সূরা নাসর
এই সুরাখানিতে রয়েছে মাত্র ৩টি আয়াত। এর অবতরণ স্থল মহাপুণ্যনিকেতন মক্কা নগরী।
আবদুর রাজ্জাক তাঁর ‘মুসান্নাফ’ গ্রন্থে লিখেছেন, মুয়াম্মার সূত্রে জুহুরী বর্ণনা করেছেন, মক্কাবিজয়ের বছর শহরের নিকটে উপস্থিত হয়ে রসুল স. হজরত খালেদের নেতৃত্বে কিছুসংখ্যক সৈন্যকে পাঠালেন মক্কার ভাটি এলাকায়। সেখানে হজরত খালেদের বাহিনীর সঙ্গে কুরায়েশদের একটি দলের সংঘর্ষ উপস্থিত হলো। বিজয়ী হলেন হজরত খালেদ। এরপর রসুল স. এক ঘোষণার মাধ্যমে প্রতিপক্ষীয়দেরকে অস্ত্রসমর্পণের আদেশ দিলেন। সকলেই দলে দলে অস্ত্র সমর্পণ করতে লাগলো এবং গ্রহণ করতে লাগলো ইসলাম। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হলো এই সুরাখানি।
1. যখন আসিবে আল্লাহ্র সাহায্য ও বিজয়
2. এবং তুমি মানুষকে দলে দলে আল্লাহ্র দীনে প্রবেশ করিতে দেখিবে
3. তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁহার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করিও এবং তাঁহার নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করিও, তিনি তো তওবা কবুলকারী।
প্রথমে বলা হয়েছে ‘ইজা জ্বাআ নাসরুল্লহি ওয়াল্ফাতহ্’। মক্কাবিজয়ের সময় এই সুরা অবতীর্ণ হয়েছিলো বলেই এখানকার ‘ইজা’ (যদি) শব্দটির অর্থ করা হয়েছে ‘ইজ’। এভাবে বক্তব্যটি দাঁড়িয়েছেঃ যখন আসবে আল্লাহ্র সাহায্য ও বিজয়। অন্যান্য আয়াতেও ‘ইজা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ‘ইজ’ অর্থে। যেমন ‘ইজা জ্বাআ আম্রুনা ওয়া ফারাত তানূর’ (অবশেষে যখন এসে গেলো আমার আদেশ এবং উচছ্বসিত হয়ে উঠলো ভূপৃষ্ঠ), ‘হাত্তা ইজা বালিগা’ (যখন সে পৌঁছলো)।
‘ওয়াল ফাতহ্’ অর্থ বিজয়। অর্থাৎ মক্কাবিজয়। হজরত আবু সাঈদ খুদরী থেকে তিবরানী বর্ণনা করেছেন, মক্কাবিজয়ের দিন রসুল স. বলেছিলেন, এটা সেই দিন, আল্লাহ্ যে দিনের প্রতিশ্রুতি আমাকে দিয়েছিলেন। এরপর তিনি স. আবৃত্তি করলেন ‘ ইজা জ্বাআ নাসরুল্লহি ওয়াল ফাতহ্’।
ঐতিহাসিকেরা ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন এভাবেঃ হুদায়বিয়া নামক স্থানে রসুল স. কুরায়েশদের সঙ্গে দশ বছরের জন্য একটি অনাক্রমণ চুক্তি করলেন, যার শর্তগুলোর মধ্যে ছিলোঃ এই দশ বৎসর জনগণকে দেওয়া হবে পূর্ণনিরাপত্তা। তারা অবাধে চলাচল করতে পারবে। অন্যান্য গোত্র তাদের ইচ্ছামতো যে কোনো দলে যোগদান করতে পারবে। এই শর্তটির কারণে আরবের বিভিন্ন গোত্র তাদের ইচ্ছামতো যোগ দিতে লাগলো মুসলমান অথবা কাফের কুরায়েশদের সঙ্গে। মুসলিম দলে যোগ দিলো খাজাআ গোত্র এবং বনী বকর যোগ দিলো কুরায়েশদের সঙ্গে। গোত্রদুটির মধ্যে ছিলো দীর্ঘদিনের প্রলম্বিত বিদ্বেষ। কিছুকাল অতিবাহিত হওয়ার পর বনী বকর চড়াও হলো বনী খাজাআদের উপর। কুরায়েশদের মধ্য থেকে তাদের সাহায্যে এগিয়ে গেলো সাফোয়ান ইবনে উমাইয়া, ইকরামা ইবনে আবু জেহেল, সুহাইল ইবনে আমর। শায়বা ইবনে ওসমান, হুয়াইতাব ইবনে আবদুল উজ্জা এবং তাদের সঙ্গী সাথীরা। প্রচণ্ড লড়াই হলো। দু’পক্ষেই হতাহত হলো অনেক লোক। যুদ্ধশেষে কুরায়েশেরা বুঝতে পারলো, রসুল স. এর সঙ্গে চুক্তিভঙ্গ করা হয়েছে। এর জন্য তারা পরস্পরকে দোষারোপ করতে শুরু করলো। আমর ইবনে সালেম খাজায়ী তার গোত্রের চল্লিশ জনকে সঙ্গে নিয়ে সংবাদ জানানোর অভিপ্রায়ে যাত্রা করলো মদীনা অভিমুখে। কিন্তু তারা মদীনায় উপস্থিত হওয়ার আগেই রসুল স. ঘটনাটি জেনে ফেললেন। সাহাবীগণকে বললেন, কুরায়েশরা চুক্তিভঙ্গ করেছে। অবশ্য এটাই ছিলো আল্লাহ্র অভিপ্রায়। জননী আয়েশা জিজ্ঞেস করলেন, নিশ্চয় এর মধ্যে কোনো কল্যাণ রয়েছে? তিনি স. বললেন, হ্যাঁ। জননী আয়েশা থেকে মোহাম্মদ ইবনে আমর এবং জননী উম্মে সালমা থেকে তিবরানীও এরকম বর্ণনা করেছেন।
আমর ইবনে সালেম খাজায়ী তার লোকজনকে নিয়ে মদীনায় পৌঁছলো। রসুল স.কে খুলে বললো সকল বৃত্তান্ত। রসুল স. বললেন, এখন তোমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা আমার কর্তব্য। নতুবা আমরাও তো তোমাদের কাছ থেকে সাহায্য চাইতে পারবো না। ঘটনাটি ঘটেছিলো হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তির বাইশ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর শাবান মাসে। রসুল স. তিনটি শর্ত জানিয়ে তাঁর প্রতিনিধিরূপে মক্কায় পাঠালেন হজরত হামযাকে। শর্ত তিনটি ছিলোঃ ১. বনী খাজাআর নিহত ১৩ জনের জন্য রক্তপণ দিতে হবে ২. অন্যথায় বনী খাজআকে আক্রমণকারী বনী বকরের মিত্রশক্তি বনী নাফাছাকে করে দিতে হবে চুক্তিবহির্ভূত, যেনো মুসলমানগণ তাদের উপর প্রতিশোধ নিতে পারে ৩. অথবা রহিত করে দিতে হবে হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি। শর্ত তিনটির কথা জেনে কুরায়েশরা মহা বিপদে পড়লো। নিজেদের মধ্যে তুমুল তর্কবির্তকের পর একমত হলো যে, সন্ধিচুক্তি রহিত করে দেওয়াই উত্তম। হজরত হামযা সন্ধিচুক্তি বাতিলের সংবাদ নিয়ে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করলেন।
রসুল স. পরামর্শ সভায় বসলেন। হজরত আবু বকর পরামর্শ দিলেন, হে আল্লাহ্র প্রিয়তম রসুল! তাদের প্রতি সহৃদয়তা প্রদর্শন করাই উত্তম। সন্ধিচুক্তিটি পুনর্বহাল করলেই মনে হয় ভালো হয়। কেননা তারা তো আপনারই স্বজাতি। অচিরেই হয়তোবা তারা আপনার অনুগামীও হয়ে যেতে পারে। হজরত ওমর বললেন, যুদ্ধ, কেবল যুদ্ধই হচ্ছে এর একমাত্র সমাধান। হে আল্লাহ্র প্রিয়তম বাণীবাহক! আপনি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করুন। তারা তো সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীদের মধ্যেও নিকৃষ্ট সত্যপ্রত্যাখ্যানকারী। তারা আপনাকে ‘পাগল’ ‘যাদুকর’ কতো কিছু বলে অপবাদ দেয়। সুতরাং যুদ্ধের মাধ্যমেই তাদেরকে শায়েস্তা করতে হবে। তাদেরকে পরাভূত করতে পারলে সমগ্র আরব আপনার করতলগত হবে। আর অনুগামী যদি হয়, তবে সমগ্র আরব হবে আপনার অনুগত।
রসুল স. হজরত ওমরের অভিমতকেই গ্রহণ করলেন। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে লাগলেন নীরবে। আরবের বিভিন্ন গোত্র-শাখাগোত্রকে উদ্বুদ্ধ করতে লাগলেন কুরায়েশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে। ফলে আসলাম, গিফার, মুজাইনা, হরফিয়া, আশজা ও সুলাইম গোত্রের লোকেরা যুদ্ধ করার উদ্দেশ্য নিয়েসমবেত হলো মদীনায়। অন্যান্য গোত্রগুলো সংবাদ পাঠালো, তারা পথে তাদের লোকজন নিয়ে মিলিত হবে। এভাবে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ালো দশ হাজার, মতান্তরে বারো হাজারে। সম্ভবত মদীনা থেকে যাত্রার প্রাক্কালে সৈন্যসংখ্যা ছিলো দশ হাজার। পথে অন্যান্যরা যোগ দিলে সে সংখ্যা হয়ে যায় বারো হাজার।
ওদিকে কুরায়েশরা চিন্তিত হয়ে পড়লো। মদীনায় পাঠালো তাদের প্রিয় নেতা আবু সুফিয়ানকে। তিনি মদীনায় এসে সোজাসুজি উপস্থিত হলেন তাঁর কন্যা উম্মতজননী উম্মে হাবীবার গৃহে। রসুল স. এর শয্যায় উপবেশনের উদ্যোগ করতেই জননী উম্মে হাবীবা বিছানা গুটিয়ে নিলেন। বললেন, এটা রসুলুল্লাহ্ স. এর বিছানা। এর উপরে কোনো মুশরিক উপবেশন করতে পারে না। আবু সুফিয়ান বললেন, তুমি আমার কন্যা হয়ে আমার সঙ্গে এরকম আচরণ করতে পারলে? জননী উম্মে হাবীবা বললেন, হ্যাঁ, আমি আপনার কন্যা, কিন্তু আল্লাহ্ তো দয়া করে আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন পবিত্র ইসলামের ছায়ায়। অথচ আপনি একজন গোত্রপতি হলেও এখনো অংশীবাদী। আপনার তো উচিত এই মুহূর্তে মহাসত্য ইসলামকে গ্রহণ করা।
আবু সুফিয়ান সেখানে আর দাঁড়ালেন না। বাইরে এসে সাক্ষাত করলেন রসুল স. এর সঙ্গে। তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন অনেক কথা। রসুল স. তার একটিরও জবাব দিলেন না। তিনি তখন সুপারিশকারী হিসেবে নিযুক্ত করলেন হজরত আবু বকরকে। তিনি তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। সরাসরি বলে দিলেন, আপনার জন্য আমি কোনো সুপারিশ করতে পারি না। হজরত ওমর রাগান্বিত হলেন। তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন, যুদ্ধই সকল সমস্যার সমাধান। আমার কাছে যদি মাত্র একটি ছড়িও থাকে, তবুও তো আমি তাই নিয়ে যুদ্ধ করবো আপনাদের বিরুদ্ধে। আবু সুফিয়ান এবার দেখা করলেন হজরত আলী ও হজরত ফাতেমার সঙ্গে। তাঁরাও তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। শেষে বিফল মনোরথ হয়ে তিনি ফিরে গেলেন মক্কায়। কিছুকাল পরে হজরত ইবনে উম্মে মকতুম, অথবা হজরত আবু জর গিফারীকে মদীনার প্রশাসক নিযুক্ত করে রসুল স. ৮ম হিজরী সনের ১০ই রমজানে সদলবলে যাত্রা করলেন মক্কা অভিমুখে। দোয়া করলেন, হে আমাদের প্রভুপালক! গুপ্তচরের অপপ্রভাব থেকে আমাদেরকে রক্ষা কোরো।
বোখারীর বর্ণনায় এসেছে, হজরত আলী বলেছেন, রসুল স. যোবায়ের, মেকদাদ ও আমাকে আদেশ করলেন, এক্ষুণি মক্কার দিকে যাত্রা করো। বুস্তানখাখে পৌঁছে এক উষ্ট্রারোহিনীর সাক্ষাত পাবে। তার কাছে একটি পত্র আছে, পত্রটি ছিনিয়ে নিয়ে এসো। আমরা যাত্রা করলাম। বুস্তানখাখে পৌঁছে দেখা পেলাম কথিত উষ্ট্রারোহিনীর। তার গতিরোধ করে বললাম, চিঠিটা দাও। সে বললো, আমার কাছে কোনো চিঠি নেই। আমি বললাম, ভালোয় ভালোয় বের করে দাও। নয়তো তোমাকে বিবস্ত্র করে তল্লাশী করা হবে। সে এবার বিনা বাক্যে বের করে দিলো চিঠিটি। আমরা চিঠি নিয়ে ফিরে এলাম মদীনায়। চিঠিটি লিখেছিলেন হাতেব ইবনে আবী বালতা। ওই চিঠির মাধ্যমে তিনি মক্কায় অবস্থানরত তাঁর আত্মীয়স্বজনদেরকে রসুল স. এর মক্কা অভিযানের সংবাদ জানিয়ে দিয়েছিলেন। রসুল স. তাঁকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, হাতেব! কী ব্যাপার? হাতেব বললেন, আমি মার্জনাপ্রার্থী। তবে হে আল্লাহ্র প্রিয়তম রসুল! এর মধ্যে আমার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিলো না। আমার পরিবার-পরিজন রয়েছে মক্কায়। আমার কিছুসংখ্যক মুহাজির ভাইদের স্বজন-পরিজনও রয়েছে সেখানে। চিঠির মাধ্যমে আমি কেবল তাদের নিরাপত্তা কামনা করেছিলাম। ভেবেছিলাম, এই সংবাদ পাওয়ার কারণে তারা হয়তো কুরায়েশদের ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকতে পারবে। বিজয় তো হবে আপনারই। রসুল স. বললেন, হাতেব সত্য কথাই বলেছে। হজরত ওমর বললেন, হে আল্লাহ্র রসুল! তার আচরণ তো মুনাফিকদের মতো। অনুমতি দিন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেই। রসুল স. বললেন, রসনা সংযত করো। তুমি কি জানো না হাতেব বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন গাজী। ওই যুদ্ধবিজয়ীদের সম্পর্কে কি আল্লাহ্ এই বলে শুভসমাচার দান করেননি যে ‘তোমাদেরকে ক্ষমা করা হয়েছে। এখন তোমরা যা খুশী তাই করতে পারো’। হজরত ওমর অনুতপ্ত হলেন। প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হলো। ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে বরণ কোরো না’।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment