর মাত্র দুইটি বছর।
No comments:
Post a Comment