এরপর রসুল স. কাবাগৃহের চাবি সংগ্রহের জন্য হজরত বেলালকে পাঠিয়ে দিলেন চাবিরক্ষক ওসমানের কাছে। ওসমান বললো, চাবি তো আমার মায়ের কাছে। একথা বলেই সে তার মায়ের কাছে চাবি চাইলো। তার মা বললো, লাত ও উজ্জার শপথ! আমি কাবার চাবি তোমার হাতে কখনোই দিবো না। সে বললো, মা! চাবিটা দিয়ে দাও। আজ লাত উজ্জা কেউ নেই। চাবি না দিলে আমার গর্দান তো যাবেই, আমার এই ভাইয়ের গর্দানও আস্ত থাকবে না। ওদিকে তাঁদের ফিরে আসতে বিলম্ব হচ্ছে দেখে রসুল স. সেখানে পাঠিয়ে দিলেন হজরত আবু বকর সিদ্দীক এবং হজরত ওমর ফারুককে। তাঁরা ওসমানের বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে তাকে ডাকলেন। তাঁদের কণ্ঠস্বর শুনে তার মা বললো, ওসমান! এই নাও চাবি। ওদের হাতে চাবি দেওয়ার চেয়ে তোমার হাতে দেওয়াই ভালো। এভাবে চাবি উদ্ধার হলো এবং তা যথাসময়ে হস্তগত হলো রসুল স. এর। তিনি স. ওই চাবি দিয়ে কাবাগৃহের বন্ধ তালা খুললেন। ওসমান ও তালহা বললো, হে আল্লাহ্র রসুল! এ অধিকার তো ছিলো আমাদেরই। তিনি স. তাদের কথায় ভ্রূক্ষেপ করলেন না।
এরপর রসুল স. হজরত ওমরকে আদেশ করলেন, কাবাগৃহের ভিতর থেকে সমস্ত বিগ্রহ ও চিত্র অপসারিত করো। নির্দেশ প্রতিপালিত হলো। শুরু হলো ধোয়া-মোছার কাজ। এভাবে একসময় আল্লাহ্র ঘর ও তৎসন্নিহিত প্রাঙ্গণ থেকে চিরতরে অপসারিত হলো বিগ্রহ-ধর্ম-সংস্কৃতির অপবিত্র চিহ্নাবলী। রসুল স. হজরত জায়েদ এবং হজরত তালহাকে নিয়ে কাবাগৃহের ভিতরে প্রবেশ করলেন। মধ্যখানে দাঁড়িয়ে পাঠ করলেন দুই রাকাত নামাজ। বললেন, এটাই কেবলা। তারপর দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। বললেন, আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোনো উপাস্য নেই। তিনি তাঁর প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিকে সত্যে পরিণত করেছেন। তাঁর বান্দাকে বিজয়ী করেছেন তাঁর প্রতিপক্ষীয়দের উপর। শোনো হে জনতা! আজ থেকে মূর্খতার যুগের সকল অপপ্রথা অবলোপিত হলো। পরিত্যক্ত হলো প্রতিশোধমূলক রক্তের অধিকার। আর সুদ ইত্যাদি পাওনা-দেনাকেও আজ আমি পদদলিত করলাম। সর্বপ্রথম আমি নিজে রবীয়া ইবনে হারেছের রক্তের দাবি প্রত্যাহার করে নিলাম। তবে কাবাগৃহের রক্ষণাবেক্ষণ ও হজযাত্রীদের পানি সরবরাহের দায়িত্বের কোনো পরিবর্তন হবে না। যারা এতোদিন ধরে এ দায়িত্ব পালন করতো, তারাই থাকবে তাদের স্ব স্ব দায়িত্বে।
আরো শোনো, লাঠি-সোটার আঘাতে নিহত, অথবা ভুলক্রমে, কিংবা ইচ্ছাকৃত হত্যাসদৃশ হত্যার রক্তপণ একশত উট। তার মধ্যে চল্লিশটিকে হতে হবে গর্ভবর্তী। অংশীদারকে লক্ষ্য করে ওছিয়ত করা যাবে না। নবজাতক হবে তার, যার শয্যায় সে জন্মগ্রহণ করেছে। ব্যভিচারের শাস্তি মৃত্যু পর্যন্ত প্রস্তরাঘাত। স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রী তার সম্পদ অন্যকে দিতে পারবে না। অমুসলিমদের বিপক্ষে সকল মুসলমান একটি বাহুর মতো। সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীদের বিপক্ষে কোনো বিশ্বাসী অথবা আশ্রিত সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীকে (জিম্মিকে) হত্যা করা যাবে না। বিপরীত ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে অংশীদারিত্ব অচল। জাকাত-সংগ্রাহকরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে জাকাত সংগ্রহ করবে। জাকাতদাতাদেরকে জাকাত-দপ্তরে ডেকে আনা যাবে না। তারাও জাকাত-সংগ্রাহকদেরকে উত্যক্ত করতে পারবে না। কোনো রমণীর মা বা খালাকে বিবাহ করার পর আর তাকে বিবাহ করা যাবে না।
সাক্ষী উপস্থিত করা দাবিদারদের দায়িত্ব। সাক্ষী উপস্থিত না করতে পারলে শপথ করতে হবে। শপথ কার্যকর করা হবে দাবি অস্বীকারকারীর উপর। বিবাহ সিদ্ধঃ এমন কোনো পুরুষের সঙ্গে রমণীরা ভ্রমণে বের হতে পারবে না। ফজর ও আসরের নামাজ সমাপন করার পর আর কোনো নফল নামাজ আদায় করা যাবে না। দু’দিন রোজা রাখা নিষেধঃ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন। নিষেধ মাত্র একটি লুঙ্গি, অথবা মাত্র একটি জামা পরিধানের। কেননা এতে করে লজ্জাস্থান উন্মুক্ত হওয়ার রয়েছে সমূহ সম্ভাবনা। তেমনি নিষেধ একটি চাদর অথবা একটি কম্বল এমনভাবে পরিধান করাতে, যাতে দুই বাহু হয়ে যায় আবদ্ধ, যাতে প্রয়োজনের সময়েও হাত বের করা যায় না।
হে কুরায়েশ জনগোষ্ঠী! আল্লাহ্ দয়া করে মূর্খতার যুগের অহমিকা ও জাত্যাভিমান থেকে তোমাদেরকে মুক্ত করেছেন। মনে রেখো, তোমরা সকলে এক আদমের সন্তান। আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে। সুতরাং তোমাদের গর্ব করার কিছু নেই। এরপর তিনি স. আবৃত্তি করলেন ‘হে মানবজাতি! আমি তো তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে.....’ শেষ পর্যন্ত।
এবার বলো, হে মক্কাবাসী! তোমরা আমার কাছ থেকে কীরূপ আচরণ আশা করো? জনতা জবাব দিলো, আপনি সজ্জন, সাধু, আপনার পিতা-পিতামহও ছিলেন এরকমই। সুতরাং আপনার কাছ থেকে আমরা সেরকমই শিষ্টাচার আশা করি। তিনি স. বললেন, আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ্ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন। তিনি তো দয়ার পারাবার। যাও, তোমরা সকলেই মুক্ত। সভা শেষ হলো। জনতা গাত্রোত্থান করলো। তাদেরকে দেখে মনে হলো, যেনো তারা এই মাত্র উঠে এসেছে কবর থেকে।
হজরত আবু হোরায়রা থেকে বোখারী বর্ণনা করেছেন, অজ্ঞতার যুগে বনী লাইছের জনৈক ব্যক্তি হত্যা করেছিলো বনী খাজাআর জনৈক ব্যক্তিকে। মক্কা বিজয়ের দিবসে সুযোগ পেয়ে বনী খাজাআ তাদের অপ-প্রতিশোধ চরিতার্থ করলো। তারা হত্যা করলো বনী লাইছের এক লোককে। রসুল স. একথা জানতে পেরে তাঁর ভাষণে বললেন, হে জনতা! দ্যাখো, আবরাহাবাহিনীকে আল্লাহ্ এ শহরে প্রবেশই করতে দেননি। অথচ তিনি তাঁর রসুল ও তাঁর অনুগামীগণকে মক্কাবাসীদের উপরে বিজয়ী করেছেন। ভালো করে শুনে রাখো, আমার পূর্বে জোরপূর্বক মক্কায় প্রবেশ করে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি। এরকম অধিকার আমার পরেও কেউ পাবে না। আমার পূর্বে এখানে রক্তপাত ঘটানো কারো জন্য বৈধ ছিলো না। এরপরেও বৈধ হবে না কারো জন্য। আর আমার জন্যও এ কাজ বৈধ ছিলো কেবল আজকের দিনের কিয়দংশের জন্য। এরপর থেকে চিরদিনের মতো এখানে রক্তপাত হারাম। এখানকার বৃক্ষ, লতা-গুল্ম কিছুই কর্তন করা যাবে না। কারো পরিত্যক্ত সম্পদ জোরপূর্বক অধিকার করলেও নয়। আরো শোনো, নরহত্যার বিনিময় রক্তপণ, অথবা হত্যা। আবু শাহ নামক জনৈক ইয়েমেনী ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহ্র রসুল। একথাটা আমাকে লিখে দিন। রসুল স. জনৈক সাহাবীকে নির্দেশ দিলেন বিধানটি লিখে দিতে। একজন কুরায়েশী দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহ্র প্রত্যাদেশবাহক! বৃক্ষ-লতা-গুল্ম কর্তনের বিধান থেকে ইজখের ঘাসকে বাদ দিলে ভালো হয়। এটা আমাদের সাংসারিক প্রাত্যহিক কর্ম সমাধার জন্য অত্যাবশ্যক। তিনি স. বললেন, ঠিক আছে, ইজখের ঘাস থেকে কর্তনের নিষিদ্ধতা উঠিয়ে নেওয়া হলো।
এক বর্ণনায় এসেছে, এক লোক তখন দাঁড়িয়ে বললো, হে মহানবী! আমি এক রমণীকে রক্ষিতা হিসেবে রেখেছিলাম। তার কয়েকটি সন্তানও আছে। এখন তার প্রতি আমার কর্তব্য কী? তিনি স. বললেন, বিবাহ ব্যতিরেকে কোনো রমণীকে রক্ষিতা রাখা যাবে না। এরকম রমণীর সন্তান্তসন্ততি হবে অবৈধ। বংশপরিচয় ও উত্তরাধিকারিত্ব থেকে তারা হবে বঞ্চিত। আমার ধারণা, তোমরা আমার কথা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছো। আমি আল্লাহ্ সকাশে আমার ও তোমাদের জন্য মার্জনা যাচনা করি। রসুল স. ক্ষান্ত হলেন। এরপর তাঁর নির্দেশে জনৈক ঘোষক ঘোষণা করলেন, কোনো মুসলমানের গৃহে প্রতিমা থাকতে পারবে না। যদি থাকে তবে সেগুলোকে ভেঙেচুরে নিক্ষেপ করতে হবে দূরে।
জোহরের নামাজের সময় হলো। হজরত বেলাল নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে কাবাগৃহের ছাদে উঠে আজান দিলেন। কাবাপ্রাঙ্গণে উপবিষ্ট আবু সুফিয়ান, খালেদ ইবনে উসাইয়েদ ও হারেছ ইবনে হিশামের জাত্যাভিমান বিপর্যস্ত হলো। তাদের মনেহলো, কালো মানুষের কাবাগৃহের ছাদে ওঠার অধিকার থাকবে কেনো? খালেদ ইবনে উসাইয়েদ বলেই ফেললো, আল্লাহ্ আমার পিতার সম্মান রক্ষা করেছেন। এরকম অসহনীয় দৃশ্য দর্শনের পূর্বে তাঁকে তুলে নিয়েছেন পৃথিবী থেকে। কেউ কেউ বললো, এখন বেঁচে থাকার আর কোনো অর্থ নেই। হজরত আবু সুফিয়ান বললেন, আমি কোনো মন্তব্যই করবো না। বললেন এখানকার পাথরগুলোই একথা রাষ্ট্র করে দিবে। হজরত জিবরাইল তাদের এমতো কথোপকথনের সংবাদ ঠিকই জানিয়ে দিলেন রসুল স.কে। রসুল স. তাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, তোমরা যা কিছু বললে, তা আমাকে জানানো হয়েছে। তোমরা তো বললে এই কথাগুলো। ঠিক বলিনি? আবু সুফিয়ান তার সাথীদেরকে বললেন, কী, আমি কি বলিনি, এখানকার পাথরগুলোও আমাদের কথা প্রচার করে দিবে? খালেদ ও হারেছ বললো, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি সত্যি সত্যিই আল্লাহ্র রসুল।
হজরত আবু বকর সিদ্দীক তাঁর দৃষ্টিহীন পিতাকে হাত ধরে রসুল স. এর কাছে হাজির করলেন। রসুল স. বললেন, আবু বকর। তিনি তো বয়োবৃদ্ধ। তাঁকে এভাবে কষ্ট দিলে কেনো? আমি তো নিজেই তাঁর কাছে যেতে পারতাম। রসুল স. সস্নেহে তাঁর বুকে পিঠে হাত বুলালেন। তিনিও অনায়াসে ইসলাম গ্রহণ করলেন। তখন তাঁর মস্তক ও শ্মশ্রুর কেশরাজি হয়ে গিয়েছিলো ছাগামফূলের মতো শাদা। রসুল স. সেদিকে ইঙ্গিত করে বললেন, কালো রঙ ছাড়া অন্য যে কোনো রঙ দ্বারা রঙ পরিবর্তন করে দিয়ো।
রসুল স. উপবেশন করলেন একটি উঁচু স্থানে। অপেক্ষাকৃত নিচু স্থানে বসলেন হজরত ওমর। দলে দলে লোক এসে রসুল স. এবং হজরত ওমরের হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করতে লাগলো। পুরুষদের পালা শেষ হলো। এগিয়ে এলো মেয়েরা। তাদের নিকট থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করা হলো তাদের হস্তস্পর্শ না করেই, কেবল মুখে মুখে। মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, হজরত আবু হোরায়রা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. সাফা পর্বতে আরোহণ করলেন। কাবাগৃহের দিকে চেয়ে ভাবের আবেগে আপ্লুত হলেন। হাত তুলে শুরু করলেন অন্তরঙ্গ প্রার্থনা। পর্বতের সানুদেশে দণ্ডায়মান আনসার সাহাবীগণ সেই অপূর্ব মায়াভরা দৃশ্য দেখে এই ভেবে শংকিত হলেন যে, রসুল স. এর জন্মভূমির আকর্ষণ উত্তাল হয়ে উঠেছে। এটাই তো স্বাভাবিক। তিনি মনে হয় আমাদের সঙ্গে আর মদীনায় প্রত্যাবর্তন করবেন না। প্রার্থনা শেষ হলো। রসুল স. নিচে নেমে এসে মিলিত হলেন আনসারগণের সঙ্গে। সম্বোধন করলেন, হে আনসার সম্প্রদায়! তাঁরা উচ্চকণ্ঠে জবাব দিলেন, হে মহানবী! এই যে আমরা। তিনি স. বললেন, তোমরা তো এসকল কথা ভেবে শংকিত হয়েছিলে, না? তাঁরা স্বীকার করলেন, হে মহান রসুল! আপনি ঠিকই বলেছেন। তিনি স. বললেন, নিশ্চয় তোমাদের আশংকা ভিত্তিহীন। আমি তো আল্লাহ্র সনে�াষ কামনায় তোমাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছি। তোমাদের ও আমার জীবন মরণ সব একাকার। আনসারগণ কেঁদে ফেললেন।
বললেন, হে আল্লাহ্র প্রিয়তম জন! আপনার প্রতি আমাদের উদগ্র ভালোবাসাই আমাদেরকে শংকাগ্রস্ত ও বিমর্ষ করে তুলেছিলো। আমরা আমাদের অপভাবনার জন্য মার্জনাপ্রার্থী। তিনি স. তাঁদের অজুহাত গ্রহণ করলেন।
মক্কাবিজয়ের দিবসে রসুল স. তিন ব্যক্তির নিকট থেকে আর্থিক ঋণ গ্রহণ করে তা বণ্টন করে দিয়েছিলেন অস্বŽছল সাহাবীগণের মধ্যে। সাফওয়ান ইবনে উয়াইনার নিকট থেকে নিয়েছিলেন পঞ্চাশ হাজার, আবদুল্লাহ্ ইবনে রবীয়ার নিকট থেকে চল্লিশ হাজার এবং হুয়াইতাব ইবনে আবদুল উজ্জার নিকট থেকে চল্লিশ হাজার। এ সকল ঋণ তিনি পরিশোধ করেছিলেন হুনায়েন যুদ্ধের পর। রসুল স. সেদিন বলেছিলেন, আজকের দিনের পর মক্কার উপরে আর কোনো অভিযান পরিচালিত হবে না। হিজরতের প্রয়োজনও আজ থেকে শেষ হয়ে গেলো।
আবু ইয়ালা ও আবু নাঈমের বর্ণনায় এসেছে, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, মক্কাবিজয়ের পর শয়তান উচ্চস্বরে চীৎকার করে কাঁদতে শুরু করে। তার সাঙ্গপাঙ্গরা এর কারণ জিজ্ঞেস করলে সে জবাবে বলে, আর কখনো আশা কোরো না যে, উম্মতে মোহাম্মদী শিরিকের দিকে ফিরে আসবে। মাকহুল সূত্রে ইবনে আবী শায়বা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. যখন বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রবেশ করলেন, তখন ইবলিস তাঁর দিকে ছুঁড়ে মারতে লাগলো বিরাট বিরাট অগ্নিকুণ্ড। হজরত জিবরাইল তৎক্ষণাৎ রসুল স.কে একটি দোয়া শিখিয়ে দিলেন। দোয়াটি এরকম ‘আঊ’জু বিকালিমাতিললাহিত্ তামমাতিল লাতী লা ইউজ্বাউইবু হুন্না বাররুউঁ ওয়ালা ফাজ্বির মিন শররি মা নাযালা মিনাস সাজা ওয়ামা ইয়া’রুজ্বু ফীহা ওয়ামিন শাররি মা বাছ্ছা ফীল আরদ্ব ওয়ামা ইয়াখরুজ্বু মিনহা ওয়া মিন শাররিল লাইলি ওয়ান নাহার ওয়া মিন শাররি কুললি ত্বরিক ইয়াত্বরুকু বি খইর ইয়া রহমান’। ইবনে আবী বাযযার সূত্রে বায়হাকী বর্ণনা করেছেন, মক্কাবিজয়ের দিন দেখা গেলো, বিদখুটে কদাকার এক হাবশী বৃদ্ধা তার নিজের মাথার চুল ছিঁড়ছে এবং চীৎকার করে কাঁদছে। রসুল স.কে যখন তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো তখন তিনি স. বললেন, সে ছিলো পৌত্তলিক কুরায়েশদের আরাধ্য দেবী। সে বলছে, তোমাদের শহরে আজ থেকে আমার উপাসনা হয়ে গেলো চিররুদ্ধ।
সেদিন প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হলো ‘আল্লাহ্ তোমাদেরকে আদেশ করছেন, তোমাদের নিকটে রক্ষিত গচ্ছিত সম্পদ তার প্রাপককে ফিরিয়ে দাও’। রসুল স. তখন ওসমান ইবনে আবী তালহাকে ডেকে এনে তার হাতেই পুনঃ অর্পণ করলেন কাবা গৃহের চাবি। বললেন, কিয়ামত পর্যন্ত এ চাবি রক্ষিত হতে থাকবে তোমার বংশধরের মধ্যেই। জালেম ব্যতীত অন্য কেউ তোমাদের কাছ থেকে এ চাবি ছিনিয়ে নিতে পারবে না। চাবিবহনের এ মহান দায়িত্বের জন্য আল্লাহ্ তোমাদেরকেই মনোনীত করেছেন। এই উপলক্ষে যা কিছু তোমাদের হস্তগত হবে, তা তোমাদের জন্য বৈধ। এরকমও বর্ণিত হয়েছে যে, হজরত জিবরাইল তখন বলেছিলেন, যতোদিন পর্যন্ত এ গৃহ স্থায়ী থাকবে, ততোদিন পর্যন্ত এ গৃহের তত্ত্বাবধায়নের দায়িত্ব পালন করবে ওসমান ও তাঁর বংশধরেরা। উল্লেখ্য, হজরত ওসমান পরলোক গমনের প্রাক্কালে কাবাগৃহের চাবি হস্তান্তর করেন তাঁর ভাই হজরত শায়বার হাতে। তাঁর বংশধরেরাই এ পর্যন্ত চাবি বহন করে আসছেন। বহন করবেন মহাপ্রলয়কাল পর্যন্ত।
বোখারীর বর্ণনায় এসেছে, রসুল স. মক্কায় অবস্থান করেছিলেন ঊনিশ দিন। ওই সময় তিনি নামাজ আদায় করতেন কসর হিসেবে। আবু দাউদের বর্ণনায় এসেছে, তিনি স. তখন মক্কায় অবস্থান করেছিলেন সতেরো রাত এবং বোখারীর অপর বর্ণনায় এবং তিরমিজির বিবরণে বলা হয়েছে, তিনি স. তখন মক্কায় যাপন করেছিলেন আঠারো রাত। এমতো বর্ণনাবৈষম্য নিরসনার্থে বলা যায়, আগমন ও প্রস্থানের দিন বিয়োগ করলে সতেরো রাতই হয়, আর যোগ করলে হয় ঊনিশ দিন। আর প্রহর হিসেবে গণনা করলে হয় আঠারো।
মক্কাবিজয়ের পর সমগ্র আরব স্তম্ভিত হয়ে গেলো। লোকেরা বলাবলি করতে লাগলো, যে আল্লাহ্ আবরাহার হস্তিযুথকে ধ্বংস করে দিয়েছেন, সেই আল্লাহ্ই মোহাম্মদকে দান করলেন মহাবিজয়। এখন তোমরাই বলো, তাঁর কর্তৃত্ব স্বীকার করা ছাড়া আমাদের গত্যন্তর আছে কি? সত্যি সত্যিই তিনি আল্লাহ্ কর্তৃক প্রেরিত রসুল। এরকম কথাবার্তা ও সিদ্ধান্ত চলতে লাগলো বিভিন্ন গোত্র-উপগোত্রগুলোর মধ্যে। শেষে সকলে একে একে দ্বিধাহীন চিত্তে এসে আশ্রয় গ্রহণ করতে লাগলো ইসলামের চির-সুশীতল ছায়ায়। এই সুরার দ্বিতীয় আয়াতে সে কথাটিই বলে দেওয়া হয়েছে।
বলা হয়েছে ‘এবং তুমি মানুষকে দলে দলে আল্লাহ্র দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবে’। ইকরামা ও মুকাতিল বলেছেন, এখানে ‘মানুষ’ অর্থ ইয়েমেনবাসী। রসুল স. একবার বলেছিলেন, ইয়েমেনবাসীরা তোমাদের কাছে এসেছে। এরা অতীব বিনম্র এবং ইমান গ্রহণের ক্ষেত্রে কোমল হৃদয়বিশিষ্ট। জ্ঞানের উৎপত্তি ইয়েমেন দেশে। শোনো, উটের মালিকের কাছ থেকে প্রকাশ পায় উন্নাসিকতা ও আত্মম্ভরিতা এবং ছাগলের মালিকের নিকট থেকে প্রকাশ পায় সহিষ্ণুতা ও শিষ্টাচার।
No comments:
Post a Comment