এই সুরাখানিও অবতীর্ণ হয়েছে মহাপুণ্যের আলয় মক্কায়। এতে আয়াত রয়েছে ৫টি।
বোখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন, রসুল স. এর উপরে যখন অবতীর্ণ হলো ‘আর আপনি আপনার নিকটজনদেরকে ভীতি প্রদর্শন করুন’ তখন তিনি স. তাঁর আত্মীয় স্বজনদেরকে সমবেত করলেন। যথারীতি তাঁদেরকে ভয় প্রদর্শন করলেন আল্লাহ্র। বোখারী প্রমুখের বর্ণনায় এসেছে, তখন রসুল স. একদিন আরোহণ করলেন সাফা পর্বতের চূড়ায়। শংকাজড়িত কণ্ঠে উচ্চস্বরে তাঁর আত্মীয় স্বজনদের নাম ধরে ডাকলেন। কুরায়েশ জনতা জড়ো হলো পর্বতের সানুদেশে। তিনি স. উদাত্ত কণ্ঠে বললেন, হে জনতা! এখন আমি যদি বলি, পর্বতের অপর প্রান্তে একদল শত্রু সেনা লুকিয়ে আছে। তারা তোমাদেরকে আক্রমণ করবে সন্ধ্যায়, অথবা সকালে, তাহলে তোমরা কি আমার একথা বিশ্বাস করবে? জনতা সমস্বরে জবাব দিলো, নিশ্চয়। তুমি যে আল আমীন (সত্যবাদী)। তিনি স. বললেন, তাহলে শোনো, আল্লাহ্র পক্ষ থেকে শাস্তি অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বেই তোমরা সাবধান হও। আবু লাহাব বললো, তুমি ধ্বংস হও। এ জন্যই কি তুমি আমাদেরকে এখানে ডেকেছো? একথা বলেই সে একটি প্রস্তরখণ্ড হাতে তুলে নিয়ে রসুল স. এর প্রতি নিক্ষেপোদ্যত হলো। তখনই অবতীর্ণ হলো আলোচ্য সুরার প্রথম তিনটি আয়াত।
সূরা লাহাবঃ আয়াত ১, ২, ৩, ৪, ৫
তাফসীরে মাযহারী/৬৩২
* ধ্বংস হউক আবু লাহাবের দুই হস্ত এবং ধ্বংস হউক সে নিজেও।
* উহার ধন-সম্পদ ও উহার উপার্জন উহার কোন কাজে আসে নাই।
* অচিরে সে প্রবেশ করিবে লেলিহান অগ্নিতে
* এবং তাহার স্ত্রীও যে ইন্ধন বহন করে,
* তাহার গলদেশে পাকান রজ্জু।
প্রথমোক্ত আয়াতত্রয়ের মর্মার্থ হচ্ছে চিরহতভাগ্য আবু লাহাবের দুই হাত ধ্বংস হোক। ধ্বংস নেমে আসুক তার নিজের উপরেও। তার অর্থবিত্ত ও উপার্জন তার কোনো উপকারে আসেনি। আসবেও না। দোজখের লেলিহান অগ্নিকুণ্ডে তার প্রবেশের ক্ষণ অত্যাসন্ন।
এখানে ‘তাব্বাত’ অর্থ ধ্বংস হোক। এর ধাতুমূল ‘তাবাব’ যার অর্থ, এমনই এক গহবর, যা সমূহ বিপদ ডেকে আনে। ‘ইয়াদা আবী লাহাব’ অর্থ আবু লাহাবের দুই হস্ত। অর্থাৎ আবু লাহাব স্বয়ং। যেমন বলা হয় ‘ওয়ালা তুলক্বু বিআইদী কুম ইলাত তাহলুকাহ্, (তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ কোরো না)। এখানেও ‘আইদী’ অর্থ নিজেকে, নিজেদেরকে। কোনো কোনো বিদ্বান বলেছেন, আবু লাহাব রসুল স.কে আঘাত করার জন্য হাতে পাথর তুলে নিয়েছিলো। তাই এখানে বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছে তার হস্তদ্বয়ের কথা। আবার কেউ কেউ বলেছেন, এখানে হস্তদ্বয় অর্থ ইহজগত ও পরজগত। অর্থাৎ তার ইহকাল-পরকাল দুই কালই ধ্বংসের মধ্যে নিপতিত। অথবা এখানে ‘হস্তদ্বয়’ কথাটির দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে তার বিত্ত ও প্রভুত্বকে।
আবু লাহাবের আসল নাম ছিলো আবদুল উজ্জা (উজ্জা দেবীর দাস) মুকাতিল বলেছেন, সে সুদর্শন চেহারার লোক ছিলো বলেই তাকে বলা হতো আবদুল উজ্জা। পরে তার উপনাম হয় আবু লাহাব। আবদুল উজজা নামটা অতি জঘন্য। তাই এখানে তাকে বলা হয়েছে আবু লাহাব, যার অর্থ ধ্বংসের পিতা, চরম ধ্বংসাত্মক। ‘ওয়া তাববা’ অর্থ ধ্বংস হোক সে নিজেও। অর্থাৎ সে তো ধ্বংসই হয়ে গিয়েছে। অথবা বলা যেতে পারে, ‘তাববাত’ শব্দটির মাধ্যমে এখানে তার ধ্বংস কামনা করা হয়েছে এবং ‘তাব্বা’ এখানে এসেছে তার ধ্বংসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের লক্ষ্যে। এভাবে বক্তব্যটি দাঁড়িয়েছে আবু লাহাব বিনাশপ্রাপ্ত হোক, বরং সে তো বিনাশ হয়েই গিয়েছে। অর্থাৎ তার বিনাশপ্রাপ্তির বিষয়টি সুনিশ্চিত। একারণেই এখানে ভবিষ্যতকালজ্ঞাপক ক্রিয়া ব্যবহার না করে ব্যবহার করা হয়েছে অতীতকালবোধক ক্রিয়া।
হজরত ইবনে মাসউদ বলেছেন, রসুল স. যখন তাঁর স্বজনদেরকে ইসলাম গ্রহণের আমন্ত্রণ জানালেন, তখন আবু লাহাব বললো, ভাতিজা! তুমি আমাকে শাস্তির ভয় দেখাচ্ছো। কিন্তু আমি তো শাস্তির পরোয়াই করি না। প্রয়োজন হলে আমি আমার সন্তান-সন্ততি-ধন-সম্পদ সবকিছুর বিনিময়ে তোমার কথিত শাস্তি থেকে পরিত্রাণ লাভ করবো। তখন অবতীর্ণ হয় পরবর্তী আয়াত। বলা হয়
তাফসীরে মাযহারী/৬৩৩
‘মা আগনা আ’নহু মালুহূ ওয়ামা কাসাব’ অর্থ তার ধন সম্পদ ও তার উপার্জন তার কোনো কাজে আসেনি। অর্থাৎ তার সঞ্চিত বিপুল বিত্ত-বৈভব ও উপার্জিত সম্পদ তাকে আল্লাহ্র শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না। অথবা তার পুঞ্জীভূত ধন-সম্পদ ও তার উপার্জন কি তাকে আল্লাহ্র শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারবে? পারবে না। ‘ওয়ামা কাসাব’ অর্থ তার উপার্জন। অথবা তার সন্তান-সন্ততি। মাতা মহোদয়া আয়েশা সিদ্দীকা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, নিজস্ব উপার্জনজাত আহার্য সর্বোত্তম ও পবিত্রতম। তোমাদের সন্তান-সন্ততিও তোমাদের উপার্জন। বোখারী, তিরমিজি।
উল্লেখ্য, আবু লাহাবের জ্যেষ্ঠ পুত্র উতবা যখন বাণিজ্যব্যপদেশে সিরিয়া অভিমুখে যাত্রা করেছিলো, তখন তাকে পথিমধ্যে ভক্ষণ করেছিলো একটি নেকড়ে। আর আবু লাহাব মারা গিয়েছিলো বসন্ত রোগে, বদর যুদ্ধের কয়েকদিন পর। কয়েকজন হাবশী ক্রীতদাসের সহায়তায় তাকে বালিচাপা দেওয়া হয়।
‘সা ইয়াস্লা নারান জাতা লাহাব’ অর্থ অচিরে সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে। ‘জাতা লাহাব’ অর্থ লেলিহান অগ্নি। অর্থাৎ সেদিন আর বেশী দূরে নয়, যখন আবু লাহাব দগ্ধীভূত হতে থাকবে দোজখের লেলিহান আগুনে।
পরের আয়াতদ্বয়ে বলা হয়েছে ‘এবং তার স্ত্রীও, যে ইন্ধন বহন করে (৪) তার গলদেশে পাকানো রজ্জু’ (৫)। এখানে ‘ওয়াম্রাআতুহু’ অর্থ তার স্ত্রীও। অর্থাৎ আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিলকেও ভোগ করতে হবে একই পরিণতি। উল্লেখ্য, সে ছিলো হরব ইবনে উমাইয়ার কন্যা এবং হজরত আবু সুফিয়ানের ভগ্নি।
‘হাম্মালাতাল হাত্বব’ অর্থ যে ইন্ধন বহন করে। আরবী ভাষায় পরনিন্দুককে বলা হয় কাষ্ঠ, বা ইন্ধন বহনকারিণী। অর্থাৎ পর নিন্দাকারিণী। ইবনে ইসহাক হামাদান খান্দানের জনৈক ব্যক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, রসুল স. এর গমনাগমনের পথে আবু লাহাবের স্ত্রী কাঁটা পুঁতে রাখতো। সেদিকে ইঙ্গিত করেই অবতীর্ণ হয় এই আয়াত। জুহাক ও ইকরামা সূত্রে ইবনে মুনজিরও এরকম বর্ণনা করেছেন। আতিয়াও এরকম বর্ণনা করেছেন হজরত ইবনে আব্বাসের উক্তিরূপে। কিন্তু কাতাদা, মুজাহিদ এবং সুদ্দী বলেছেন, ‘হাম্মালাতাল হাত্বব’ অর্থ পর নিন্দুক। উম্মে জামিলের স্বভাবই ছিলো পরনিন্দা করে বেড়ানো, একের বিরুদ্ধে অপরের কথা লাগিয়ে ওই দু’জনের মধ্যে শত্রুতার আগুন জ্বালানো, যেমন কাষ্ঠ খণ্ডের ঘর্ষণে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় আগুন। সাঈদ ইবনে যোবায়ের বলেছেন, এখানে ‘হাম্মালাতাল হাত্বব’ অর্থ পাপের গুরুভার বহনকারিণী। যেমন এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘তারা তাদের পিঠে বহন করে পাপের বোঝা’।
‘ফী জ্বীদিহা হাবলুম্ মিম্ মাসাদ্’ অর্থ তার গলদেশে পাকানো রজ্জু। ‘জ্বীদ’ অর্থ গলদেশ, গলা। আর ‘মাসাদ’ অর্থ লৌহশৃঙ্খল, যার দৈর্ঘ্য সত্তর হাত। ওই লৌহশৃঙ্খল তার গলায় আটকিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে তার পিঠের উপর দিয়ে
তাফসীরে মাযহারী/৬৩৪
কটিদেশ পর্যন্ত। আবার শব্দটির অর্থ পাকানো মজবুত রজ্জুও হয়, খেজুর গাছের ছালের হোক, অথবা পাট জাতীয় অন্য কোনো তন্তুর। এরকম বলেছেন হজরত ইবনে আব্বাস এবং ওরওয়া ইবনে যোবায়ের। মুজাহিদ সূত্রে আখফাশ বলেছেন, লোহার শিকলকেই ‘মাসাদ’ বলে। শা’বী এবং মুকাতিল বলেছেন, উম্মে জামিল শক্ত রশি দিয়ে তার লাকড়ির বোঝা বাঁধতো। একদিন সে এভাবে বাঁধা একটি লাকড়ির বোঝা মাথায় নিয়ে একটি পাথরের উপরে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিছলো। এমন সময় একজন ফেরেশতা সেখানে উপস্থিত হয়ে তার লাকড়ির বোঝাটি ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। ফলে তার গলায় ফাঁস লেগে যায় এবং ওই অবস্থাতেই অক্কা পায় সে। ইবনে জায়েদ বলেছেন, ইয়েমেন অঞ্চলে এক প্রকার গাছ জন্মে, তার নাম ‘মাসাদ’। আর তার আঁশ দ্বারা তৈরী রশিকেও বলে ‘মাসাদ’। কাতাদা বলেছেন, ‘মাসাদ’ অর্থ গলার হার। হাসান বসরী বলেছেন, উম্মে জামিলের গলার মোতির মালাকে এখানে বলা হয়েছে ‘মাসাদ’। সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যেব বলেছেন, রমণীটি সুন্দর একটি কণ্ঠহার ব্যবহার করতো। সেই কণ্ঠহারটিকেই এখানে বলা হয়েছে ‘মাসাদ’। সে বলতো, মোহাম্মদের সাথে শত্রুতার পাথেয় হবে আমার এই গলার হার।
‘মাসাদ’ অর্থ যদি এখানে লোহার শিকল হয়, তবে বুঝতে হবে, এখানে বলা হয়েছে তার পরকালের অশুভ পরিণতির কথা। আর এর অর্থ যদি হয় সাধারণ রশি, তবে বুঝতে হবে, প্রসঙ্গটি ইহজগতের। লক্ষণীয়, ঘটনাটি এখানে বর্ণিত হয়েছে রূপকভাবে। উম্মে জামিলকে লাঞ্ছিত ও হেয় প্রতিপন্ন করাই এখানে উদ্দেশ্য। তবে এখানে শা’বী যে বর্ণনাটি উপস্থাপন করেছেন, তার অর্থ বোধগম্য নয়। কেননা আবু লাহাব ও তার স্ত্রী তখনকার সমাজে পরিচিত ছিলো কুলীন ও রক্ষণশীল রূপে। সুতরাং উম্মে জামিল যে লাকড়ির বোঝা বহন করতো, এরকম কথা কষ্টকল্পনা বৈ কি।
Thursday, 14 August 2008
সূরা ইখলাস
৪ আয়াতবিশিষ্ট এই সুরাখানিও অবতীর্ণ হয়েছে মহিমময় পুণ্যতীর্থ ‘মক্কায়’।
হজরত উবাই ইবনে কা’ব থেকে আবুল আলিয়া বর্ণনা করেছেন, পৌত্তলিকেরা একবার রসুল স. এর কাছে আল্লাহ্র বংশপরিচয় জানতে চায়। তখন অবতীর্ণ হয় এই সুরা। তিরমিজি, হাকেম, ইবনে মাজা। হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ্ থেকে তিবরানী এবং ইবনে জারীরও এরকম বর্ণনা করেছেন।
ইবনে আবী হাতেমের বর্ণনায় এসেছে, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, একবার কা’ব ইবনে আশরাফ, হুয়াই ইবনে আখতাব এবং আরো কয়েকজন ইহুদী রসুল স. এর মহান সংসর্গে উপস্থিত হয়ে বললো, যে আল্লাহ্ আপনাকে প্রেরণ করেছেন, তাঁর কিছু গুণ বর্ণনা করুন। তখন অবতীর্ণ হয় এই সুরা। সাঈদ ইবনে যোবায়েরের বরাত দিয়ে ইবনে জারীর, কাতাদা এবং ইবনে মুনজিরও
তাফসীরে মাযহারী/৬৩৫
এরকম বলেছেন। জুহাক, কাতাদা ও মুকাতিল সূত্রে বাগবী উল্লেখ করেছেন, একবার কিছুসংখ্যক ইহুদী পণ্ডিত রসুল স. এর সুমহান সাহচর্যে উপস্থিত হয়ে বললো, ‘আল্লাহ্র গুণাবলী সম্পর্কে কিছু বলুন। হতে পারে, আমরা ইমান গ্রহণ করবো। তওরাত কিতাবে তো আল্লাহ্ তাঁর অনেক গুণের উল্লেখ করেছেন। বলুন, তিনি কিসের তৈরী? তিনি কী আহার করেন, না করেন না? কেউ তার অংশীদার কিনা। যদি থাকে, তবে সে কে? তাদের এমতো অপবচনের প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয় সুরা ইখলাস।
আবান সূত্রে আবু শায়েখ বর্ণনা করেছেন, হজরত আনাস বলেছেন, খায়বরের কতিপয় ইহুদী একবার রসুল স. সকাশে উপস্থিত হয়ে বললো, আবুল কাসেম! আল্লাহ্পাক তাঁর অন্তরালবর্তী জ্যোতি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন ফেরেশতামণ্ডলীকে, আসমানকে সৃষ্টি করেছেন গলিত কর্দম দ্বারা, আগুনের স্ফুলিঙ্গ দ্বারা ইবলিসকে। তেমনি ধোঁয়া থেকে আকাশ এবং পানির বুদ্বুদ থেকে পৃথিবীকে। এখন বলুন, আপনার পালনকর্তা কিসের তৈরী? রসুল স. নীরব হয়ে রইলেন। তখন সুরা ইখলাস নিয়ে আবির্ভূত হলেন হজরত জিবরাইল। এ সকল বর্ণনা দৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে, সুরা ইখলাস অবতীর্ণ হয়েছে মদীনায়।
ইবনে জারীরের বর্ণনায় এসেছে, আবুল আলিয়া বলেছেন, বিভিন্ন গোত্রের গোত্রপ্রধানেরা একবার রসুল স. এর পবিত্র সংসর্গে উপস্থিত হয়ে বললো, আপনি আমাদের কাছে আপনার প্রভুপালকের বংশপরিচয় প্রকাশ করুন। তাদের এরকম অপবিত্র উক্তির প্রেক্ষিতে হজরত জিবরাইল আনেন এই সুরাখানি। এই বর্ণনাটিও একথা প্রমাণ করে যে, সুরাখানির অবতরণস্থল মদীনা। ইতোপূর্বে হজরত উবাই ইবনে কা’ব কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে যে অংশীবাদীদের কথা বলা হয়েছে, সম্ভবত তারাই বিভিন্ন গোত্রের গোত্রপ্রধান। আর এরকমও হতে পারে যে, অংশীবাদী ও ইহুদী উভয় গোত্রের গোত্রপ্রধানেরা তখন একসঙ্গে উপস্থিত হয়ে রসুল স.কে এরকম অপপ্রশ্ন করেছিলো।
আবু জুবিয়ান ও আবু সালেহ সূত্রে বাগবী বর্ণনা করেছেন, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, একবার আমের ইবনে তোফায়েল ও আব্বাদ ইবনে রবীয়া রসুল স. এর সুমহান সান্নিধ্যে উপস্থিত হলো। আমের বললো, মোহাম্মদ! তুমি আমাদেরকে কার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে? তিনি স. জবাব দিলেন, মহান আল্লাহ্র প্রতি। আমের পুনরায় জিজ্ঞেস করলো, আল্লাহ্ কীভাবে সৃষ্ট হলেন, সে সম্পর্কে কিছু বলো। তিনি সোনার, না রূপার? না কাষ্ঠনির্মিত? তাদের এরকম মন্দ উক্তির পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয় সুরা ইখলাস। আব্বাদ ভস্মীভূত হয়েছিলো বজ্রাঘাতে এবং আমের ধ্বস হয়েছিলো মহামারীতে।
সূরা ইখলাসঃ আয়াত ১, ২, ৩, ৪
তাফসীরে মাযহারী/৬৩৬
* বল, ‘তিনিই আল্লাহ্, এক-অদ্বিতীয়,
* ‘আল্লাহ্ কাহারও মুখাপেক্ষী নহেন, সকলেই তাঁহার মুখাপেক্ষী;
* ‘তিনি কাহাকেও জন্ম দেন নাই এবং তাঁহাকেও জন্ম দেওয়া হয় নাই,
* ‘এবং তাঁহার সমতুল্য কেহই নাই।’
প্রথমে বলা হয়েছে ‘ক্বুল হুয়াল্লহু আহাদ’ (বলো, তিনিই আল্লাহ্, এক-অদ্বিতীয়)। এখানকার ‘হুয়া’ (তিনি) সর্বনামটি অভিজাত শ্রেণীর। এখানে ‘তিনি’ উদ্দেশ্য এবং বিধেয় এর পরের বাক্যটি। অথবা এখানকার ‘হুয়া’ একটি সাধারণ সর্বনাম; যা সম্পর্কযুক্ত হবে সেই প্রভুপালনকর্তার সঙ্গে, যার সম্পর্কে করা হয়েছে জিজ্ঞাসাবাদ। এভাবে বক্তব্যটি দাঁড়ায় হে আমার প্রিয়তম বাণীবাহক! আপনি তাদেরকে বলুন, হে অংশীবাদীর দল! তোমরা আমার নিকট যাঁর পরিচয় জানতে চেয়েছো, জেনে রাখো তিনি এক-একক-অদ্বিতীয়’। এখানকার ‘আহাদুন’ ‘আল্লাহ্র’ অনুবর্তী। অথবা বলা যায়, ‘আহাদুন’ এখানে বিধেয় হয়েছে ‘হুয়া’ সর্বনাম থেকে। আর এখানকার ‘আহাদুন’এর মূলরূপ ছিলো ‘ওয়াহাদা’। ‘ওয়াহাদা’ এবং ‘ওয়াহিদ’ সমার্থক। হজরত ইবনে মাসউদের ক্বেরাতে ‘হুয়াল্লহু আহাদ’ স্থলে রয়েছে ‘লাওয়াহিদ’। হজরত ওমরের ক্বেরাতেও তা-ই।
যদি ‘হুয়া’ সর্বনামকে অভিজাত সর্বনাম ধরে নেওয়া হয়, ‘আল্লাহ্’কে ধরে নেওয়া হয় উদ্দেশ্য এবং ‘আহাদ’কে বিধেয়, তাহলে বাক্যের বিশুদ্ধ মর্মার্থ প্রকাশ্য অর্থে হবে না। কারণ একটি অবিভাজ্য প্রকৃত সত্তার নাম আল্লাহ্। আর যা অবিভাজ্য, তাতে একাধিকতা অসম্ভব। যেমন জায়েদ একজনের নাম, যা একজনকেই বুঝায় এবং নাকচ করে দেয় একাধিকতাকে। আর তা কোনোকিছুর সমষ্টিও নয়। কেননা এখানে বিদ্যমান সামষ্টিকতার একক। এরপর পুনরায় তাকে এক বলা সঙ্গত নয়। তাই ‘আল্লাহ্’ পদটির দ্বারা এমন এক সাধারণ সত্তাকে মেনে নিতে হয়, যিনি একক উপাস্য হওয়ার প্রকৃত যোগ্য। কারো উপাস্য হওয়ার যোগ্য হতে পারেন কেবল তিনিই, যিনি তাকে অনস্তিত্ব থেকে আনেন অস্তিত্বে এবং সেই সঙ্গে পূর্ণ করে দেন তার স্থিতিলাভের প্রয়োজনসমূহকে। আর যিনি স্বয়ম্ভু, তিনিই অপরকে অস্তিত্ব দান করতে সক্ষম। সেই অবিভাজ্য সত্তার গুণাবলীও পূর্ণ ও পরিণত, নশ্বরতা ও অসম্পূর্ণতা থেকে চিরপবিত্র। সৃষ্টি তাঁর সত্তা ও গুণবত্তা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। তিনিও সৃষ্টির সত্তা ও গুণবত্তা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। সৃষ্টির সত্তা ও গুণবত্তার সঙ্গে তাঁর সত্তা ও গুণবত্তার কোনো সংযোগই নেই। যা স্বয়ম্ভু ও স্বাধিষ্ঠ নয়, তা অপরকে অধিষ্ঠিত করতে পারবে কীভাবে? বরং তার নিজের বিদ্যমানতাই তো সেই স্বয়ম্ভু সত্তা ও গুণবত্তার প্রতিবিম্ব, শাখা-প্রশাখা কদাচ নয়। কেননা শাখা-প্রশাখার সংযোগ থাকে মূলের সঙ্গে। কিন্তু সৃষ্টির সঙ্গে সত্তার এমতো সম্পর্ক কল্পনা করা যায় না। সুতরাং সৃষ্টি কেবলই প্রতিবিম্ব, যে প্রতিবিম্বে আল্লাহ্ই দয়া করে দান করেছেন অস্তিত্ব ও স্থায়িত্ব। সুতরাং আল্লাহ্ই কেবল আনুরূপ্যবিহীন, এক-একক-অবিভাজ্য-অসমকক্ষ ও অংশীবিহীন এরকম ব্যাখ্যাই
তাফসীরে মাযহারী/৬৩৭
অধিক ফলপ্রসূ সঙ্গতিপূর্ণ ও সমীচীন। কিন্তু এরকম ব্যাখ্যা আবার অংশীবাদী ও ইহুদীদের প্রশ্নের যথাযথ জবাবও নয়। কেননা তারা প্রশ্ন করেছিলো ভিন্নভাবে। অর্থাৎ আল্লাহ্র এককত্বের স্বরূপ জানতে চেয়ে তারা কিছু বলেনি। কারণ রসুল স. তাদেরকে প্রথম থেকেই একটি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন কলেমার প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। সে কলেমা হচ্ছে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লহ’ (আল্লাহ্ ভিন্ন অন্য কোনো উপাস্যই নেই)। তাদের প্রশ্ন ছিলো অত্যন্ত অযথার্থ ও স্থুল। তারা বলেছিলো, যিনি তোমাকে প্রেরণ করেছেন, তাঁর উপাদানগত বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করুন। বলো তিনি কিসের তৈরী সোনা, রূপা, লোহার, না কাঠের।
যদি এখানকার ‘হুয়া’ (তিনি) সর্বনামকে ওই অবিভাজ্য সত্তার স্থলাভিষিক্তও ধরা হয়, যেরূপ উল্লেখ করা হয়েছিলো প্রশ্নকারীদের প্রশ্নে, তবুও এ বাক্যটি তাদের প্রশ্নের সঠিক উত্তর হবে না। অর্থাৎ কথাটি তাদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর নয়। আল্লাহ্র এককত্ব সম্পর্কে তারা তো প্রশ্নই করেনি। বরং নবী প্রেরণকারী ওই সত্তার যৌগিক তত্ত্ব সম্পর্কে তারা প্রশ্ন তুলেছিলো। একারণেই উভয় অবস্থায় আল্লাহ্ হবেন যাবতীয় সংযোজন, বিয়োজন, পরিযোজন, পরিবর্ধন, এক কথায় সকল যৌগিকত্বের যাবতীয় অনিবার্যতা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত, পবিত্র। অর্থাৎ তিনি চির অমুখাপেক্ষী আকার-নিরাকার, প্রকার-প্রকৃতি থেকে। তাঁর সাত্তিক তত্ত্ব চির অসমকক্ষ। গুণবত্তার ক্ষেত্রেও কেউ অথবা কোনোকিছু তাঁর তুল্য নয়। অংশীদার তো নয়ই। সুতরাং কেউ অথবা কোনোকিছুই তাঁর মতো নয়। তিনি যে অনুরূপ্যবিহীন। একারণেই আল্লাহ্র পরিচয় ধন্য সুফী-আউলিয়াগণ বলেন, আল্লাহ্র সত্তা-গুণবত্তা ও কার্যকলাপে কারো অথবা কোনোকিছুর কোনোই অংশ নেই। তাঁর অবোধ্য সত্তা তাঁরই গুণবত্তার সমাহার, কিন্তু তাঁর ভিত্তি নয়। বরং তিনি তাঁর গুণরাজিরও ভিত্তি। আর তাঁর গুণরাজির মূল হচ্ছে তাঁরই চিরজীবিতা (হায়াত) গুণ (সিফাত)। ওই হায়াত সিফাতের ভিত্তিতেই দাঁড়িয়ে আছে তাঁর অন্যান্য গুণ জ্ঞান (এলেম) শক্তিমত্তা (কুদরত) অভিপ্রায় (এরাদা) বাণী (কালাম) দর্শন (বাসার) শ্রবণ (সামা) ইত্যাদি। আর হায়াত হচ্ছে তাঁরই সত্তার শাখা বা ভিত্তি। অর্থাৎ তাঁর সত্তা (জাত) যেনো মৌলিক অসমাধ্য একটি বিষয়, যার উৎস হচ্ছে তাঁরই অস্তিত্ব। সেকারণেই সুফি-সাধকগণ বলেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লহ্ অর্থ লা মাওজুদা ইল্লাল্লহ্ (তাঁর বিদ্যমানতা ছাড়া আর কারো বিদ্যমানতাই নেই)। কেননা প্রকৃত বিদ্যমানতা রয়েছে কেবল আল্লাহ্র। সমগ্র বিশ্বজগত যেনো ওই বিদ্যমানতারই ছায়া-প্রচ্ছায়া। যেমন এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘আল্লাহ্ই চিরস্থায়ী, মৌলিক মহাসত্য। যারা তাঁকে ছাড়া অন্যকে ডাকে তারা মিথ্যা’। আর এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘তিনি ব্যতীত অন্য সকল কিছুই ধ্বংসশীল’। অর্থাৎ সকলকিছুই নশ্বর, অনশ্বর কেবল আল্লাহ্। সুতরাং প্রকৃত কথা এই যে, আল্লাহ্র অস্তিত্ব ও গুণবত্তার সঙ্গে সৃষ্টির অস্তিত্ত্ব ও গুণবত্তার সাদৃশ্য রয়েছে কেবল নামত। প্রকৃতপ্রস্তাবে স্রষ্টা ও সৃষ্টি মিলিত বা পরস্পর সম্পৃক্ত নয়। যারা এমতো ব্যাখ্যা বুঝতে অক্ষম, তাদের উচিত, তারা যেনো
তাফসীরে মাযহারী/৬৩৮
সুফি-আউলিয়াগণের সাহচর্য-সম্পৃক্ত হয়। তাহলে হয়তো তাদের সম্মুখে উন্মুক্ত হতে পারে তত্ত্বজ্ঞানের দুয়ার। আল্লাহ্তায়ালার আনুরূপ্যহীন এককত্বই কি তাঁর চিরবিদ্যমানতা ও তাঁর প্রতিপালনযোগ্যতার জন্য যথেষ্ট নয়? সকল কিছুই যে তাঁর জ্ঞানগোচর। অথচ অজ্ঞ সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীরা এ বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করে। এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে না যে, তাঁর আনুরূপ্যহীন জ্ঞান ও ক্ষমতা সকল কিছুকেই আনুরূপ্যবিহীন ভাবে সতত পরিবেষ্টন করে রয়েছে। আর এই আয়াতটি তাঁর পরিপূর্ণ সত্তা ও গুণবত্তার প্রতি ইঙ্গিতবহ।
‘ক্বুল’ অর্থ বলো। অর্থাৎ হে আমার প্রিয়তম রসুল! আপনি তাদেরকে বলুন। ‘ক্বুল হুয়াল্লহু আহাদ’ অর্থ তিনিই আল্লাহ্, এক-অদ্বিতীয়। এই বাক্যটিতে প্রকাশ পেয়েছে নবী-রসুলগণ কর্তৃক প্রচারিত বাণীর সারমর্ম। আর এই বাণীটি এমন এক জ্ঞানগর্ভ ও মহান বাণী যে, বিশাল বিশাল গ্রনে'র বক্তব্যাবলী যেনো এর কাছে কিছুই নয়। আর এই মহান বাণীর জটিল জটিলতর ব্যাখ্যার আবশ্যকও কিন্তু নেই। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্র অবোধ্য সত্তা ও গুণবত্তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আলোচনা অবশেষে অন্তর্ভূত হয় যুক্তিবিদ্যাতেই। যারা প্রজ্ঞার ক্ষেত্রে অনুপযুক্ত, তাদের কাছে বরং এরকম জটিল আলোচনা ধ্বংসাত্মক। যেমন এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘আপনাকে তারা রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আপনি তাদেরকে বলুন, রূহ হচ্ছে আমার প্রভুপালকের পক্ষে থেকে একটি আদেশ’। রূহও আল্লাহ্র সৃষ্টি। সেই রূহের রহস্যোদ্ধারই যখন নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে, তখন রূহের স্রষ্টার সত্তাগুণবত্তার রহস্যোদ্ধারকর্মও নিশ্চয় সাধারণভাবে নিষিদ্ধ। বরং বুঝতে হবে, এ প্রসঙ্গে যে ব্যক্তি তার অক্ষমতার পরিচয় পায়, সে-ই আসলে জ্ঞানী। আর এ জ্ঞান লাভ হতে পারে কেবল তাদের, যারা পায় তাঁর ব্যবধানরহিত আনুরূপ্যহীন সামীপ্য ও সান্নিধ্য। হজরত আবু হোরায়রা বর্ণনা করেছেন, একবার আমরা নিয়তি সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। এমন সময় রসুল স. সেখানে উপস্থিত হয়ে আমাদের কথা শুনলেন। দেখলাম, তিনি রোষতপ্ত। মুখমণ্ডল রক্তিমাভ। মনে হচ্ছিলো, তাঁর পবিত্র মুখাবয়বে ঘষে দেওয়া হয়েছে আনারের লাল দানা। বললেন, এ প্রসঙ্গে আলোচনা করার জন্য কি তোমরা আদেশপ্রাপ্ত? এজন্যই কি তোমাদের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে আমাকে? এ সম্পর্কে তর্কাতর্কি করতে গিয়েই তো তোমাদের পূর্ববর্তীরা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। সাবধান! এ প্রসঙ্গে আর আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়ো না। তিরমিজি, ইবনে মাজা, শোয়ায়েব থেকে আমর ইবনে শোয়ায়েব।
পরের আয়াতে (২) বলা হয়েছে ‘আল্লহুস্ সমাদ’ (আল্লাহ্ কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী)। হজরত ইবনে আব্বাস, হাসান বসরী এবং সাঈদ ইবনে যোবায়ের বলেছেন, ‘সমাদ’ অর্থ নির্ভীক, বেপরোয়া। হজরত বুরাইদা এবং ইবনে জারীরও এরকম বলেছেন। আমার ধারণা, সম্ভবত বর্ণনাটি সুপরিণত সূত্রজাত। আর কথাটি রূপকার্থক। কেননা তিনি জ্ঞানাতীত, বোধ্য গুণাতীত, ধারণা-কল্পনার অতীত।
তাফসীরে মাযহারী/৬৩৯
শা’বী বলেছেন, তিনিই ‘সমাদ’ যিনি পানাহারের প্রয়োজন থেকে মুক্ত। কেউ কেউ বলেছেন, শব্দটির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে পরবর্তী বাক্যে। এরকম বলেছেন হজরত উবাই ইবনে কা’ব থেকে আবুল আলিয়া। আবু ওয়াইল শাকিক ইবনে সালমা বলেছেন ‘সমাদ’ অর্থ সর্বদিক দিয়ে যার কর্তৃত্ব শিখরস্পর্শী। আবু তালহা সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, হজরত ইবনে আব্বাস শব্দটির এরূপই মর্মার্থ করেছেন। সাঈদ ইবনে যোবায়ের বলেছেন, যিনি যাবতীয় গুণে ও কর্মে পরিপূর্ণ, তিনিই ‘সমাদ’। কেউ কেউ বলেছেন, প্রতিটি কর্মের যিনি মূল উদ্দেশ্য, প্রতিটি প্রয়োজন যার উপরে নির্ভরশীল, তিনিই ‘সমাদ’। আবার কেউ কেউ বলেছেন, ‘সমাদ’ ওই অধিপতি, যাঁর কাছে রয়েছে সকলের চাওয়া ও পাওয়া। তাই মানুষ প্রয়োজনে তাঁর কাছেই হাত পাতে এবং সাহায্য চায়। সুতরাং তিনিই সকলের একমাত্র উদ্দেশ্য। যেমন আরবী প্রবাদে বলা হয় ‘সমাদতুহু’ (আমি তাকেই উদ্দেশ্য করেছি)।
কাতাদা বলেছেন, সৃষ্টি লয় হওয়ার পর যিনি অবশিষ্ট থাকবেন, তিনিই সমাদ। হজরত আলী বলেছেন, তিনিই সমাদ, যার উপরে আর কেউ নেই। এরকম বর্ণনা করেছেন ইকরামা। রবী ইবনে আনাস বলেছেন, তিনিই সমাদ, বিপদ যাকে স্পর্শ করতে পারে না। মুকাতিল বলেছেন, সমাদ অর্থ নির্দোষ।
আমার মতে সমাদ এর প্রকৃত অর্থ লক্ষ্যস্থল। ‘কামুস’ অভিধানে লেখা রয়েছে, সমাদ অর্থ ইচ্ছাময়। যবরযুক্ত ‘মীম’ দ্বারা গঠিত ‘সমাদ’ অর্থ অধিপতি। কেননা তাঁর দাসগণের প্রতিটি কর্মের লক্ষ্যস্থল তিনিই। আর এখানকার ‘আস্সমাদ’ পদের ‘আলিফ লাম’ তাই প্রমাণ করে যে, তিনি অমুখাপেক্ষিতার চরম শিখরে আরুঢ়। সাধারণ মানুষের বুদ্ধি-বিবেক দুর্দশায়িত। প্রকৃত বিশ্বাস থেকে তাদের অবস্থান অনেক দূরে। পার্থিবতাকেই তারা বানিয়ে নিয়েছে তাদের লক্ষ্যস্থল। কিন্তু সৃষ্ট কোনোকিছু লক্ষ্যস্থল হওয়ার অযোগ্য। লক্ষ্যযোগ্য কেবল তিনিই।
উপর্যুক্ত ব্যাখ্যাসমূহের কোনোটাই শব্দটির প্রকৃত অর্থ নয়। বরং ওগুলো আনুসাঙ্গিক। কেননা সামগ্রিকরূপে লক্ষ্যস্থল কেবল তিনিই, যিনি কারোই মুখাপেক্ষী নন, অথচ সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। সন্দেহাতীতরূপে সকল উৎকর্ষ ও পূর্ণত্ব কেবল তাঁর মধ্যেই বর্তমান। সর্বপ্রকার আধিপত্য তাঁরই কর্তৃত্বাগত। আর তিনি চিরমুক্ত ও চিরপবিত্র সকল ধরনের দোষক্রটি, ক্ষতি-বিনষ্টি ও পানাহার থেকে। তিনি অনাদি। তাঁর স্বামী-ভার্যা-পিতা-সন্তান-বংশধর হওয়া অচিন্তনীয়। কেউই তাঁর সমান্তরাল, সমকক্ষ বা অংশীদার নয়। তিনি আনুরূপ্যবিহীন এক একক-আবিভাজ্য এমন এক সত্তা, যা জ্ঞান-ধারণা-কল্পনার অতীত।
উল্লেখ্য, ‘আল্লহু আহাদ’ বলার পর ‘আল্লহুস্ সমাদ’ বলার প্রয়োজন ছিলো না। কিন্তু তবু এরকম বলা হয়েছে একারণে যে, তাঁর সম্পর্কে তথাকথিত বিভিন্ন মতের লোক বিভিন্ন কথা বলে, যার কোনোটাই তাঁর আনুরূপ্যবিহীন একক সত্তার উপযুক্ত নয়। যেমন কেউ বলে, তিনি এক নন। কেউ বলে, তিনি কারো জনক,
তাফসীরে মাযহারী/৬৪০
অথবা জাত, অথবা কারো বংশসম্ভূত। এ সকল অপউক্তির মূলোৎপাটনার্থেই প্রথমে বক্তব্যটি প্রকাশ করা হয়েছে সংক্ষিপ্তভাবে। পরে করা হয়েছে সে সংক্ষিপ্তির বিস্তারণ। আর সে কারণেই ‘আল্লহুস্ সমাদ’ এর পরের বাক্যগুলো উপস্থাপনা করা হয়েছে যোজক অব্যয় ব্যতিরেকেই। ‘আল্লহু আহাদ’ বলার পর ‘আল্লহুস্ সমাদ’ বলার আর একটি উদ্দেশ্য একথা জানিয়ে দেওয়া যে, যে সত্তা সকলকিছু থেকে চিরঅমুখাপেক্ষী নন, তিনি ইবাদতেরও যোগ্য নন। আর যিনি অমুখাপেক্ষী, তিনিই মানুষের একমাত্র লক্ষ্যস্থল ও একমাত্র উপাস্য। তাঁর এমতো অমুখাপেক্ষিতা দর্শনেই তো মানুষকে বিনয়াবনতচিত্তে মেনে নিতে হয় তার একান্ত আনুগত্য। সুফী-সাধকগণ তাই লা ইলাহা ইল্লাল্লহ্ জিকির করার সময় বিলোপ করতে থাকেন তিনি ব্যতীত অন্য সকলকিছুকে। এটাই তাঁদের মূল সাধনা। বিষয়টি অতীব জটিল। এমতো জাটিল্যের অবসান ঘটাতে পারেন কেবল আল্লাহ্।
এরপরের আয়াতে (৩) বলা হয়েছে ‘লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ’ (তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি)।
মক্কার পৌত্তলিকেরা বলতো, ফেরেশতারা আল্লাহ্র কন্যা। ইহুদীরা বলতো, আল্লাহ্ নবী উযায়েরের জনক। আর খৃষ্টানেরা বলতো, আল্লাহ্ হচ্ছেন নবী ঈসার পিতা। এ সকল অপবিত্র উক্তির মূলোৎপাটনার্থেই এখানে বলা হয়েছে ‘তিনি কাউকে জন্ম দেননি’। এমতো কর্ম তাঁর জন্য অসম্ভব। কেননা তিনি কারো সমগোত্রীয় নন, নন সমকক্ষ, সমজাতীয় বা সমান্তরাল। পিতা-পুত্র-স্বামী-ভার্যা-বংশধর তো হয় সমজাতীয়রা। আর তিনি কোনো বিষয়েই অপারগ নন যে, তাঁকে পুত্রের সাহায্য গ্রহণ করতে হবে। আর ক্ষয়-বিলয় হওয়াও তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় যে, প্রতিনিধি হিসেবে তাঁকে স্থলাভিষিক্ত করতে হবে পুত্রকে।
‘তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি’ অর্থ তাঁর কোনো জনক হওয়াও অসম্ভব। কেননা এ ক্ষেত্রেও সমগোত্রীয়তা ও অমুখাপেক্ষিতা হচ্ছে অনপনেয় বাধা। তাছাড়া জাত সকল কিছুই নশ্বর। কিন্তু তিনি তো অনশ্বর। আর নশ্বরতা তো উপাস্য হওয়ারও অন্তরায়। এখন কথা হচ্ছে, এখানে অতীতকালবোধক ক্রিয়া ব্যবহার করা হলো কেনো? এর জবাবে বলা যেতে পারে যে, সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীদের অপউক্তিগুলো ছিলো অতীতকালবোধক। তাই অতীতকালবোধক ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে এখানে প্রশ্নোত্তরের সঙ্গতি রক্ষার্থে। অথবা বলা যায়, অতীতকালজ্ঞাপক ক্রিয়া ব্যবহৃত হয়েছে পরের বাক্যে। তাই এভাবে এখানে রক্ষা করা হয়েছে ক্রিয়ার কালগত সাযুজ্য।
শেষোক্ত বাক্যে বলা হয়েছে ‘ওয়া লাম ইয়াকুল্ লাহু কুফুওয়ান আহাদ’ (এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই)। এখানে ‘লাম ইয়াকুন’ এর বিধেয় ‘কুফুওয়ান’। এর উদ্দেশ্য ‘আহাদুন’। আর ‘লাহু’ পদটি এখানে সম্পর্কযুক্ত হয়েছে ‘কুফুওয়ান’ এর সঙ্গে। এভাবে বক্তব্যটি দাঁড়িয়েছে আল্লাহ্পাকের পবিত্রতাও
তাফসীরে মাযহারী/৬৪১
অতুলনীয়, নিরূপম। একারণেই এখানে সম্পর্ককে উল্লেখ করা হয়েছে সম্পর্কযুক্ততার অগ্রে। শেষোক্ত তিনটি বাক্যই এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে যোজক অব্যয় সহকারে। এরকম করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, পৃথক পৃথক প্রত্যেক ধরনের অপমন্তব্যের মূলোৎপাটন করা।
হজরত আবু হোরায়রা কর্তৃক বর্ণিত একটি সুপরিণত সূত্রসম্ভূত হাদিসে কুদসীতে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ বলেন, আদমসন্তানেরা আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করে। অথচ এরকম করা তাদের জন্য বৈধ নয়। তারা আমাকে গালি দেয়। এটাও অবৈধ। তার মিথ্যারোপের নমুনা হচ্ছে, তারা বলে, আল্লাহ্ প্রথমবার যা সৃষ্টি করেছেন, পুনর্বার তা করতে সক্ষম হবেন না। অথচ দ্বিতীয় সৃষ্টি প্রথম সৃষ্টি অপেক্ষা সহজতর। আর তাদের গালি হচ্ছে, তারা বলে, আল্লাহ্র সন্তান-সন্ততি আছে। অথচ আমি চির-অসমকক্ষ, এক-একক-অদ্বিতীয়, অমুখাপেক্ষী। আমি না জাতক, না জাত। আমি তো আনুরূপ্যবিহীন।
পরিচ্ছেদঃ হজরত আবু দারদা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. একবার বললেন, তোমরা কি প্রতি রাতে এক তৃতীয়াংশ কোরআন পাঠ করতে পারো না? আমরা বললাম, তা কী করে সম্ভব? তিনি স. বললেন, সুরা ইখলাস পুণ্যের দিক দিয়ে এক তৃতীয়াংশ কোরআনের সমতুল। হজরত আবু সাঈদ খুদরী থেকেও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন বোখারী। এরকম বর্ণনা এসেছে হজরত ইবনে আব্বাস এবং হজরত আনাস থেকেও।
মাতা মহোদয়া আয়েশা বর্ণনা করেছেন, একবার রসুল স. এক লোককে কিছুসংখ্যক সৈন্যসহ এক অভিযানে প্রেরণ করলেন। তিনি তাঁর সৈন্যদেরকে নিয়ে নামাজ পাঠকালে প্রায়শ সুরা ইখলাস তেলাওয়াত করতেন। দলটি ফিরে এলে রসুল স. সমীপে সৈন্যরা বললো, তিনি এভাবে নামাজ পড়ালেন কেনো? রসুল স. বললেন, তাকেই জিজ্ঞেস করে দ্যাখো না, সে কী বলে। সৈন্যরা তাদের দলপতিকে যখন একথা বললো, তখন দলপতি বললো, এতে রয়েছে আল্লাহ্র সত্তা ও গুণবত্তার অতুলনীয় বিবরণ। তাই আমি এ সুরাটিকে ভালোবাসি এবং অধিকাংশ সময় এই সুরা দিয়ে নামাজ পাঠ করি। রসুল স. এর কানে যখন তারা এ জবাব পৌঁছালো, তখন তিনি বললেন, তাকে বলে দিয়ো, আল্লাহ্ তাকে ভালোবাসেন। বোখারী, মুসলিম।
হজরত আনাস বর্ণনা করেছেন, একবার এক লোক রসুল স. এর সুমহান সন্নিধানে উপস্থিত হয়ে বললো, সুরাটি আমার খুব ভালো লাগে। তিনি স. বললেন, এই ভাল লাগাই তোমাকে নিয়ে যাবে জান্নাতে। তিরমিজি। বোখারীও এর সমার্থক হাদিস বর্ণনা করেছেন।
হজরত আবু হোরায়রা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. একবার এক ব্যক্তিকে সুরা ইখলাস পাঠ করতে শুনে বললেন, অপরিহার্য হয়ে গেলো। আমরা সবিনয়ে নিবেদন করলাম, হে আল্লাহ্র রসুল! কী অপরিহার্য হয়ে গেলো? তিনি স. বললেন, জান্নাত। মালেক, তিরমিজি, নাসাঈ। হজরত আনাস থেকে তিরমিজি কর্তৃক
তাফসীরে মাযহারী/৬৪২
বর্ণিত এবং উত্তম ও বিরল শ্রেণীর আখ্যায়িত এক বর্ণনায় এসেছে, রসুল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি শয়নকালে ডান কাতে শুয়ে একশত বার সুরা ইখলাস পাঠ করবে, মহাবিচারের দিবসে আল্লাহ্ তাকে বলবেন, হে আমার বান্দা! ডান দিক দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করো। তিরমিজি ও দারেমী কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, রসুল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি দৈনিক একশতবার সুরা ইখলাস পাঠ করবে, আল্লাহ্পাক ক্ষমা করে দিবেন তার পঞ্চাশ বছরের পাপ। তবে তার ঋণের বোঝার ব্যাপারটি স্বতন্ত্র। অপর এক বর্ণনাতেও পঞ্চাশ বছরের পাপ মাফ করার কথা বলা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে ঋণের উল্লেখ নেই। হজরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যেব থেকে অপরিণত সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রসুল স. একবার বললেন, যে ব্যক্তি এগারো বার ‘ক্বুল হুয়াল্লহু আহাদ’ পাঠ করবে, তার জন্য বেহেশতে নির্মাণ করা হবে একটি গৃহ। আর কুড়িবার পাঠ করলে সেখানে নির্মিত হবে দু’টি প্রাসাদ। একথা শুনে হজরত ওমর নিবেদন করলেন, হে আল্লাহ্র প্রিয়তম প্রত্যাদেশবাহক! তা হলে তো আমাদের জন্য বেহেশতে প্রাসাদ নির্মিত হবে অনেক। তিনি স. বললেন, আল্লাহ্র দান এর চেয়েও অধিক সুপ্রশস্ত। আল্লাহ্ই অধিক জ্ঞাত।
হজরত উবাই ইবনে কা’ব থেকে আবুল আলিয়া বর্ণনা করেছেন, পৌত্তলিকেরা একবার রসুল স. এর কাছে আল্লাহ্র বংশপরিচয় জানতে চায়। তখন অবতীর্ণ হয় এই সুরা। তিরমিজি, হাকেম, ইবনে মাজা। হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ্ থেকে তিবরানী এবং ইবনে জারীরও এরকম বর্ণনা করেছেন।
ইবনে আবী হাতেমের বর্ণনায় এসেছে, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, একবার কা’ব ইবনে আশরাফ, হুয়াই ইবনে আখতাব এবং আরো কয়েকজন ইহুদী রসুল স. এর মহান সংসর্গে উপস্থিত হয়ে বললো, যে আল্লাহ্ আপনাকে প্রেরণ করেছেন, তাঁর কিছু গুণ বর্ণনা করুন। তখন অবতীর্ণ হয় এই সুরা। সাঈদ ইবনে যোবায়েরের বরাত দিয়ে ইবনে জারীর, কাতাদা এবং ইবনে মুনজিরও
তাফসীরে মাযহারী/৬৩৫
এরকম বলেছেন। জুহাক, কাতাদা ও মুকাতিল সূত্রে বাগবী উল্লেখ করেছেন, একবার কিছুসংখ্যক ইহুদী পণ্ডিত রসুল স. এর সুমহান সাহচর্যে উপস্থিত হয়ে বললো, ‘আল্লাহ্র গুণাবলী সম্পর্কে কিছু বলুন। হতে পারে, আমরা ইমান গ্রহণ করবো। তওরাত কিতাবে তো আল্লাহ্ তাঁর অনেক গুণের উল্লেখ করেছেন। বলুন, তিনি কিসের তৈরী? তিনি কী আহার করেন, না করেন না? কেউ তার অংশীদার কিনা। যদি থাকে, তবে সে কে? তাদের এমতো অপবচনের প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয় সুরা ইখলাস।
আবান সূত্রে আবু শায়েখ বর্ণনা করেছেন, হজরত আনাস বলেছেন, খায়বরের কতিপয় ইহুদী একবার রসুল স. সকাশে উপস্থিত হয়ে বললো, আবুল কাসেম! আল্লাহ্পাক তাঁর অন্তরালবর্তী জ্যোতি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন ফেরেশতামণ্ডলীকে, আসমানকে সৃষ্টি করেছেন গলিত কর্দম দ্বারা, আগুনের স্ফুলিঙ্গ দ্বারা ইবলিসকে। তেমনি ধোঁয়া থেকে আকাশ এবং পানির বুদ্বুদ থেকে পৃথিবীকে। এখন বলুন, আপনার পালনকর্তা কিসের তৈরী? রসুল স. নীরব হয়ে রইলেন। তখন সুরা ইখলাস নিয়ে আবির্ভূত হলেন হজরত জিবরাইল। এ সকল বর্ণনা দৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে, সুরা ইখলাস অবতীর্ণ হয়েছে মদীনায়।
ইবনে জারীরের বর্ণনায় এসেছে, আবুল আলিয়া বলেছেন, বিভিন্ন গোত্রের গোত্রপ্রধানেরা একবার রসুল স. এর পবিত্র সংসর্গে উপস্থিত হয়ে বললো, আপনি আমাদের কাছে আপনার প্রভুপালকের বংশপরিচয় প্রকাশ করুন। তাদের এরকম অপবিত্র উক্তির প্রেক্ষিতে হজরত জিবরাইল আনেন এই সুরাখানি। এই বর্ণনাটিও একথা প্রমাণ করে যে, সুরাখানির অবতরণস্থল মদীনা। ইতোপূর্বে হজরত উবাই ইবনে কা’ব কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে যে অংশীবাদীদের কথা বলা হয়েছে, সম্ভবত তারাই বিভিন্ন গোত্রের গোত্রপ্রধান। আর এরকমও হতে পারে যে, অংশীবাদী ও ইহুদী উভয় গোত্রের গোত্রপ্রধানেরা তখন একসঙ্গে উপস্থিত হয়ে রসুল স.কে এরকম অপপ্রশ্ন করেছিলো।
আবু জুবিয়ান ও আবু সালেহ সূত্রে বাগবী বর্ণনা করেছেন, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, একবার আমের ইবনে তোফায়েল ও আব্বাদ ইবনে রবীয়া রসুল স. এর সুমহান সান্নিধ্যে উপস্থিত হলো। আমের বললো, মোহাম্মদ! তুমি আমাদেরকে কার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে? তিনি স. জবাব দিলেন, মহান আল্লাহ্র প্রতি। আমের পুনরায় জিজ্ঞেস করলো, আল্লাহ্ কীভাবে সৃষ্ট হলেন, সে সম্পর্কে কিছু বলো। তিনি সোনার, না রূপার? না কাষ্ঠনির্মিত? তাদের এরকম মন্দ উক্তির পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয় সুরা ইখলাস। আব্বাদ ভস্মীভূত হয়েছিলো বজ্রাঘাতে এবং আমের ধ্বস হয়েছিলো মহামারীতে।
সূরা ইখলাসঃ আয়াত ১, ২, ৩, ৪
তাফসীরে মাযহারী/৬৩৬
* বল, ‘তিনিই আল্লাহ্, এক-অদ্বিতীয়,
* ‘আল্লাহ্ কাহারও মুখাপেক্ষী নহেন, সকলেই তাঁহার মুখাপেক্ষী;
* ‘তিনি কাহাকেও জন্ম দেন নাই এবং তাঁহাকেও জন্ম দেওয়া হয় নাই,
* ‘এবং তাঁহার সমতুল্য কেহই নাই।’
প্রথমে বলা হয়েছে ‘ক্বুল হুয়াল্লহু আহাদ’ (বলো, তিনিই আল্লাহ্, এক-অদ্বিতীয়)। এখানকার ‘হুয়া’ (তিনি) সর্বনামটি অভিজাত শ্রেণীর। এখানে ‘তিনি’ উদ্দেশ্য এবং বিধেয় এর পরের বাক্যটি। অথবা এখানকার ‘হুয়া’ একটি সাধারণ সর্বনাম; যা সম্পর্কযুক্ত হবে সেই প্রভুপালনকর্তার সঙ্গে, যার সম্পর্কে করা হয়েছে জিজ্ঞাসাবাদ। এভাবে বক্তব্যটি দাঁড়ায় হে আমার প্রিয়তম বাণীবাহক! আপনি তাদেরকে বলুন, হে অংশীবাদীর দল! তোমরা আমার নিকট যাঁর পরিচয় জানতে চেয়েছো, জেনে রাখো তিনি এক-একক-অদ্বিতীয়’। এখানকার ‘আহাদুন’ ‘আল্লাহ্র’ অনুবর্তী। অথবা বলা যায়, ‘আহাদুন’ এখানে বিধেয় হয়েছে ‘হুয়া’ সর্বনাম থেকে। আর এখানকার ‘আহাদুন’এর মূলরূপ ছিলো ‘ওয়াহাদা’। ‘ওয়াহাদা’ এবং ‘ওয়াহিদ’ সমার্থক। হজরত ইবনে মাসউদের ক্বেরাতে ‘হুয়াল্লহু আহাদ’ স্থলে রয়েছে ‘লাওয়াহিদ’। হজরত ওমরের ক্বেরাতেও তা-ই।
যদি ‘হুয়া’ সর্বনামকে অভিজাত সর্বনাম ধরে নেওয়া হয়, ‘আল্লাহ্’কে ধরে নেওয়া হয় উদ্দেশ্য এবং ‘আহাদ’কে বিধেয়, তাহলে বাক্যের বিশুদ্ধ মর্মার্থ প্রকাশ্য অর্থে হবে না। কারণ একটি অবিভাজ্য প্রকৃত সত্তার নাম আল্লাহ্। আর যা অবিভাজ্য, তাতে একাধিকতা অসম্ভব। যেমন জায়েদ একজনের নাম, যা একজনকেই বুঝায় এবং নাকচ করে দেয় একাধিকতাকে। আর তা কোনোকিছুর সমষ্টিও নয়। কেননা এখানে বিদ্যমান সামষ্টিকতার একক। এরপর পুনরায় তাকে এক বলা সঙ্গত নয়। তাই ‘আল্লাহ্’ পদটির দ্বারা এমন এক সাধারণ সত্তাকে মেনে নিতে হয়, যিনি একক উপাস্য হওয়ার প্রকৃত যোগ্য। কারো উপাস্য হওয়ার যোগ্য হতে পারেন কেবল তিনিই, যিনি তাকে অনস্তিত্ব থেকে আনেন অস্তিত্বে এবং সেই সঙ্গে পূর্ণ করে দেন তার স্থিতিলাভের প্রয়োজনসমূহকে। আর যিনি স্বয়ম্ভু, তিনিই অপরকে অস্তিত্ব দান করতে সক্ষম। সেই অবিভাজ্য সত্তার গুণাবলীও পূর্ণ ও পরিণত, নশ্বরতা ও অসম্পূর্ণতা থেকে চিরপবিত্র। সৃষ্টি তাঁর সত্তা ও গুণবত্তা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। তিনিও সৃষ্টির সত্তা ও গুণবত্তা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। সৃষ্টির সত্তা ও গুণবত্তার সঙ্গে তাঁর সত্তা ও গুণবত্তার কোনো সংযোগই নেই। যা স্বয়ম্ভু ও স্বাধিষ্ঠ নয়, তা অপরকে অধিষ্ঠিত করতে পারবে কীভাবে? বরং তার নিজের বিদ্যমানতাই তো সেই স্বয়ম্ভু সত্তা ও গুণবত্তার প্রতিবিম্ব, শাখা-প্রশাখা কদাচ নয়। কেননা শাখা-প্রশাখার সংযোগ থাকে মূলের সঙ্গে। কিন্তু সৃষ্টির সঙ্গে সত্তার এমতো সম্পর্ক কল্পনা করা যায় না। সুতরাং সৃষ্টি কেবলই প্রতিবিম্ব, যে প্রতিবিম্বে আল্লাহ্ই দয়া করে দান করেছেন অস্তিত্ব ও স্থায়িত্ব। সুতরাং আল্লাহ্ই কেবল আনুরূপ্যবিহীন, এক-একক-অবিভাজ্য-অসমকক্ষ ও অংশীবিহীন এরকম ব্যাখ্যাই
তাফসীরে মাযহারী/৬৩৭
অধিক ফলপ্রসূ সঙ্গতিপূর্ণ ও সমীচীন। কিন্তু এরকম ব্যাখ্যা আবার অংশীবাদী ও ইহুদীদের প্রশ্নের যথাযথ জবাবও নয়। কেননা তারা প্রশ্ন করেছিলো ভিন্নভাবে। অর্থাৎ আল্লাহ্র এককত্বের স্বরূপ জানতে চেয়ে তারা কিছু বলেনি। কারণ রসুল স. তাদেরকে প্রথম থেকেই একটি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন কলেমার প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। সে কলেমা হচ্ছে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লহ’ (আল্লাহ্ ভিন্ন অন্য কোনো উপাস্যই নেই)। তাদের প্রশ্ন ছিলো অত্যন্ত অযথার্থ ও স্থুল। তারা বলেছিলো, যিনি তোমাকে প্রেরণ করেছেন, তাঁর উপাদানগত বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করুন। বলো তিনি কিসের তৈরী সোনা, রূপা, লোহার, না কাঠের।
যদি এখানকার ‘হুয়া’ (তিনি) সর্বনামকে ওই অবিভাজ্য সত্তার স্থলাভিষিক্তও ধরা হয়, যেরূপ উল্লেখ করা হয়েছিলো প্রশ্নকারীদের প্রশ্নে, তবুও এ বাক্যটি তাদের প্রশ্নের সঠিক উত্তর হবে না। অর্থাৎ কথাটি তাদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর নয়। আল্লাহ্র এককত্ব সম্পর্কে তারা তো প্রশ্নই করেনি। বরং নবী প্রেরণকারী ওই সত্তার যৌগিক তত্ত্ব সম্পর্কে তারা প্রশ্ন তুলেছিলো। একারণেই উভয় অবস্থায় আল্লাহ্ হবেন যাবতীয় সংযোজন, বিয়োজন, পরিযোজন, পরিবর্ধন, এক কথায় সকল যৌগিকত্বের যাবতীয় অনিবার্যতা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত, পবিত্র। অর্থাৎ তিনি চির অমুখাপেক্ষী আকার-নিরাকার, প্রকার-প্রকৃতি থেকে। তাঁর সাত্তিক তত্ত্ব চির অসমকক্ষ। গুণবত্তার ক্ষেত্রেও কেউ অথবা কোনোকিছু তাঁর তুল্য নয়। অংশীদার তো নয়ই। সুতরাং কেউ অথবা কোনোকিছুই তাঁর মতো নয়। তিনি যে অনুরূপ্যবিহীন। একারণেই আল্লাহ্র পরিচয় ধন্য সুফী-আউলিয়াগণ বলেন, আল্লাহ্র সত্তা-গুণবত্তা ও কার্যকলাপে কারো অথবা কোনোকিছুর কোনোই অংশ নেই। তাঁর অবোধ্য সত্তা তাঁরই গুণবত্তার সমাহার, কিন্তু তাঁর ভিত্তি নয়। বরং তিনি তাঁর গুণরাজিরও ভিত্তি। আর তাঁর গুণরাজির মূল হচ্ছে তাঁরই চিরজীবিতা (হায়াত) গুণ (সিফাত)। ওই হায়াত সিফাতের ভিত্তিতেই দাঁড়িয়ে আছে তাঁর অন্যান্য গুণ জ্ঞান (এলেম) শক্তিমত্তা (কুদরত) অভিপ্রায় (এরাদা) বাণী (কালাম) দর্শন (বাসার) শ্রবণ (সামা) ইত্যাদি। আর হায়াত হচ্ছে তাঁরই সত্তার শাখা বা ভিত্তি। অর্থাৎ তাঁর সত্তা (জাত) যেনো মৌলিক অসমাধ্য একটি বিষয়, যার উৎস হচ্ছে তাঁরই অস্তিত্ব। সেকারণেই সুফি-সাধকগণ বলেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লহ্ অর্থ লা মাওজুদা ইল্লাল্লহ্ (তাঁর বিদ্যমানতা ছাড়া আর কারো বিদ্যমানতাই নেই)। কেননা প্রকৃত বিদ্যমানতা রয়েছে কেবল আল্লাহ্র। সমগ্র বিশ্বজগত যেনো ওই বিদ্যমানতারই ছায়া-প্রচ্ছায়া। যেমন এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘আল্লাহ্ই চিরস্থায়ী, মৌলিক মহাসত্য। যারা তাঁকে ছাড়া অন্যকে ডাকে তারা মিথ্যা’। আর এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘তিনি ব্যতীত অন্য সকল কিছুই ধ্বংসশীল’। অর্থাৎ সকলকিছুই নশ্বর, অনশ্বর কেবল আল্লাহ্। সুতরাং প্রকৃত কথা এই যে, আল্লাহ্র অস্তিত্ব ও গুণবত্তার সঙ্গে সৃষ্টির অস্তিত্ত্ব ও গুণবত্তার সাদৃশ্য রয়েছে কেবল নামত। প্রকৃতপ্রস্তাবে স্রষ্টা ও সৃষ্টি মিলিত বা পরস্পর সম্পৃক্ত নয়। যারা এমতো ব্যাখ্যা বুঝতে অক্ষম, তাদের উচিত, তারা যেনো
তাফসীরে মাযহারী/৬৩৮
সুফি-আউলিয়াগণের সাহচর্য-সম্পৃক্ত হয়। তাহলে হয়তো তাদের সম্মুখে উন্মুক্ত হতে পারে তত্ত্বজ্ঞানের দুয়ার। আল্লাহ্তায়ালার আনুরূপ্যহীন এককত্বই কি তাঁর চিরবিদ্যমানতা ও তাঁর প্রতিপালনযোগ্যতার জন্য যথেষ্ট নয়? সকল কিছুই যে তাঁর জ্ঞানগোচর। অথচ অজ্ঞ সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীরা এ বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করে। এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে না যে, তাঁর আনুরূপ্যহীন জ্ঞান ও ক্ষমতা সকল কিছুকেই আনুরূপ্যবিহীন ভাবে সতত পরিবেষ্টন করে রয়েছে। আর এই আয়াতটি তাঁর পরিপূর্ণ সত্তা ও গুণবত্তার প্রতি ইঙ্গিতবহ।
‘ক্বুল’ অর্থ বলো। অর্থাৎ হে আমার প্রিয়তম রসুল! আপনি তাদেরকে বলুন। ‘ক্বুল হুয়াল্লহু আহাদ’ অর্থ তিনিই আল্লাহ্, এক-অদ্বিতীয়। এই বাক্যটিতে প্রকাশ পেয়েছে নবী-রসুলগণ কর্তৃক প্রচারিত বাণীর সারমর্ম। আর এই বাণীটি এমন এক জ্ঞানগর্ভ ও মহান বাণী যে, বিশাল বিশাল গ্রনে'র বক্তব্যাবলী যেনো এর কাছে কিছুই নয়। আর এই মহান বাণীর জটিল জটিলতর ব্যাখ্যার আবশ্যকও কিন্তু নেই। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্র অবোধ্য সত্তা ও গুণবত্তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আলোচনা অবশেষে অন্তর্ভূত হয় যুক্তিবিদ্যাতেই। যারা প্রজ্ঞার ক্ষেত্রে অনুপযুক্ত, তাদের কাছে বরং এরকম জটিল আলোচনা ধ্বংসাত্মক। যেমন এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘আপনাকে তারা রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আপনি তাদেরকে বলুন, রূহ হচ্ছে আমার প্রভুপালকের পক্ষে থেকে একটি আদেশ’। রূহও আল্লাহ্র সৃষ্টি। সেই রূহের রহস্যোদ্ধারই যখন নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে, তখন রূহের স্রষ্টার সত্তাগুণবত্তার রহস্যোদ্ধারকর্মও নিশ্চয় সাধারণভাবে নিষিদ্ধ। বরং বুঝতে হবে, এ প্রসঙ্গে যে ব্যক্তি তার অক্ষমতার পরিচয় পায়, সে-ই আসলে জ্ঞানী। আর এ জ্ঞান লাভ হতে পারে কেবল তাদের, যারা পায় তাঁর ব্যবধানরহিত আনুরূপ্যহীন সামীপ্য ও সান্নিধ্য। হজরত আবু হোরায়রা বর্ণনা করেছেন, একবার আমরা নিয়তি সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। এমন সময় রসুল স. সেখানে উপস্থিত হয়ে আমাদের কথা শুনলেন। দেখলাম, তিনি রোষতপ্ত। মুখমণ্ডল রক্তিমাভ। মনে হচ্ছিলো, তাঁর পবিত্র মুখাবয়বে ঘষে দেওয়া হয়েছে আনারের লাল দানা। বললেন, এ প্রসঙ্গে আলোচনা করার জন্য কি তোমরা আদেশপ্রাপ্ত? এজন্যই কি তোমাদের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে আমাকে? এ সম্পর্কে তর্কাতর্কি করতে গিয়েই তো তোমাদের পূর্ববর্তীরা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। সাবধান! এ প্রসঙ্গে আর আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়ো না। তিরমিজি, ইবনে মাজা, শোয়ায়েব থেকে আমর ইবনে শোয়ায়েব।
পরের আয়াতে (২) বলা হয়েছে ‘আল্লহুস্ সমাদ’ (আল্লাহ্ কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী)। হজরত ইবনে আব্বাস, হাসান বসরী এবং সাঈদ ইবনে যোবায়ের বলেছেন, ‘সমাদ’ অর্থ নির্ভীক, বেপরোয়া। হজরত বুরাইদা এবং ইবনে জারীরও এরকম বলেছেন। আমার ধারণা, সম্ভবত বর্ণনাটি সুপরিণত সূত্রজাত। আর কথাটি রূপকার্থক। কেননা তিনি জ্ঞানাতীত, বোধ্য গুণাতীত, ধারণা-কল্পনার অতীত।
তাফসীরে মাযহারী/৬৩৯
শা’বী বলেছেন, তিনিই ‘সমাদ’ যিনি পানাহারের প্রয়োজন থেকে মুক্ত। কেউ কেউ বলেছেন, শব্দটির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে পরবর্তী বাক্যে। এরকম বলেছেন হজরত উবাই ইবনে কা’ব থেকে আবুল আলিয়া। আবু ওয়াইল শাকিক ইবনে সালমা বলেছেন ‘সমাদ’ অর্থ সর্বদিক দিয়ে যার কর্তৃত্ব শিখরস্পর্শী। আবু তালহা সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, হজরত ইবনে আব্বাস শব্দটির এরূপই মর্মার্থ করেছেন। সাঈদ ইবনে যোবায়ের বলেছেন, যিনি যাবতীয় গুণে ও কর্মে পরিপূর্ণ, তিনিই ‘সমাদ’। কেউ কেউ বলেছেন, প্রতিটি কর্মের যিনি মূল উদ্দেশ্য, প্রতিটি প্রয়োজন যার উপরে নির্ভরশীল, তিনিই ‘সমাদ’। আবার কেউ কেউ বলেছেন, ‘সমাদ’ ওই অধিপতি, যাঁর কাছে রয়েছে সকলের চাওয়া ও পাওয়া। তাই মানুষ প্রয়োজনে তাঁর কাছেই হাত পাতে এবং সাহায্য চায়। সুতরাং তিনিই সকলের একমাত্র উদ্দেশ্য। যেমন আরবী প্রবাদে বলা হয় ‘সমাদতুহু’ (আমি তাকেই উদ্দেশ্য করেছি)।
কাতাদা বলেছেন, সৃষ্টি লয় হওয়ার পর যিনি অবশিষ্ট থাকবেন, তিনিই সমাদ। হজরত আলী বলেছেন, তিনিই সমাদ, যার উপরে আর কেউ নেই। এরকম বর্ণনা করেছেন ইকরামা। রবী ইবনে আনাস বলেছেন, তিনিই সমাদ, বিপদ যাকে স্পর্শ করতে পারে না। মুকাতিল বলেছেন, সমাদ অর্থ নির্দোষ।
আমার মতে সমাদ এর প্রকৃত অর্থ লক্ষ্যস্থল। ‘কামুস’ অভিধানে লেখা রয়েছে, সমাদ অর্থ ইচ্ছাময়। যবরযুক্ত ‘মীম’ দ্বারা গঠিত ‘সমাদ’ অর্থ অধিপতি। কেননা তাঁর দাসগণের প্রতিটি কর্মের লক্ষ্যস্থল তিনিই। আর এখানকার ‘আস্সমাদ’ পদের ‘আলিফ লাম’ তাই প্রমাণ করে যে, তিনি অমুখাপেক্ষিতার চরম শিখরে আরুঢ়। সাধারণ মানুষের বুদ্ধি-বিবেক দুর্দশায়িত। প্রকৃত বিশ্বাস থেকে তাদের অবস্থান অনেক দূরে। পার্থিবতাকেই তারা বানিয়ে নিয়েছে তাদের লক্ষ্যস্থল। কিন্তু সৃষ্ট কোনোকিছু লক্ষ্যস্থল হওয়ার অযোগ্য। লক্ষ্যযোগ্য কেবল তিনিই।
উপর্যুক্ত ব্যাখ্যাসমূহের কোনোটাই শব্দটির প্রকৃত অর্থ নয়। বরং ওগুলো আনুসাঙ্গিক। কেননা সামগ্রিকরূপে লক্ষ্যস্থল কেবল তিনিই, যিনি কারোই মুখাপেক্ষী নন, অথচ সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। সন্দেহাতীতরূপে সকল উৎকর্ষ ও পূর্ণত্ব কেবল তাঁর মধ্যেই বর্তমান। সর্বপ্রকার আধিপত্য তাঁরই কর্তৃত্বাগত। আর তিনি চিরমুক্ত ও চিরপবিত্র সকল ধরনের দোষক্রটি, ক্ষতি-বিনষ্টি ও পানাহার থেকে। তিনি অনাদি। তাঁর স্বামী-ভার্যা-পিতা-সন্তান-বংশধর হওয়া অচিন্তনীয়। কেউই তাঁর সমান্তরাল, সমকক্ষ বা অংশীদার নয়। তিনি আনুরূপ্যবিহীন এক একক-আবিভাজ্য এমন এক সত্তা, যা জ্ঞান-ধারণা-কল্পনার অতীত।
উল্লেখ্য, ‘আল্লহু আহাদ’ বলার পর ‘আল্লহুস্ সমাদ’ বলার প্রয়োজন ছিলো না। কিন্তু তবু এরকম বলা হয়েছে একারণে যে, তাঁর সম্পর্কে তথাকথিত বিভিন্ন মতের লোক বিভিন্ন কথা বলে, যার কোনোটাই তাঁর আনুরূপ্যবিহীন একক সত্তার উপযুক্ত নয়। যেমন কেউ বলে, তিনি এক নন। কেউ বলে, তিনি কারো জনক,
তাফসীরে মাযহারী/৬৪০
অথবা জাত, অথবা কারো বংশসম্ভূত। এ সকল অপউক্তির মূলোৎপাটনার্থেই প্রথমে বক্তব্যটি প্রকাশ করা হয়েছে সংক্ষিপ্তভাবে। পরে করা হয়েছে সে সংক্ষিপ্তির বিস্তারণ। আর সে কারণেই ‘আল্লহুস্ সমাদ’ এর পরের বাক্যগুলো উপস্থাপনা করা হয়েছে যোজক অব্যয় ব্যতিরেকেই। ‘আল্লহু আহাদ’ বলার পর ‘আল্লহুস্ সমাদ’ বলার আর একটি উদ্দেশ্য একথা জানিয়ে দেওয়া যে, যে সত্তা সকলকিছু থেকে চিরঅমুখাপেক্ষী নন, তিনি ইবাদতেরও যোগ্য নন। আর যিনি অমুখাপেক্ষী, তিনিই মানুষের একমাত্র লক্ষ্যস্থল ও একমাত্র উপাস্য। তাঁর এমতো অমুখাপেক্ষিতা দর্শনেই তো মানুষকে বিনয়াবনতচিত্তে মেনে নিতে হয় তার একান্ত আনুগত্য। সুফী-সাধকগণ তাই লা ইলাহা ইল্লাল্লহ্ জিকির করার সময় বিলোপ করতে থাকেন তিনি ব্যতীত অন্য সকলকিছুকে। এটাই তাঁদের মূল সাধনা। বিষয়টি অতীব জটিল। এমতো জাটিল্যের অবসান ঘটাতে পারেন কেবল আল্লাহ্।
এরপরের আয়াতে (৩) বলা হয়েছে ‘লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ’ (তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি)।
মক্কার পৌত্তলিকেরা বলতো, ফেরেশতারা আল্লাহ্র কন্যা। ইহুদীরা বলতো, আল্লাহ্ নবী উযায়েরের জনক। আর খৃষ্টানেরা বলতো, আল্লাহ্ হচ্ছেন নবী ঈসার পিতা। এ সকল অপবিত্র উক্তির মূলোৎপাটনার্থেই এখানে বলা হয়েছে ‘তিনি কাউকে জন্ম দেননি’। এমতো কর্ম তাঁর জন্য অসম্ভব। কেননা তিনি কারো সমগোত্রীয় নন, নন সমকক্ষ, সমজাতীয় বা সমান্তরাল। পিতা-পুত্র-স্বামী-ভার্যা-বংশধর তো হয় সমজাতীয়রা। আর তিনি কোনো বিষয়েই অপারগ নন যে, তাঁকে পুত্রের সাহায্য গ্রহণ করতে হবে। আর ক্ষয়-বিলয় হওয়াও তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় যে, প্রতিনিধি হিসেবে তাঁকে স্থলাভিষিক্ত করতে হবে পুত্রকে।
‘তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি’ অর্থ তাঁর কোনো জনক হওয়াও অসম্ভব। কেননা এ ক্ষেত্রেও সমগোত্রীয়তা ও অমুখাপেক্ষিতা হচ্ছে অনপনেয় বাধা। তাছাড়া জাত সকল কিছুই নশ্বর। কিন্তু তিনি তো অনশ্বর। আর নশ্বরতা তো উপাস্য হওয়ারও অন্তরায়। এখন কথা হচ্ছে, এখানে অতীতকালবোধক ক্রিয়া ব্যবহার করা হলো কেনো? এর জবাবে বলা যেতে পারে যে, সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীদের অপউক্তিগুলো ছিলো অতীতকালবোধক। তাই অতীতকালবোধক ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে এখানে প্রশ্নোত্তরের সঙ্গতি রক্ষার্থে। অথবা বলা যায়, অতীতকালজ্ঞাপক ক্রিয়া ব্যবহৃত হয়েছে পরের বাক্যে। তাই এভাবে এখানে রক্ষা করা হয়েছে ক্রিয়ার কালগত সাযুজ্য।
শেষোক্ত বাক্যে বলা হয়েছে ‘ওয়া লাম ইয়াকুল্ লাহু কুফুওয়ান আহাদ’ (এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই)। এখানে ‘লাম ইয়াকুন’ এর বিধেয় ‘কুফুওয়ান’। এর উদ্দেশ্য ‘আহাদুন’। আর ‘লাহু’ পদটি এখানে সম্পর্কযুক্ত হয়েছে ‘কুফুওয়ান’ এর সঙ্গে। এভাবে বক্তব্যটি দাঁড়িয়েছে আল্লাহ্পাকের পবিত্রতাও
তাফসীরে মাযহারী/৬৪১
অতুলনীয়, নিরূপম। একারণেই এখানে সম্পর্ককে উল্লেখ করা হয়েছে সম্পর্কযুক্ততার অগ্রে। শেষোক্ত তিনটি বাক্যই এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে যোজক অব্যয় সহকারে। এরকম করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, পৃথক পৃথক প্রত্যেক ধরনের অপমন্তব্যের মূলোৎপাটন করা।
হজরত আবু হোরায়রা কর্তৃক বর্ণিত একটি সুপরিণত সূত্রসম্ভূত হাদিসে কুদসীতে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ বলেন, আদমসন্তানেরা আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করে। অথচ এরকম করা তাদের জন্য বৈধ নয়। তারা আমাকে গালি দেয়। এটাও অবৈধ। তার মিথ্যারোপের নমুনা হচ্ছে, তারা বলে, আল্লাহ্ প্রথমবার যা সৃষ্টি করেছেন, পুনর্বার তা করতে সক্ষম হবেন না। অথচ দ্বিতীয় সৃষ্টি প্রথম সৃষ্টি অপেক্ষা সহজতর। আর তাদের গালি হচ্ছে, তারা বলে, আল্লাহ্র সন্তান-সন্ততি আছে। অথচ আমি চির-অসমকক্ষ, এক-একক-অদ্বিতীয়, অমুখাপেক্ষী। আমি না জাতক, না জাত। আমি তো আনুরূপ্যবিহীন।
পরিচ্ছেদঃ হজরত আবু দারদা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. একবার বললেন, তোমরা কি প্রতি রাতে এক তৃতীয়াংশ কোরআন পাঠ করতে পারো না? আমরা বললাম, তা কী করে সম্ভব? তিনি স. বললেন, সুরা ইখলাস পুণ্যের দিক দিয়ে এক তৃতীয়াংশ কোরআনের সমতুল। হজরত আবু সাঈদ খুদরী থেকেও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন বোখারী। এরকম বর্ণনা এসেছে হজরত ইবনে আব্বাস এবং হজরত আনাস থেকেও।
মাতা মহোদয়া আয়েশা বর্ণনা করেছেন, একবার রসুল স. এক লোককে কিছুসংখ্যক সৈন্যসহ এক অভিযানে প্রেরণ করলেন। তিনি তাঁর সৈন্যদেরকে নিয়ে নামাজ পাঠকালে প্রায়শ সুরা ইখলাস তেলাওয়াত করতেন। দলটি ফিরে এলে রসুল স. সমীপে সৈন্যরা বললো, তিনি এভাবে নামাজ পড়ালেন কেনো? রসুল স. বললেন, তাকেই জিজ্ঞেস করে দ্যাখো না, সে কী বলে। সৈন্যরা তাদের দলপতিকে যখন একথা বললো, তখন দলপতি বললো, এতে রয়েছে আল্লাহ্র সত্তা ও গুণবত্তার অতুলনীয় বিবরণ। তাই আমি এ সুরাটিকে ভালোবাসি এবং অধিকাংশ সময় এই সুরা দিয়ে নামাজ পাঠ করি। রসুল স. এর কানে যখন তারা এ জবাব পৌঁছালো, তখন তিনি বললেন, তাকে বলে দিয়ো, আল্লাহ্ তাকে ভালোবাসেন। বোখারী, মুসলিম।
হজরত আনাস বর্ণনা করেছেন, একবার এক লোক রসুল স. এর সুমহান সন্নিধানে উপস্থিত হয়ে বললো, সুরাটি আমার খুব ভালো লাগে। তিনি স. বললেন, এই ভাল লাগাই তোমাকে নিয়ে যাবে জান্নাতে। তিরমিজি। বোখারীও এর সমার্থক হাদিস বর্ণনা করেছেন।
হজরত আবু হোরায়রা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. একবার এক ব্যক্তিকে সুরা ইখলাস পাঠ করতে শুনে বললেন, অপরিহার্য হয়ে গেলো। আমরা সবিনয়ে নিবেদন করলাম, হে আল্লাহ্র রসুল! কী অপরিহার্য হয়ে গেলো? তিনি স. বললেন, জান্নাত। মালেক, তিরমিজি, নাসাঈ। হজরত আনাস থেকে তিরমিজি কর্তৃক
তাফসীরে মাযহারী/৬৪২
বর্ণিত এবং উত্তম ও বিরল শ্রেণীর আখ্যায়িত এক বর্ণনায় এসেছে, রসুল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি শয়নকালে ডান কাতে শুয়ে একশত বার সুরা ইখলাস পাঠ করবে, মহাবিচারের দিবসে আল্লাহ্ তাকে বলবেন, হে আমার বান্দা! ডান দিক দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করো। তিরমিজি ও দারেমী কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, রসুল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি দৈনিক একশতবার সুরা ইখলাস পাঠ করবে, আল্লাহ্পাক ক্ষমা করে দিবেন তার পঞ্চাশ বছরের পাপ। তবে তার ঋণের বোঝার ব্যাপারটি স্বতন্ত্র। অপর এক বর্ণনাতেও পঞ্চাশ বছরের পাপ মাফ করার কথা বলা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে ঋণের উল্লেখ নেই। হজরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যেব থেকে অপরিণত সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, রসুল স. একবার বললেন, যে ব্যক্তি এগারো বার ‘ক্বুল হুয়াল্লহু আহাদ’ পাঠ করবে, তার জন্য বেহেশতে নির্মাণ করা হবে একটি গৃহ। আর কুড়িবার পাঠ করলে সেখানে নির্মিত হবে দু’টি প্রাসাদ। একথা শুনে হজরত ওমর নিবেদন করলেন, হে আল্লাহ্র প্রিয়তম প্রত্যাদেশবাহক! তা হলে তো আমাদের জন্য বেহেশতে প্রাসাদ নির্মিত হবে অনেক। তিনি স. বললেন, আল্লাহ্র দান এর চেয়েও অধিক সুপ্রশস্ত। আল্লাহ্ই অধিক জ্ঞাত।
Tuesday, 12 August 2008
সূরা ফালাক্ব
মহাপুণ্যতীর্থ মদীনাভূমিতে অবতীর্ণ হয়েছে এই সুরাখানি। এর মধ্যে আয়াত রয়েছে ৫টি।
আবু সালেহ সূত্রে কালাবী বর্ণনা করেছেন, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, একবার রসুল স. কঠিন অসুখে পড়লেন। এক রাতে স্বপ্নে দেখলেন, দুজন ফেরেশতা এলো। একজন বসলো তাঁর শিয়রে, আর একজন পায়ের কাছে। দুজনের মধ্যে কথোপকথন শুরু হলো এভাবে এঁর কী হয়েছে? ইনি তো অসুস্থ। কী অসুখ? যাদুগ্রস্ততা। কে যাদু করেছে? ইহুদী লবীদ ইবনে আসাম। কীভাবে? চামড়ার ফিতায় যাদুমন্ত্র করে পাথর চাপা দিয়ে রেখে দেওয়া হয়েছে অমুক কূপের ভিতরে। যাও, সেটিকে বের করে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দাও। রসুল স. এর তন্দ্রা ভেঙে গেলো। ভোর হলো। রসুল স. হজরত আম্মার ইবনে ইয়াসার ও তাঁর কয়েকজন সঙ্গীকে কথিত কূপে পাথরচাপা দিয়ে রাখা যাদুকৃত ফিতাটি উদ্ধার করে আনতে বললেন। তাঁরা অল্পক্ষণের মধ্যেই নির্দেশ প্রতিপালন করলেন। যাদুর ফিতাটি এনে দেখা গেলো, তার মধ্যে পেঁচানো রয়েছে একটি সূতা। সূতাটিতে রয়েছে এগারোটি গিঁট। এই ঘটনাটির প্রেক্ষিতেই অবতীর্ণ হয় সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস। এই দুই সুরায় আয়াত রয়েছে মোট এগারোটি। তিনি স. একটি করে আয়াত পড়তে লাগলেন। সঙ্গে সঙ্গে খুলে যেতে লাগলো একটি করে গিঁট। বায়হাকী তাঁর দালায়েলুন নবুওয়াত গ্রন্থে এরকমই বিবরণ দিয়েছেন।
তাফসীরে মাযহারী/৬৪৩
আবু নাঈম তাঁর দালায়েল গ্রন্থে আবু জাফর রাজী সূত্রে লিখেছেন, হজরত আনাস বলেছেন, একবার ইহুদীরা রসুল স. এর উপরে কিছু একটা করলো। তিনি স. পীড়িত হয়ে পড়লেন। শয্যাশায়ী রসুলের নিকটে অস্থির হয়ে যাতায়াত করতে লাগলেন সাহাবীগণ। এমন সময় একদিন হজরত জিবরাইল আর্বিভূত হলেন সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস নিয়ে। রসুল স. সুরা দুটি দিয়ে তাবীজ বানালেন। সঙ্গে সঙ্গে দূর হয়ে গেলো তাঁর পীড়া।
বাগবী লিখেছেন, মাতা মহোদয়া আয়েশা এবং হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, রসুল স. এর ছিলো এক ইহুদী অনুচর। ইহুদীরা তাকে হাত করলো। তার মাধ্যমে তারা সংগ্রহ করতে সক্ষম হলো রসুল স. এর মস্তকের কেশ এবং তাঁর চিরুনীর কয়েকটি দাঁত। ওগুলোর সাহায্যে তারা রসুল স. এর উপরে যাদু করে বসলো। এ অপকর্মের মূল হোতা ছিলো লবীদ ইবনে আসাম। এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করেই অবতীর্ণ হয় সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস।
স্বসূত্রে বাগবী লিখেছেন, জননী আয়েশা সিদ্দিকা বলেছেন, রসুল স. একবার রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। রোগের প্রকোপে কখনো কখনো স্মৃতিভ্রমও ঘটতে লাগলো তাঁর। তাই কখনো কোনো কাজ না করেও তাঁর মনে হতো করেছেন। তিনি স. আল্লাহ্ সকাশে বিশেষভাবে দোয়া প্রার্থনা করলেন। তারপর বললেন, আল্লাহ্র নিকট থেকে যা জানার দরকার ছিলো, তা আমি জেনে নিয়েছি। আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রসুল! খুলে বলুন তো বিষয়টা কী? বললেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম, দুজন লোক এলো। একজন দাঁড়ালো আমার মাথার দিকে, আর একজন পায়ের দিকে। একজন বললো, ইনি কষ্ট পাচ্ছেন কেনো? অন্যজন বললো, ইনি যাদুগ্রস্ত। প্রথমজন বললো, কে যাদু করেছে? দ্বিতীয়জন বললো, ইহুদী লবীদ ইবনে আসাম। প্রথম জন কিসের উপর। দ্বিতীয়জন চিরুনী, চিরুনীতে লেগে থাকা চুল এবং পুরুষ খেজুর বৃক্ষের পুষ্পগুচ্ছের উপর। প্রথমজন ওগুলো কোথায় রাখা হয়েছে? দ্বিতীয়জন বনী যুরাইকের কূপ যরওয়ানের মধ্যে। জননী বললেন, স্বপ্ন দেখার পর রসুল স. ওই কূপের পাশে উপস্থিত হলেন। ফিরে এসে বললেন, আল্লাহ্র শপথ! কূপটির পানি তো মেহেদীর মতো লাল। আর সেখানকার খেজুর গাছগুলো দেখতে ভূতের মতো। আমি বললাম, হে আল্লাহ্র প্রিয়তম জন! আপনি ওই লোকটিকে প্রকাশ্যে অপরাধী বলে চিহ্নিত করছেন না কেনো? তিনি স. বললেন, আল্লাহ্ তো আমাকে সুস্থ করে দিয়েছেন। তাছাড়া জনগণের মধ্যে একটা বিশৃখলার সৃষ্টি হোক, তা আমি চাই না। বাগবী লিখেছেন, এক বর্ণনায় এসেছে, যাদুর পুঁটলিটি ছিলো কূপের তলদেশে একটি পাথরের নিচে চাপা দেওয়া অবস্থায়। লোকেরা তা তুলে আনলো। দেখা গেলো ওটার মধ্যে রয়েছে রসুল স. এর মাথার চুল ও চিরুনীর দাঁত।
হজরত ইয়াজিদ ইবনে আরকাম থেকে স্বসূত্রে বাগবী বর্ণনা করেছেন, এক ইহুদী রসুল স.কে যাদু করেছিলো। ফলে তিনি স. খুব ক্লেশ ভোগ করছিলেন। এমতাবস্থায় হজরত জিবরাইল এসে তাঁকে জানালেন, এক ইহুদী আপনার উপর
তাফসীরে মাযহারী/৬৪৪
যাদু করেছে। তিনি স. হজরত আলীকে পাঠিয়ে যাদুর সরঞ্জামগুলো উদ্ধার করে আনলেন। গ্রন্থিযুক্ত একটি সূতাতেই ছিলো যাদুর মূল মন্ত্র। একটা একটা করে গ্রন্থি খোলা হতে লাগলো। তিনিও একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠতে লাগলেন। এভাবে সকল গ্রন্থি খোলা হলে তিনি লাভ করলেন পূর্ণ নিরাময়। মনে হলো তিনি যেনো বন্ধনমুক্ত হলেন। বিষয়টি তিনি স. ওই ইহুদীকে জানতেই দিলেন না।
জননী আয়েশা থেকে বায়হাকীর দালায়েল গ্রন্থে এবং ইবনে মারদুবিয়ার বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, এক ইহুদী রসুল স. এর উপর যাদু করেছিলো। একটি তন্তুতে এগারোটি গিরা দিয়ে সে ওই তন্তুটিকে পাথরচাপা দিয়ে রেখেছিলো একটি কুয়ার তলায়। ফলে তিনি স. অপ্রকৃতিস্থিত হয়ে পড়লেন। কষ্ট পেতে লাগলেন খুব। এমন সময় নাজিল হলো সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস। হজরত জিবরাইল এসে যাদুর স্থানের সন্ধান দিলেন। রসুল স. হজরত আলীর দ্বারা তন্তুটি উদ্ধার বর্ণনায় এসেছে, তিনি স. যাদুরোগে কষ্ট পেয়েছিলেন দীর্ঘ ছয়টি মাস। তার মধ্যে তিন রাতের কষ্ট ছিলো অসহনীয়। ওই সময়েই অবতীর্ণ হয় ফালাক্ব ও নাস।
মুসলিম লিখেছেন, হজরত আবু সাঈদ খুদরী বলেছেন, হজরত জিবরাইল তখন উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কি খুব কষ্ট হচ্ছে? তিনি স. বললেন, হ্যাঁ। হজরত জিবরাইল বললেন, পাঠ করুন বিসমিল্লাহি আরক্বীকা মিন কুললি শাই ইয়ুজীকা মিন শাররি কুললি নাফস্ আও আইনিন হাসিদ আল্লাহু ইয়াশফীকা বিসমিল্লহি আরক্বীক।
আবু সালেহ সূত্রে কালাবী বর্ণনা করেছেন, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, একবার রসুল স. কঠিন অসুখে পড়লেন। এক রাতে স্বপ্নে দেখলেন, দুজন ফেরেশতা এলো। একজন বসলো তাঁর শিয়রে, আর একজন পায়ের কাছে। দুজনের মধ্যে কথোপকথন শুরু হলো এভাবে এঁর কী হয়েছে? ইনি তো অসুস্থ। কী অসুখ? যাদুগ্রস্ততা। কে যাদু করেছে? ইহুদী লবীদ ইবনে আসাম। কীভাবে? চামড়ার ফিতায় যাদুমন্ত্র করে পাথর চাপা দিয়ে রেখে দেওয়া হয়েছে অমুক কূপের ভিতরে। যাও, সেটিকে বের করে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দাও। রসুল স. এর তন্দ্রা ভেঙে গেলো। ভোর হলো। রসুল স. হজরত আম্মার ইবনে ইয়াসার ও তাঁর কয়েকজন সঙ্গীকে কথিত কূপে পাথরচাপা দিয়ে রাখা যাদুকৃত ফিতাটি উদ্ধার করে আনতে বললেন। তাঁরা অল্পক্ষণের মধ্যেই নির্দেশ প্রতিপালন করলেন। যাদুর ফিতাটি এনে দেখা গেলো, তার মধ্যে পেঁচানো রয়েছে একটি সূতা। সূতাটিতে রয়েছে এগারোটি গিঁট। এই ঘটনাটির প্রেক্ষিতেই অবতীর্ণ হয় সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস। এই দুই সুরায় আয়াত রয়েছে মোট এগারোটি। তিনি স. একটি করে আয়াত পড়তে লাগলেন। সঙ্গে সঙ্গে খুলে যেতে লাগলো একটি করে গিঁট। বায়হাকী তাঁর দালায়েলুন নবুওয়াত গ্রন্থে এরকমই বিবরণ দিয়েছেন।
তাফসীরে মাযহারী/৬৪৩
আবু নাঈম তাঁর দালায়েল গ্রন্থে আবু জাফর রাজী সূত্রে লিখেছেন, হজরত আনাস বলেছেন, একবার ইহুদীরা রসুল স. এর উপরে কিছু একটা করলো। তিনি স. পীড়িত হয়ে পড়লেন। শয্যাশায়ী রসুলের নিকটে অস্থির হয়ে যাতায়াত করতে লাগলেন সাহাবীগণ। এমন সময় একদিন হজরত জিবরাইল আর্বিভূত হলেন সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস নিয়ে। রসুল স. সুরা দুটি দিয়ে তাবীজ বানালেন। সঙ্গে সঙ্গে দূর হয়ে গেলো তাঁর পীড়া।
বাগবী লিখেছেন, মাতা মহোদয়া আয়েশা এবং হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, রসুল স. এর ছিলো এক ইহুদী অনুচর। ইহুদীরা তাকে হাত করলো। তার মাধ্যমে তারা সংগ্রহ করতে সক্ষম হলো রসুল স. এর মস্তকের কেশ এবং তাঁর চিরুনীর কয়েকটি দাঁত। ওগুলোর সাহায্যে তারা রসুল স. এর উপরে যাদু করে বসলো। এ অপকর্মের মূল হোতা ছিলো লবীদ ইবনে আসাম। এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করেই অবতীর্ণ হয় সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস।
স্বসূত্রে বাগবী লিখেছেন, জননী আয়েশা সিদ্দিকা বলেছেন, রসুল স. একবার রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। রোগের প্রকোপে কখনো কখনো স্মৃতিভ্রমও ঘটতে লাগলো তাঁর। তাই কখনো কোনো কাজ না করেও তাঁর মনে হতো করেছেন। তিনি স. আল্লাহ্ সকাশে বিশেষভাবে দোয়া প্রার্থনা করলেন। তারপর বললেন, আল্লাহ্র নিকট থেকে যা জানার দরকার ছিলো, তা আমি জেনে নিয়েছি। আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রসুল! খুলে বলুন তো বিষয়টা কী? বললেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম, দুজন লোক এলো। একজন দাঁড়ালো আমার মাথার দিকে, আর একজন পায়ের দিকে। একজন বললো, ইনি কষ্ট পাচ্ছেন কেনো? অন্যজন বললো, ইনি যাদুগ্রস্ত। প্রথমজন বললো, কে যাদু করেছে? দ্বিতীয়জন বললো, ইহুদী লবীদ ইবনে আসাম। প্রথম জন কিসের উপর। দ্বিতীয়জন চিরুনী, চিরুনীতে লেগে থাকা চুল এবং পুরুষ খেজুর বৃক্ষের পুষ্পগুচ্ছের উপর। প্রথমজন ওগুলো কোথায় রাখা হয়েছে? দ্বিতীয়জন বনী যুরাইকের কূপ যরওয়ানের মধ্যে। জননী বললেন, স্বপ্ন দেখার পর রসুল স. ওই কূপের পাশে উপস্থিত হলেন। ফিরে এসে বললেন, আল্লাহ্র শপথ! কূপটির পানি তো মেহেদীর মতো লাল। আর সেখানকার খেজুর গাছগুলো দেখতে ভূতের মতো। আমি বললাম, হে আল্লাহ্র প্রিয়তম জন! আপনি ওই লোকটিকে প্রকাশ্যে অপরাধী বলে চিহ্নিত করছেন না কেনো? তিনি স. বললেন, আল্লাহ্ তো আমাকে সুস্থ করে দিয়েছেন। তাছাড়া জনগণের মধ্যে একটা বিশৃখলার সৃষ্টি হোক, তা আমি চাই না। বাগবী লিখেছেন, এক বর্ণনায় এসেছে, যাদুর পুঁটলিটি ছিলো কূপের তলদেশে একটি পাথরের নিচে চাপা দেওয়া অবস্থায়। লোকেরা তা তুলে আনলো। দেখা গেলো ওটার মধ্যে রয়েছে রসুল স. এর মাথার চুল ও চিরুনীর দাঁত।
হজরত ইয়াজিদ ইবনে আরকাম থেকে স্বসূত্রে বাগবী বর্ণনা করেছেন, এক ইহুদী রসুল স.কে যাদু করেছিলো। ফলে তিনি স. খুব ক্লেশ ভোগ করছিলেন। এমতাবস্থায় হজরত জিবরাইল এসে তাঁকে জানালেন, এক ইহুদী আপনার উপর
তাফসীরে মাযহারী/৬৪৪
যাদু করেছে। তিনি স. হজরত আলীকে পাঠিয়ে যাদুর সরঞ্জামগুলো উদ্ধার করে আনলেন। গ্রন্থিযুক্ত একটি সূতাতেই ছিলো যাদুর মূল মন্ত্র। একটা একটা করে গ্রন্থি খোলা হতে লাগলো। তিনিও একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠতে লাগলেন। এভাবে সকল গ্রন্থি খোলা হলে তিনি লাভ করলেন পূর্ণ নিরাময়। মনে হলো তিনি যেনো বন্ধনমুক্ত হলেন। বিষয়টি তিনি স. ওই ইহুদীকে জানতেই দিলেন না।
জননী আয়েশা থেকে বায়হাকীর দালায়েল গ্রন্থে এবং ইবনে মারদুবিয়ার বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, এক ইহুদী রসুল স. এর উপর যাদু করেছিলো। একটি তন্তুতে এগারোটি গিরা দিয়ে সে ওই তন্তুটিকে পাথরচাপা দিয়ে রেখেছিলো একটি কুয়ার তলায়। ফলে তিনি স. অপ্রকৃতিস্থিত হয়ে পড়লেন। কষ্ট পেতে লাগলেন খুব। এমন সময় নাজিল হলো সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস। হজরত জিবরাইল এসে যাদুর স্থানের সন্ধান দিলেন। রসুল স. হজরত আলীর দ্বারা তন্তুটি উদ্ধার বর্ণনায় এসেছে, তিনি স. যাদুরোগে কষ্ট পেয়েছিলেন দীর্ঘ ছয়টি মাস। তার মধ্যে তিন রাতের কষ্ট ছিলো অসহনীয়। ওই সময়েই অবতীর্ণ হয় ফালাক্ব ও নাস।
মুসলিম লিখেছেন, হজরত আবু সাঈদ খুদরী বলেছেন, হজরত জিবরাইল তখন উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কি খুব কষ্ট হচ্ছে? তিনি স. বললেন, হ্যাঁ। হজরত জিবরাইল বললেন, পাঠ করুন বিসমিল্লাহি আরক্বীকা মিন কুললি শাই ইয়ুজীকা মিন শাররি কুললি নাফস্ আও আইনিন হাসিদ আল্লাহু ইয়াশফীকা বিসমিল্লহি আরক্বীক।
Sunday, 10 August 2008
কোরআনের মাহাত্ম্য
কোরআনের মাহাত্ম্য
হজরত ওসমান ইবনে আফফান বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে-ই, যে নিজে কোরআন শিক্ষা করে এবং অপরকে তা শিক্ষা দেয়। বোখারী, মুসলিম। বায়হাকী তাঁর ‘আল আসমা’ গ্রন্থে অতিরিক্তরূপে সংযোজন করেছেন এই সকল গ্রন্থের উপরে কোরআনের মর্যাদা ওইরূপ, যে রূপ মর্যাদা স্রষ্টার, তার সৃষ্টির উপর।
হজরত ইবনে ওমর বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, দুই ধরনের লোকের প্রতি ঈর্ষা করা বৈধ। তার মধ্যে এক ধরনের লোক আল্লাহ্ যাকে দান করেছেন কোরআন। আর সে দিবারাত্রি জড়িত থাকে কোরআনের সঙ্গে। অপর ব্যক্তি সে, যাকে আল্লাহ্ দান করেছেন অঢেল সম্পদ, আর সে তার সম্পদ অকাতরে ব্যয় করতে থাকে আল্লাহ্র পথে। বোখারী, মুসলিম।
তাফসীরে মাযহারী/৬৫৩
হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, প্রতিফল দিবসে তিনটি বস্তু আরশের নিচে স্থান পাবে ১. কোরআন, যার রয়েছে দু’টি দিক, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ২. আমানত ৩. স্বজনবন্ধন। স্বজনবন্ধন তখন চীৎকার করে বলতে থাকবে, শোনো, যে আমাকে জড়িয়ে রেখেছিলো, আজ আল্লাহ্ও তাকে তাঁর স্বজন বলে গণ্য করবেন। আর যে আমাকে ছিন্ন করেছিলো, আজ আল্লাহও তাঁর সামীপ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবেন তাকে।
হজরত ইবনে ওমর বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, মহাবিচারের দিবসে কোরআনের বাহককে বলা হবে, পাঠ করো এবং উন্নতমান হও। আবৃত্তি করো মধুর স্বরে, যেমন মধুর কণ্ঠে আবৃত্তি করতে পৃথিবীতে। সেখানে যেখানে শেষ করেছিলে, সে স্থানই তোমার মাকাম। আহমদ, তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসাঈ। হজরত আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত হয়েছে, রসুল স. জ্বিন ও মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, আল্লাহ্ বলেন, যাকে তার কোরআন তেলাওয়াত আমার জিকির থেকে বিরত রাখে, তাকে আমি দান করব প্রার্থনাকারী অপেক্ষা অধিক। সকল বাণীর উপরে আল্লাহ্র বাণীর মর্যাদা ওই রূপ, যেরূপ মর্যাদা স্রষ্টার, তাঁর সৃষ্টির উপর।
হজরত ইবনে মাসউদ কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, রসুল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি কোরআনের একটি অক্ষর পাঠ করে, সে লাভ করে দশটি পুণ্য। আর একটি পুণ্যকে করা হবে দশগুণ। আমি এরকম বলিনা যে, আলিফ-লাম-মীম একটি অক্ষর। বরং আলিফ একটি অক্ষর। তেমনি পৃথক পৃথক অক্ষর লাম ও মীম। তিরমিজি, দারেমী। তিরমিজি বলেছেন, হাদিসটি উত্তম সূত্রপরমরাগত, বিশুদ্ধ ও বিরল শ্রেণীর। হারেছ ইবনে আওয়ার বর্ণনা করেছেন, আমি একবার এক মসজিদের পাশ দিয়ে যেতে যেতে শুনলাম, মসজিদের ভিতরে কিছু লোক হাদিস সম্পর্কে তর্ক-বিতর্ক করছে। আমি খলিফা হজরত আলীর নিকটে উপস্থিত হয়ে ঘটনাটি জানালাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সত্যিই কি তারা এরকম করছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, শোনো, রসুল স. একবার বললেন, সাবধান! অচিরেই ফেৎনার উদ্ভব ঘটবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহ্র প্রিয়তম রসুল! তাহলে আমাদের উপায় কী হবে? তিনি স. বললেন, আল্লাহ্র বাণী পাক কোরআন, যাতে রয়েছে অতীতের ইতিবৃত্ত, ভবিষ্যতের দিক নির্দেশনা। তোমাদের জীবনযাপনের সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে কোরআনে। এ নিয়ে কেউ যেনো কৌতুক না করে। কোনো অত্যাচারীর কারণে যদি কেউ একে পরিত্যাগ করে, তবে আল্লাহ্ ওই অত্যাচারীকে ধ্বংস করে দিবেন। কোরআনকে ছেড়ে কেউ যদি অন্য উপায়ে পথপ্রাপ্তির অভিলাষী হয়, তবে আল্লাহ্ তাকে বিভ্রান্ত করে দিবেন। এটাই আল্লাহ্পাকের সুদৃঢ় রজ্জু। এর মধ্যেই রয়েছে শুভউপদেশমূলক মহাজ্ঞান। এটা এমন মহান গ্রন্থ, যাকে মান্য করে চললে প্রবৃত্তি কখনো বক্র-পথাভিমুখী হবে না। বচনে থাকবে না কোনো দোদুল্যমানতা। জ্ঞানান্বেষীগণ এ গ্রন্থ বার বার পড়েও পরিতৃপ্ত হবে না। পুনঃ পুনঃ পাঠ করলেও
তাফসীরে মাযহারী/৬৫৪
এর আবেদন কখনো ক্ষুণ্ন হবে না। এর বিস্ময় অনিঃশেষ। এটা ওই গ্রন্থ, যার সংস্পর্শে জ্বিন জাতির ঔদাসীন্য দূরীভূত হয়েছিলো। তারা বলেছিলো, আমরা এমন বিস্ময়কর বাণী শ্রবণ করেছি, যা প্রদর্শন করে সরল পথ। আমরা এর উপরে ইমান এনেছি। এই কোরআনের অনুসরণে যে কথা বলবে, সে সত্য বলবে। যে এর বিধানাবলীর উপরে সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করবে, সে উত্তম বিনিময় লাভ করবে। যে এর আলোকে মীমাংসা করবে, সে সুবিচার করবে। এর প্রতি যে আমন্ত্রণ জানাবে, সে পেয়ে যাবে সরল পথ। তিরমিজি, দারেমী।
হজরত মুয়াজ জুহুনী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি কোরআন পাঠ করে, কার্যকর করে কোরআনের নির্দেশাবলী, মহাবিচারের দিবসে আল্লাহ্ তার পিতামাতার মাথায় পরিয়ে দিবেন এমন মুকুট, যা হার মানাবে দিবাকরের প্রখরতাকেও, যে দিবাকরকে তোমরা প্রত্যক্ষ করো তোমাদের আপন আপন আবাস থেকে। এখন অনুমান করো ওই ব্যক্তিটির মর্যাদা হবে কী রকম? আহমদ, আবু দাউদ।
হজরত উকবা ইবনে আমের বর্ণনা করেছেন, আমি স্বকর্ণে শুনেছি, রসুল স. বলেছেন, কোরআন পাক চামড়ার উপরে রেখে ওই চামড়া আগুনের উপরে রাখলে কোরআনপাক আগুনে পুড়বে না। দারেমী। হজরত আলী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি কোরআন মজীদ পাঠ করে এবং একে বানিয়ে নেয় তার পশ্চাতের ঢাল, এতে বর্ণিত হালালকে মেনে নেয় হালাল হিসাবে এবং হারামকে মনে করে হারাম, আল্লাহ্ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর তার পরিবারের এমন দশজনের জন্য তাকে শাফায়াত করবার অনুমতি দিবেন, যাদের জন্য অপরিহার্য হয়েছিলো জাহান্নাম। তিরমিজি, আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজা, দারেমী।
জননী আয়েশা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, নামাজের বাইরে কোরআন তেলাওয়াত করা অপেক্ষা, নামাজের অভ্যন্তরে কোরআন তেলাওয়াত উত্তম। আবার নামাজের বাইরে তেলাওয়াত করা তসবীহ, তকবীর অপেক্ষা উত্তম। আর রোজা দোজখ থেকে রক্ষা পাওয়ার ঢাল। হজরত আউস সাকাফী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, না দেখে কোরআন পাঠ করার মর্যাদা এক হাজার। আর দেখে পাঠ করার মর্যাদা তার দ্বিগুণ। হজরত ইবনে ওমর বর্ণনা করেছেন, রসুল স. একবার বললেন, কোনো কোনো হৃদয়ে মরিচা পড়ে যায়, যেমন লোহাতে মরিচা পড়ে পানির পরশে। নিবেদন করা হলো, হে আল্লাহ্র রসুল! সে মরিচা পরিষ্কার করার উপায় কী? তিনি স. বললেন, মৃত্যুর স্মরণ এবং কোরআন পাঠ। উপরোল্লিখিত হাদিসত্রয় বায়হাকী সংকলন করেছেন তাঁর শো’বুল ইমানে। হজরত আবু হোরায়রা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, আল্লাহ্ এতো অধিক একাগ্রতার সঙ্গে তাঁর নবীর কোরআন তেলাওয়াত শোনেন যে, সেরকম করে অন্য কিছুই শোনেন না। মুসলিম। হজরত আবু হোরায়রার অপর বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ্ উৎকর্ণ হয়ে কারো সুললিত স্বরের কোরআন তেলাওয়াত শোনেন না, যেমন উৎকর্ণ হয়ে শোনেন তাঁর নবীর সুললিত স্বরবিশিষ্ট সশব্দ তেলাওয়াত। তিনি আরো বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, ওই ব্যক্তি আমাদের দলভূত নয়, যে সুললিত কণ্ঠে কোরআন আবৃত্তি করে না।
তাফসীরে মাযহারী/৬৫৫
হজরত জাবের বর্ণনা করেছেন, একবার আমরা কোরআন পাঠ করছিলাম। আমাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলো একজন অনারব গেঁয়ো লোক। এমন সময় রসুল স. সেখানে উপস্থিত হলেন। বললেন, পাঠ করো। তোমাদের প্রত্যেকের পাঠ উত্তম। অচিরেই এমন লোকের আগমন ঘটবে, যারা কোরআনের পাঠপদ্ধতি সোজা করে ফেলবে, যেমন সোজা করা হয় তীর। অর্থাৎ তারা পাঠ করবে অতিদ্রুত। আর এমতো পাঠের বিনিময় তারা এ জগতেই নিয়ে নিবে। পরজগতের পুণ্যলাভের আকাংখাও তাদের থাকবে না। আবু দাউদ, বায়হাকী।
হজরত হুজায়ফা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, কোরআন আবৃত্তি কোরো আরবী পাঠরীতি ও আরবী স্বরে। গায়কদের রাগ-রাগিনী এবং গ্রন্থধারীদের পাঠপদ্ধতি পরিহার কোরো। আগামীতে এমন কিছুসংখ্যক লোকের প্রাদুর্ভাব ঘটবে, যারা কোরআন আবৃত্তি করবে গায়কী ঢঙে, রাগ-রাগিনী সহযোগে। তাদের তেলাওয়াতের প্রভাব তাদের কণ্ঠনালীর নিচে পৌঁছবে না। তাদের হৃদয় হবে ফেৎনাভরা। তারাও ফেৎনায় পতিত হবে, যারা তাদেরকে ভালোবাসবে। বায়হাকী, ইবনে রযীন। হজরত উবায়দা মুলাইকি বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, ওহে কোরআনের অধিকারী! কোরআন মজীদকে উপাধান বানিয়ো না। দিনে রাতে তেলাওয়াত কোরো। তেলাওয়াতের হক আদায় কোরো। পাঠ কোরো সুললিত কণ্ঠে, বিশুদ্ধ উচ্চারণে। এর প্রচার-প্রসারে সচেষ্ট হয়ো এবং এর বিষয়ে গবেষণাও কোরো, যেনো অর্জন করতে পারো সফলতা। পার্থিব বিনিময়প্রাপ্তির প্রত্যাশায় তাড়াহুড়া করে পাঠ কোরো না। এর প্রকৃত বিনিময় তো লাভ হবে পরকালে। বায়হাকী হাদিসটি উল্লেখ করেছেন তাঁর শো’বুল ইমান গ্রন্থে।
হজরত আলী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, কোরআন পাক হচ্ছেউত্তম প্রতিষেধক। ইবনে মাজা। হজরত ইবনে মাসউদ বর্ণনা করছেন, রসুল স. বলেছেন, মধু ও কোরআন সকল ব্যাধির উপশমক। ওয়াইলা ইবনে আসকা বর্ণনা করেছেন, এক লোক রসুল স. এর সুমহান সান্নিধ্যে উপস্থিত হয়ে তার কণ্ঠনালীর ব্যথার কথা জানালো। তিনি স. বললেন, কোরআন পাঠ করতে থাকো। বায়হাকী। হজরত আবু সাঈদ খুদরী বর্ণনা করেছেন, এক লোক রসুল স. এর সুমহান সংসর্গে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলো, আমার বুকে খুব ব্যাথা। তিনি স. বললেন, কোরআন পাঠ করতে থাকো। আল্লাহ্ তো স্বয়ং বলেছেন ‘শিফাউল লিমা ফীস্ সুদুর’ (বক্ষে যা আছে তার নিরাময়ক)।
হজরত তালহা ইবনে মাতরাফের বর্ণনায় এসেছে, যখন কোনো রোগগ্রস্ত ব্যক্তির পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করা হয়, তখন দেখা যায় তার রোগের প্রকোপ কমে আসছে। রসুল স. এর যুগেও এরকম বলা হতো। আবু উবায়দা। আল্লাহ্ই প্রকৃত পরিজ্ঞাতা।
আলহামদু লিল্লাহি রববিল আ’লামীন ওয়া সল্লাল্লহু তায়ালা আ’লা খইরি খলক্বিহী মুহাম্মাদ ওয়া আলিহী ওয়া আসহাবিহী আজ্বমাঈন। আমিন।
সমাপ্ত
তাফসীরে মাযহারী/৬৫৬
হজরত ওসমান ইবনে আফফান বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে-ই, যে নিজে কোরআন শিক্ষা করে এবং অপরকে তা শিক্ষা দেয়। বোখারী, মুসলিম। বায়হাকী তাঁর ‘আল আসমা’ গ্রন্থে অতিরিক্তরূপে সংযোজন করেছেন এই সকল গ্রন্থের উপরে কোরআনের মর্যাদা ওইরূপ, যে রূপ মর্যাদা স্রষ্টার, তার সৃষ্টির উপর।
হজরত ইবনে ওমর বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, দুই ধরনের লোকের প্রতি ঈর্ষা করা বৈধ। তার মধ্যে এক ধরনের লোক আল্লাহ্ যাকে দান করেছেন কোরআন। আর সে দিবারাত্রি জড়িত থাকে কোরআনের সঙ্গে। অপর ব্যক্তি সে, যাকে আল্লাহ্ দান করেছেন অঢেল সম্পদ, আর সে তার সম্পদ অকাতরে ব্যয় করতে থাকে আল্লাহ্র পথে। বোখারী, মুসলিম।
তাফসীরে মাযহারী/৬৫৩
হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, প্রতিফল দিবসে তিনটি বস্তু আরশের নিচে স্থান পাবে ১. কোরআন, যার রয়েছে দু’টি দিক, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ২. আমানত ৩. স্বজনবন্ধন। স্বজনবন্ধন তখন চীৎকার করে বলতে থাকবে, শোনো, যে আমাকে জড়িয়ে রেখেছিলো, আজ আল্লাহ্ও তাকে তাঁর স্বজন বলে গণ্য করবেন। আর যে আমাকে ছিন্ন করেছিলো, আজ আল্লাহও তাঁর সামীপ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবেন তাকে।
হজরত ইবনে ওমর বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, মহাবিচারের দিবসে কোরআনের বাহককে বলা হবে, পাঠ করো এবং উন্নতমান হও। আবৃত্তি করো মধুর স্বরে, যেমন মধুর কণ্ঠে আবৃত্তি করতে পৃথিবীতে। সেখানে যেখানে শেষ করেছিলে, সে স্থানই তোমার মাকাম। আহমদ, তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসাঈ। হজরত আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত হয়েছে, রসুল স. জ্বিন ও মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, আল্লাহ্ বলেন, যাকে তার কোরআন তেলাওয়াত আমার জিকির থেকে বিরত রাখে, তাকে আমি দান করব প্রার্থনাকারী অপেক্ষা অধিক। সকল বাণীর উপরে আল্লাহ্র বাণীর মর্যাদা ওই রূপ, যেরূপ মর্যাদা স্রষ্টার, তাঁর সৃষ্টির উপর।
হজরত ইবনে মাসউদ কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, রসুল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি কোরআনের একটি অক্ষর পাঠ করে, সে লাভ করে দশটি পুণ্য। আর একটি পুণ্যকে করা হবে দশগুণ। আমি এরকম বলিনা যে, আলিফ-লাম-মীম একটি অক্ষর। বরং আলিফ একটি অক্ষর। তেমনি পৃথক পৃথক অক্ষর লাম ও মীম। তিরমিজি, দারেমী। তিরমিজি বলেছেন, হাদিসটি উত্তম সূত্রপরমরাগত, বিশুদ্ধ ও বিরল শ্রেণীর। হারেছ ইবনে আওয়ার বর্ণনা করেছেন, আমি একবার এক মসজিদের পাশ দিয়ে যেতে যেতে শুনলাম, মসজিদের ভিতরে কিছু লোক হাদিস সম্পর্কে তর্ক-বিতর্ক করছে। আমি খলিফা হজরত আলীর নিকটে উপস্থিত হয়ে ঘটনাটি জানালাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সত্যিই কি তারা এরকম করছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, শোনো, রসুল স. একবার বললেন, সাবধান! অচিরেই ফেৎনার উদ্ভব ঘটবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহ্র প্রিয়তম রসুল! তাহলে আমাদের উপায় কী হবে? তিনি স. বললেন, আল্লাহ্র বাণী পাক কোরআন, যাতে রয়েছে অতীতের ইতিবৃত্ত, ভবিষ্যতের দিক নির্দেশনা। তোমাদের জীবনযাপনের সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে কোরআনে। এ নিয়ে কেউ যেনো কৌতুক না করে। কোনো অত্যাচারীর কারণে যদি কেউ একে পরিত্যাগ করে, তবে আল্লাহ্ ওই অত্যাচারীকে ধ্বংস করে দিবেন। কোরআনকে ছেড়ে কেউ যদি অন্য উপায়ে পথপ্রাপ্তির অভিলাষী হয়, তবে আল্লাহ্ তাকে বিভ্রান্ত করে দিবেন। এটাই আল্লাহ্পাকের সুদৃঢ় রজ্জু। এর মধ্যেই রয়েছে শুভউপদেশমূলক মহাজ্ঞান। এটা এমন মহান গ্রন্থ, যাকে মান্য করে চললে প্রবৃত্তি কখনো বক্র-পথাভিমুখী হবে না। বচনে থাকবে না কোনো দোদুল্যমানতা। জ্ঞানান্বেষীগণ এ গ্রন্থ বার বার পড়েও পরিতৃপ্ত হবে না। পুনঃ পুনঃ পাঠ করলেও
তাফসীরে মাযহারী/৬৫৪
এর আবেদন কখনো ক্ষুণ্ন হবে না। এর বিস্ময় অনিঃশেষ। এটা ওই গ্রন্থ, যার সংস্পর্শে জ্বিন জাতির ঔদাসীন্য দূরীভূত হয়েছিলো। তারা বলেছিলো, আমরা এমন বিস্ময়কর বাণী শ্রবণ করেছি, যা প্রদর্শন করে সরল পথ। আমরা এর উপরে ইমান এনেছি। এই কোরআনের অনুসরণে যে কথা বলবে, সে সত্য বলবে। যে এর বিধানাবলীর উপরে সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করবে, সে উত্তম বিনিময় লাভ করবে। যে এর আলোকে মীমাংসা করবে, সে সুবিচার করবে। এর প্রতি যে আমন্ত্রণ জানাবে, সে পেয়ে যাবে সরল পথ। তিরমিজি, দারেমী।
হজরত মুয়াজ জুহুনী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি কোরআন পাঠ করে, কার্যকর করে কোরআনের নির্দেশাবলী, মহাবিচারের দিবসে আল্লাহ্ তার পিতামাতার মাথায় পরিয়ে দিবেন এমন মুকুট, যা হার মানাবে দিবাকরের প্রখরতাকেও, যে দিবাকরকে তোমরা প্রত্যক্ষ করো তোমাদের আপন আপন আবাস থেকে। এখন অনুমান করো ওই ব্যক্তিটির মর্যাদা হবে কী রকম? আহমদ, আবু দাউদ।
হজরত উকবা ইবনে আমের বর্ণনা করেছেন, আমি স্বকর্ণে শুনেছি, রসুল স. বলেছেন, কোরআন পাক চামড়ার উপরে রেখে ওই চামড়া আগুনের উপরে রাখলে কোরআনপাক আগুনে পুড়বে না। দারেমী। হজরত আলী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি কোরআন মজীদ পাঠ করে এবং একে বানিয়ে নেয় তার পশ্চাতের ঢাল, এতে বর্ণিত হালালকে মেনে নেয় হালাল হিসাবে এবং হারামকে মনে করে হারাম, আল্লাহ্ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর তার পরিবারের এমন দশজনের জন্য তাকে শাফায়াত করবার অনুমতি দিবেন, যাদের জন্য অপরিহার্য হয়েছিলো জাহান্নাম। তিরমিজি, আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজা, দারেমী।
জননী আয়েশা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, নামাজের বাইরে কোরআন তেলাওয়াত করা অপেক্ষা, নামাজের অভ্যন্তরে কোরআন তেলাওয়াত উত্তম। আবার নামাজের বাইরে তেলাওয়াত করা তসবীহ, তকবীর অপেক্ষা উত্তম। আর রোজা দোজখ থেকে রক্ষা পাওয়ার ঢাল। হজরত আউস সাকাফী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, না দেখে কোরআন পাঠ করার মর্যাদা এক হাজার। আর দেখে পাঠ করার মর্যাদা তার দ্বিগুণ। হজরত ইবনে ওমর বর্ণনা করেছেন, রসুল স. একবার বললেন, কোনো কোনো হৃদয়ে মরিচা পড়ে যায়, যেমন লোহাতে মরিচা পড়ে পানির পরশে। নিবেদন করা হলো, হে আল্লাহ্র রসুল! সে মরিচা পরিষ্কার করার উপায় কী? তিনি স. বললেন, মৃত্যুর স্মরণ এবং কোরআন পাঠ। উপরোল্লিখিত হাদিসত্রয় বায়হাকী সংকলন করেছেন তাঁর শো’বুল ইমানে। হজরত আবু হোরায়রা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, আল্লাহ্ এতো অধিক একাগ্রতার সঙ্গে তাঁর নবীর কোরআন তেলাওয়াত শোনেন যে, সেরকম করে অন্য কিছুই শোনেন না। মুসলিম। হজরত আবু হোরায়রার অপর বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ্ উৎকর্ণ হয়ে কারো সুললিত স্বরের কোরআন তেলাওয়াত শোনেন না, যেমন উৎকর্ণ হয়ে শোনেন তাঁর নবীর সুললিত স্বরবিশিষ্ট সশব্দ তেলাওয়াত। তিনি আরো বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, ওই ব্যক্তি আমাদের দলভূত নয়, যে সুললিত কণ্ঠে কোরআন আবৃত্তি করে না।
তাফসীরে মাযহারী/৬৫৫
হজরত জাবের বর্ণনা করেছেন, একবার আমরা কোরআন পাঠ করছিলাম। আমাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলো একজন অনারব গেঁয়ো লোক। এমন সময় রসুল স. সেখানে উপস্থিত হলেন। বললেন, পাঠ করো। তোমাদের প্রত্যেকের পাঠ উত্তম। অচিরেই এমন লোকের আগমন ঘটবে, যারা কোরআনের পাঠপদ্ধতি সোজা করে ফেলবে, যেমন সোজা করা হয় তীর। অর্থাৎ তারা পাঠ করবে অতিদ্রুত। আর এমতো পাঠের বিনিময় তারা এ জগতেই নিয়ে নিবে। পরজগতের পুণ্যলাভের আকাংখাও তাদের থাকবে না। আবু দাউদ, বায়হাকী।
হজরত হুজায়ফা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, কোরআন আবৃত্তি কোরো আরবী পাঠরীতি ও আরবী স্বরে। গায়কদের রাগ-রাগিনী এবং গ্রন্থধারীদের পাঠপদ্ধতি পরিহার কোরো। আগামীতে এমন কিছুসংখ্যক লোকের প্রাদুর্ভাব ঘটবে, যারা কোরআন আবৃত্তি করবে গায়কী ঢঙে, রাগ-রাগিনী সহযোগে। তাদের তেলাওয়াতের প্রভাব তাদের কণ্ঠনালীর নিচে পৌঁছবে না। তাদের হৃদয় হবে ফেৎনাভরা। তারাও ফেৎনায় পতিত হবে, যারা তাদেরকে ভালোবাসবে। বায়হাকী, ইবনে রযীন। হজরত উবায়দা মুলাইকি বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, ওহে কোরআনের অধিকারী! কোরআন মজীদকে উপাধান বানিয়ো না। দিনে রাতে তেলাওয়াত কোরো। তেলাওয়াতের হক আদায় কোরো। পাঠ কোরো সুললিত কণ্ঠে, বিশুদ্ধ উচ্চারণে। এর প্রচার-প্রসারে সচেষ্ট হয়ো এবং এর বিষয়ে গবেষণাও কোরো, যেনো অর্জন করতে পারো সফলতা। পার্থিব বিনিময়প্রাপ্তির প্রত্যাশায় তাড়াহুড়া করে পাঠ কোরো না। এর প্রকৃত বিনিময় তো লাভ হবে পরকালে। বায়হাকী হাদিসটি উল্লেখ করেছেন তাঁর শো’বুল ইমান গ্রন্থে।
হজরত আলী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, কোরআন পাক হচ্ছেউত্তম প্রতিষেধক। ইবনে মাজা। হজরত ইবনে মাসউদ বর্ণনা করছেন, রসুল স. বলেছেন, মধু ও কোরআন সকল ব্যাধির উপশমক। ওয়াইলা ইবনে আসকা বর্ণনা করেছেন, এক লোক রসুল স. এর সুমহান সান্নিধ্যে উপস্থিত হয়ে তার কণ্ঠনালীর ব্যথার কথা জানালো। তিনি স. বললেন, কোরআন পাঠ করতে থাকো। বায়হাকী। হজরত আবু সাঈদ খুদরী বর্ণনা করেছেন, এক লোক রসুল স. এর সুমহান সংসর্গে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলো, আমার বুকে খুব ব্যাথা। তিনি স. বললেন, কোরআন পাঠ করতে থাকো। আল্লাহ্ তো স্বয়ং বলেছেন ‘শিফাউল লিমা ফীস্ সুদুর’ (বক্ষে যা আছে তার নিরাময়ক)।
হজরত তালহা ইবনে মাতরাফের বর্ণনায় এসেছে, যখন কোনো রোগগ্রস্ত ব্যক্তির পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করা হয়, তখন দেখা যায় তার রোগের প্রকোপ কমে আসছে। রসুল স. এর যুগেও এরকম বলা হতো। আবু উবায়দা। আল্লাহ্ই প্রকৃত পরিজ্ঞাতা।
আলহামদু লিল্লাহি রববিল আ’লামীন ওয়া সল্লাল্লহু তায়ালা আ’লা খইরি খলক্বিহী মুহাম্মাদ ওয়া আলিহী ওয়া আসহাবিহী আজ্বমাঈন। আমিন।
সমাপ্ত
তাফসীরে মাযহারী/৬৫৬
সূরা নাস
এই সুরার অবতরণস্থল ও মহাপুণ্যতীর্থ মদীনা। এর মধ্যে আয়াত রয়েছে ৬টি।
সূরা নাসঃ আয়াত ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬
তাফসীরে মাযহারী/৬৪৮
বল, ‘আমি শরণ লইতেছি মানুষের প্রতিপালকের,
‘মানুষের অধিপতির,
‘মানুষের ইলাহের নিকট
আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার ‘অনিষ্ট হইতে,
‘যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে,
‘জিন্নের মধ্য হইতে এবং মানুষের মধ্য হইতে।’
প্রথমে বলা হয়েছে ‘ক্বুল আঊ’জু বি রব্বিন্ নাস’ (বলো আমি শরণ গ্রহণ করছি মানুষের প্রতিপালকের)। এখানে ‘বলো’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে রসুল স.কে। আর এখানে ‘রববিন্ নাস’ অর্থ মানুষের প্রভুপালক। এভাবে বক্তব্যটি দাঁড়ায়জ্জ হে আমার প্রিয়তম রসুল! আপনি আপনার প্রার্থনায় বলুন, মানুষের যিনি স্রষ্টা, পালয়িতা ও ব্যবস্থাপয়িতা, আমি সেই মহান প্রভুপালনকর্তারই শরণ যাচনা করি।
পরের আয়াতে (২) বলা হয়েছেজ্জ ‘মালিকিন নাস’ (মানুষের অধিপতির)। অর্থাৎ সেই প্রভুপালয়িতার কাছেই আমি শরণ প্রার্থনা করি, যিনি মানুষের অস্তিত্বেরও অধিপতি।
এরপরের আয়াতে (৩) বলা হয়েছেজ্জ ‘ইলাহিন্ নাস্’ (মানুষের ইলাহের নিকট)। বাক্যটি আগের বাক্যদু’টোর বিস্তৃতি বা বিবৃতি। অর্থাৎ শরণ কামনা করি আমি সেই প্রভুপালক ও অধিকর্তার নিকট, যিনি একমাত্র উপাস্যও। কেননা পালয়িতা তো বলা হয় মাতা-পিতাকে, অথবা অন্যান্য অভিভাবককেও। আবার অধিপতি বলা হয় রাজা-বাদশাহকেও। কিন্তু উপাস্য তারা কদাচ নন। আল্লাহ্র প্রতিপালকত্ব ও অধিপতিত্ব যে অন্য কারো মতো নয়, সেকথা প্রমাণার্থেই তাই অবশেষে বলা হয়েছে ‘মানুষের উপাস্যের নিকট’। অর্থাৎ তিনি পালনকর্তা ও অধিপতিই কেবল নন, তিনি উপাস্যও।
এখানকার ‘আন্ নাস্’ (মানুষ) পদটির নির্দিষ্টবাচক ‘আলিফ লাম’ সীমিতার্থক। এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে সীমিত-সংখ্যকদেরকে। অর্থাৎ রসুল স. ও তাঁর সহচরবৃন্দকে। আল্লাহ্পাকের পালকত্ব, আধিপত্য ও উপাস্য হওয়ার বিষয়টি সার্বজনীন হওয়া সত্ত্বেও এখানে বিশেষভাবে তাঁদেরকে সম্বোধন করার উদ্দেশ্য তাঁদের বিশেষ মর্যাদাকে প্রকাশ করতে। এর আরো একটি কারণ এ-ও হতে পারে যে, এই সুরা দুটো অবতীর্ণই করা হয়েছে রসুল স. এবং তাঁর সহচরবর্গের উপর থেকে যাদুর প্রভাবকে চিরতরে তিরোহিত করা। কেননা পাল্যজনের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব বহন করতে হয় পালনকর্তাকেই। গউছুছ্ ছাকালাইন বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী তাই বলেছেনজ্জ
‘যখন তুমিই আমার পৃষ্ঠদেশের আশ্রয়, তখন আমার কাছে কি লাঞ্ছনা-গঞ্জনা আসতে পারে? পৌঁছতে কি পারে আমার কাছে কোনো জুলুম, যখন তুমিই আমার সাহায্যদাতা? চারণভূমির রক্ষাকর্তা যদি তা রক্ষা করতে সমর্থ হয়, আর এদিকে
তাফসীরে মাযহারী/৬৪৯
হারিয়ে যায় উটের পা বাঁধার রশি, তবে কি তার জন্য এটা লজ্জার ব্যাপার নয়? অবিশ্বাসীরাও আল্লাহ্র প্রভুপালকত্ব ও শাসনকর্তৃত্বের অধীন।। তাই তারা তাঁর হেফাজত থেকে বঞ্চিত। একারণেই আহযাব যুদ্ধের সময় রসুল স. তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আমাদের পালনকর্তা আছেন, তোমাদের কোনো পালনকর্তা নেই।
২ ও ৩ সংখ্যক আয়াতে পুনঃপুনঃ ‘মানুষ’ উল্লেখ না করে সর্বনাম ব্যবহার করলেই যথেষ্ট হতো। কিন্তু তা করা হয়নি ব্যাখ্যাটিকে সুদূরপ্রসারী করণার্থে এবং রসুল স. ও তাঁর একনিষ্ঠ অনুগামীগণের সূউচ মাহাত্ম্য প্রকাশার্থে। উল্লেখ্য, সুরা ফালাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে দৈহিক দুর্বিপাক থেকে আশ্রয় গ্রহণের, যে দুর্বিপাকে পতিত হতে থাকে মানুষসহ অন্য সকল সৃষ্টি। তাই সেখানে বলা হয়েছে ‘রব্বিল ফালাক্ব’। কিন্তু এখানে আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে হৃদয়ঘটিত অনিষ্টতা থেকে, যা কেবল মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সেকারণেই এখানে ‘রব’ (প্রভুপালক)কে সম্বন্ধযুক্ত করা হয়েছে মানুষের সাথে। বলা হয়েছে ‘রববিন্ নাস’। এভাবে এখানকার বক্তব্যটি দাঁড়িয়েছেজ্জ মানুষকে প্রবঞ্চনায় নিক্ষেপকারী প্রবৃত্তির প্ররোচনার অনিষ্টতা থেকে আমি শরণ গ্রহণ করছি কেবল আল্লাহ্র, যিনি মানুষের কার্যাবলীর অধিপতি এবং মানুষের একমাত্র উপাস্য।
উল্লেখ্য, এই সূরার ৬টি আয়াতের মধ্যে ৫টিতেই উল্লেখ করা হয়েছে ‘আন্ নাস’ (মানুষ)। সর্বনাম ব্যবহার করা হয়নি একটিতেও। এভাবে এখানে বক্তব্যকে করে তোলা হয়েছে অধিকতর উদ্দেশ্যপূর্ণ ও গুরুত্ববহ, সর্বনাম ব্যবহার করলে যা হতো না। তাছাড়া এখানে প্রতিটি আয়াতের উদ্দেশ্যও পৃথক পৃথক। সর্বনাম ব্যবহার করলে উদ্দেশ্যের এই পৃথকতাও প্রকাশ পেতো না। বক্তব্যটি হয়ে যেতো একমুখী। তাই কোনো কোনো বিদ্বান বলেছেন ১. প্রথমোক্ত ‘আন্ নাস’ অর্থ মানব শিশু, যারা লালন পালনের মুখাপেক্ষী। সেজন্যই বলা হয়েছে ‘রব্বিন্ নাস’ (মানুষের প্রতিপালকের) ২. দ্বিতীয় আয়াতের ‘আন্ নাস’ অর্থ যুবক, যারা যুদ্ধ করে আল্লাহ্র পথে। রাষ্ট্ররক্ষায় তাদের প্রয়োজন অনিবার্য। তাই বলা হয়েছে ‘মালিকিন্ নাস’ (মানুষের অধিপতির) ৩. তৃতীয় আয়াতের ‘আন্ নাস’ অর্থ বয়োপ্রবীণ, যারা পার্থিব কর্মকাণ্ড থেকে অবকাশ পেয়ে নিমগ্ন হয় এক আল্লাহ্র একনিষ্ঠ ইবাদতে। তাই বলা হয়েছে ‘ইলাহিন্ নাস’ (মানুষের ইলাহের নিকট) ৪. পঞ্চম আয়াতের ‘আন্ নাস’ অর্থ পরিশুদ্ধ মানুষ, যারা শয়তানের শত্রু। তাই আশ্রয় কামনা করতে বলা হয়েছে এভাবে ‘মিন শাররিল ওয়াস্ওয়াসিল্ খন্নাস’ (যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে) ৫. ষষ্ঠ আয়াতের ‘আন্ নাস’ অর্থ শয়তান প্রভাবিত মানুষ। অর্থাৎ শয়তান যেমন মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়, তেমনি কুমন্ত্রণা দেয় তার দলভূত মানুষেরাও। তাই তাদের অপপ্রভাব থেকেও আশ্রয় প্রার্থনা করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে এখানে। রসুল স. বলেছেন, যদি অথর্ব বৃদ্ধ, দুগ্ধপোষ্য শিশু ও চারণশীল চতুষ্পদ জন্তু না থাকতো, তাহলে তোমাদের উপরে নেমে আসতো শাস্তি। হজরত আবু হোরায়রা থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আবু
তাফসীরে মাযহারী/৬৫০
ইয়াসা, বাযযার ও বায়হাকী। এর সমর্থনে রয়েছে আরো একটি অপরিণত সূত্রবিশিষ্ট হাদিস, যা জুহুরী সূত্রে বর্ণনা করেছেন আবু নাঈম। আবার এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘যদি বিশ্বাসী নর-নারী না থাকতো, যাদেরকে তোমরা জানতেনা ......’ শেষ পর্যন্ত।
বায়যাবী লিখেছেন, আলোচ্য সুরার বাক্যগুলোর গতিধারা থেকে একথাই প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ্পাক পুনরুত্থান ঘটাতে সম্পূর্ণ সক্ষম। আর বাক্যগুলোর ধারাবাহিক বিন্যাস থেকে প্রতীয়মান হয়, মানুষের জন্য মর্যাদার স্তরও রয়েছে অনেক। তবে এমন স্তরের রহস্যভেদ করতে পারেন কেবল তাঁরা, যাঁরা আল্লাহ্র পরিচয়ধন্য। তাঁরা আল্লাহ্র বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অনুগ্রহসম্ভারের প্রতি দৃষ্টিপাত করে অভিভূত হয়ে যান। হৃদয় ও মস্তিষ্ক দিয়ে বুঝতে পারেন, অবশ্যই আল্লাহ্ একমাত্র প্রভুপালয়িতা, যিনি কারোরই মুখাপেক্ষী নন, অথচ সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। সৃষ্টির প্রতিটি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করেন সেই আনুরূপ্যবিহীন আল্লাহ্ই, অন্য কেউ নয়। তিনিই মালিক, মোখতার এবং সর্বাধিপতি। সুতরাং তিনিই সকলের একমাত্র উপাস্য।
এরপরের আয়াতে (৪) বলা হয়েছেজ্জ ‘মিন শাররিল ওয়াস্ওয়াসিল খন্নাস’ (আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে)। এখানকার ‘আল ওয়াস্ওয়াসি’ নামপদ, অর্থ কুমন্ত্রণা। হ্রস্ব থেকে অতি হ্রস্ব ধ্বনির নাম ‘ওয়াস্ওয়াসা’, যা কেবল হৃদয়ে অনুভব্য, শ্রুতির অতীত। এখানে ‘ওয়াস্ওয়াসা’ বলে বুঝানো হয়েছে শয়তানের সেরূপ সূক্ষ্ম কুমন্ত্রণাকে। অথবা বলা যায়, আধিক্য বুঝানোর জন্যই এখানে ধাতুমূলকে ব্যবহার করা হয়েছে কর্তৃবাচক শব্দরূপের স্থলে। কিংবা এখানে সম্বন্ধপদ রয়েছে অনুক্ত। অর্থাৎ কুমন্ত্রণা প্রক্ষেপণকারী। এরকম বলেছেন জুজায।
এখানকার ‘আল খন্নাস’ (আত্মগোপনকারী) শব্দটি ‘আল ওয়াস্ওয়াসা’ (কুমন্ত্রণা) এর বিশেষণ। শব্দটির ধাতুমূল ‘খনসুন’ বা ‘খুনসুন’ অর্থ চুপিসারে পশ্চাদপসরণ করা। এটাই শয়তানের রীতি। যখন আল্লাহ্র জিকির করা হয়, তখন সে চুপিসারে পিছনে হটে যায়। এ জন্যই তাকে এখানে বলা হয়েছে ‘আত্মগোপনকারী’। হজরত আবদুল্লাহ্ ইবনে শাকীক বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, মানুষের হৃদয়ে আছে দুইটি কুঠরীজ্জ একটিতে থাকে ফেরেশতা, অপরটিতে শয়তান। মানুষ যখন আল্লাহ্র জিকিরে মগ্ন হয়, তখন শয়তান পিছনে সরে যায়। আর যখন মানুষ জিকির থেকে উদাসীন থাকে, তখন সে তার ঠোঁট দিয়ে হৃদয়ে ঠোকর মারতে থাকে। এভাবে হৃদয়ে প্রক্ষেপ করে প্ররোচনা। আবু ইয়ালা।।
এরপরের আয়াতে (৫) বলা হয়েছেজ্জ ‘আল্ লাজী ইউওয়াস্উইসু ফী সুদূরিন্ নাস’ (যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে)। একথার অর্থজ্জ মানুষ যখন আল্লাহ্র স্মরণচ্যুত হয়, তখন শয়তান তার অন্তরে দেয় কুমন্ত্রণা। এভাবে এখানে বিবৃত হয়েছে ‘ওয়াস্ওয়াসা’ পদের দ্বিতীয় বিশেষণ।।
তাফসীরে মাযহারী/৬৫১
শেষোক্ত আয়াতে বলা হয়েছে ‘মিনাল জ্বিন্নাতি ওয়ান্ নাস’ (জ্বিনের মধ্য থেকে এবং মানুষের মধ্য থেকে)। এই বাক্যটিও ‘ওয়াস্ওয়াসা’র বিবরণ, অথবা বিবরণ ‘আল্ লাজী’র। অর্থাৎ কুমন্ত্রণাদাতা জ্বিনের মধ্য থেকে যেমন হয়, তেমনি হয় মানুষের মধ্য থেকেও। যেমন এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘আমি মানুষ শয়তান ও জ্বিন শয়তানকে প্রত্যেক নবীর জন্য শত্রু বানিয়ে দিয়েছি’। সারকথা হচ্ছে, আলোচ্য সুরার মাধ্যমে আল্লাহ্ তাঁর প্রিয়তম রসুল এবং তাঁর অনুগামীগণকে জ্বিন ও মানুষের অনিষ্টতা থেকে আত্মরক্ষার নিমিত্তে আল্লাহ্ সকাশে আশ্রয় যাচনা করার নির্দেশনা দিয়েছেন।
একটি সংশয়ঃ একজন মানুষ আর এক জন মানুষের হৃদয়ে তো প্রবেশ করতে পারে না। তাহলে মানুষ কুমন্ত্রণাদাতা, এরকম বলার অর্থ কী?
সংশয়ভঞ্জনঃ মানুষও কুমন্ত্রণাদাতা। তবে তাদের কুমন্ত্রণা প্রভাব বিস্তার করে পরিবেশ-পরিসি'তি অনুসারে। মানুষের কথা অন্য মানুষের হৃদয়ে প্রভাব বিস্তার করেই। তখন হৃদয়ে কার্যকর হয় কুমন্ত্রণা। অথবা এখানকার ‘মিনাল জ্বিন্নাতি ওয়ান নাস’ কথাটি সম্পৃক্ত হবে আগের আয়াতের ‘ওয়াস্ওয়াসা’ পদের সাথে। অর্থাৎ মানুষের মনের ভিতর জ্বিন ও মানুষ বিভিন্ন কার্যোপলক্ষে কুমন্ত্রণা সৃষ্টি করে। কালাবী বলেছেন, আগের আয়াতের ‘কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে’ কথাটিতে যে মানুষ উদ্দেশ্য ‘জ্বিনের মধ্য থেকে এবং মানুষের মধ্য থেকে’ বাক্যে দেওয়া হয়েছে তারই পরিচয়। যেনো মানুষ জ্বিন ও মানুষ উভয়ের কুমন্ত্রণার ধারক। ‘নাস’ অর্থ আবার জ্বিনও হয়। যেমন এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘ওয়া আন্নাহু কানা রিজ্বালুম মিনাল ইনসি ওয়া ইয়াউজুনা বি রিজ্বালিম মিনাল জ্বিননি’। এই আয়াতে রিজ্বালুম মিনাল ইনসি’ (অনেক লোক) বলে বুঝানো হয়েছে জ্বিনদেরকে)। বাগবী লিখেছেন, এক বেদুইন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, একদিন তার সামনে একদল জ্বিন উপসি'ত হলো। সে জিজ্ঞেস করলো, তোমরা কে? তারা বললো, আমরা জ্বিনদের লোক। ফাররার বক্তব্যও এরকম। আবার এরকমও বলা যেতে পারে যে, এখানকার বক্তব্যটি হবেজ্জ আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি জ্বিনজাতীয় শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে এবং মানুষের অনিষ্ট থেকে।
হজরত উকবা ইবনে আমের বর্ণনা করেছেন, রসুল স. একবার বললেন, তোমরা কি জানো, আজ রাতে এমন কিছু অবতীর্ণ হয়েছে, যার মতো ইতোপূর্বে আর অবতীর্ণ হয়নি। শোনো, সদ্য অবতীর্ণ সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস। মুসলিম। আহমদের বর্ণনায় বিষয়টির উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে, রসুল স. একবার বললেন, আমি কি তোমাদের এমন সুরা শিক্ষা দিবো না, যার অনুরূপ কোরআনে, যবুরে এবং ইঞ্জিলে নেই? বর্ণনাকারী বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহ্র প্রিয়তম রসুল! অবশ্যই শিক্ষা দিন। তিনি তখন আবৃত্তি করলেন সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস।
তাফসীরে মাযহারী/৬৫২
উম্মতজননী হজরত আয়েশা সিদ্দিকা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. শয্যাগ্রহণের সময় সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস পাঠ করে দুই হাত একত্র করে তাতে ফুঁ দিতেন। তারপর দুই হাত দিয়ে মুছে ফেলতেন তাঁর পবিত্র শরীর। মুছতেন মস্তক, মুখমণ্ডল, দেহের উভয় পার্শ্ব, যতদূর হস্ত প্রসারিত করা যায়। এরূপ করতেন তিনি তিনবার। মুসলিম।
হজরত উকবা ইবনে আমের বর্ণনা করেছেন, এক যাত্রায় আমি ছিলাম রসুল স. এর সহগামী। জুহফা এবং আবওয়ার মাঝখানে পথ চলার সময় হঠাৎ শুরু হলো ঝড়। অন্ধকার আমাদেরকে ঢেকে ফেললো। রসুল স. সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস পাঠ করে আল্লাহ্র সাহায্য কামনা করতে লাগলেন। আমাকে বললেন, উকবা! তুমিও এমন করো। আমিও তাঁর অনুসরণ করলাম। ওভাবে কেউ কখনো আল্লাহ্ সকাশে সাহায্যপ্রার্থী হয়নি। আবু দাউদ।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে হাবীব বর্ণনা করেছেন, এক রাতে মুষল ধারায় বৃষ্টি শুরু হলো। চরাচর ঢেকে গেলো ঘোর অন্ধকারে। আমরা রসুল স. এর শরণাপন্ন হলাম। তিনি স. বললেন, বলো। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, কী বলবো? তিনি স. বললেন, সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস। তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসাঈ। যখন খুব বেশী দুর্বল হয়ে পড়লেন, তখন আমিই সুরা দু’টো পাঠ করে তাঁর উপর ফুঁক দিতে লাগলাম। কিন্তু ফুঁক দিতাম তাঁর হাতে, আর তাঁর হাতই বুলিয়ে দিতাম তাঁর পবিত্র শরীরে। বাগবী। তবুও আল্লাহ্র সঙ্গে তাদের কোনো পরিচয়ই নেই তিনি এই হাদিসটি হজরত আনাস থেকেও বর্ণনা করেছেন শব্দটিতে যের যুক্ত করা হয়েছে সে কারণেই এই তিনটি সুরা সকাল-সন্ধ্যায় তিন বার করে পাঠ করলে তোমরা রক্ষা পাবে যাবতীয় বিপদ-আপদ থেকে জননী আয়েশা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. যখন অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখন সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস পাঠ করে তাঁর নিজের উপরে ফুঁক দিতে লাগলেন
সূরা নাসঃ আয়াত ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬
তাফসীরে মাযহারী/৬৪৮
বল, ‘আমি শরণ লইতেছি মানুষের প্রতিপালকের,
‘মানুষের অধিপতির,
‘মানুষের ইলাহের নিকট
আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার ‘অনিষ্ট হইতে,
‘যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে,
‘জিন্নের মধ্য হইতে এবং মানুষের মধ্য হইতে।’
প্রথমে বলা হয়েছে ‘ক্বুল আঊ’জু বি রব্বিন্ নাস’ (বলো আমি শরণ গ্রহণ করছি মানুষের প্রতিপালকের)। এখানে ‘বলো’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে রসুল স.কে। আর এখানে ‘রববিন্ নাস’ অর্থ মানুষের প্রভুপালক। এভাবে বক্তব্যটি দাঁড়ায়জ্জ হে আমার প্রিয়তম রসুল! আপনি আপনার প্রার্থনায় বলুন, মানুষের যিনি স্রষ্টা, পালয়িতা ও ব্যবস্থাপয়িতা, আমি সেই মহান প্রভুপালনকর্তারই শরণ যাচনা করি।
পরের আয়াতে (২) বলা হয়েছেজ্জ ‘মালিকিন নাস’ (মানুষের অধিপতির)। অর্থাৎ সেই প্রভুপালয়িতার কাছেই আমি শরণ প্রার্থনা করি, যিনি মানুষের অস্তিত্বেরও অধিপতি।
এরপরের আয়াতে (৩) বলা হয়েছেজ্জ ‘ইলাহিন্ নাস্’ (মানুষের ইলাহের নিকট)। বাক্যটি আগের বাক্যদু’টোর বিস্তৃতি বা বিবৃতি। অর্থাৎ শরণ কামনা করি আমি সেই প্রভুপালক ও অধিকর্তার নিকট, যিনি একমাত্র উপাস্যও। কেননা পালয়িতা তো বলা হয় মাতা-পিতাকে, অথবা অন্যান্য অভিভাবককেও। আবার অধিপতি বলা হয় রাজা-বাদশাহকেও। কিন্তু উপাস্য তারা কদাচ নন। আল্লাহ্র প্রতিপালকত্ব ও অধিপতিত্ব যে অন্য কারো মতো নয়, সেকথা প্রমাণার্থেই তাই অবশেষে বলা হয়েছে ‘মানুষের উপাস্যের নিকট’। অর্থাৎ তিনি পালনকর্তা ও অধিপতিই কেবল নন, তিনি উপাস্যও।
এখানকার ‘আন্ নাস্’ (মানুষ) পদটির নির্দিষ্টবাচক ‘আলিফ লাম’ সীমিতার্থক। এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে সীমিত-সংখ্যকদেরকে। অর্থাৎ রসুল স. ও তাঁর সহচরবৃন্দকে। আল্লাহ্পাকের পালকত্ব, আধিপত্য ও উপাস্য হওয়ার বিষয়টি সার্বজনীন হওয়া সত্ত্বেও এখানে বিশেষভাবে তাঁদেরকে সম্বোধন করার উদ্দেশ্য তাঁদের বিশেষ মর্যাদাকে প্রকাশ করতে। এর আরো একটি কারণ এ-ও হতে পারে যে, এই সুরা দুটো অবতীর্ণই করা হয়েছে রসুল স. এবং তাঁর সহচরবর্গের উপর থেকে যাদুর প্রভাবকে চিরতরে তিরোহিত করা। কেননা পাল্যজনের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব বহন করতে হয় পালনকর্তাকেই। গউছুছ্ ছাকালাইন বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী তাই বলেছেনজ্জ
‘যখন তুমিই আমার পৃষ্ঠদেশের আশ্রয়, তখন আমার কাছে কি লাঞ্ছনা-গঞ্জনা আসতে পারে? পৌঁছতে কি পারে আমার কাছে কোনো জুলুম, যখন তুমিই আমার সাহায্যদাতা? চারণভূমির রক্ষাকর্তা যদি তা রক্ষা করতে সমর্থ হয়, আর এদিকে
তাফসীরে মাযহারী/৬৪৯
হারিয়ে যায় উটের পা বাঁধার রশি, তবে কি তার জন্য এটা লজ্জার ব্যাপার নয়? অবিশ্বাসীরাও আল্লাহ্র প্রভুপালকত্ব ও শাসনকর্তৃত্বের অধীন।। তাই তারা তাঁর হেফাজত থেকে বঞ্চিত। একারণেই আহযাব যুদ্ধের সময় রসুল স. তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আমাদের পালনকর্তা আছেন, তোমাদের কোনো পালনকর্তা নেই।
২ ও ৩ সংখ্যক আয়াতে পুনঃপুনঃ ‘মানুষ’ উল্লেখ না করে সর্বনাম ব্যবহার করলেই যথেষ্ট হতো। কিন্তু তা করা হয়নি ব্যাখ্যাটিকে সুদূরপ্রসারী করণার্থে এবং রসুল স. ও তাঁর একনিষ্ঠ অনুগামীগণের সূউচ মাহাত্ম্য প্রকাশার্থে। উল্লেখ্য, সুরা ফালাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে দৈহিক দুর্বিপাক থেকে আশ্রয় গ্রহণের, যে দুর্বিপাকে পতিত হতে থাকে মানুষসহ অন্য সকল সৃষ্টি। তাই সেখানে বলা হয়েছে ‘রব্বিল ফালাক্ব’। কিন্তু এখানে আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে হৃদয়ঘটিত অনিষ্টতা থেকে, যা কেবল মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সেকারণেই এখানে ‘রব’ (প্রভুপালক)কে সম্বন্ধযুক্ত করা হয়েছে মানুষের সাথে। বলা হয়েছে ‘রববিন্ নাস’। এভাবে এখানকার বক্তব্যটি দাঁড়িয়েছেজ্জ মানুষকে প্রবঞ্চনায় নিক্ষেপকারী প্রবৃত্তির প্ররোচনার অনিষ্টতা থেকে আমি শরণ গ্রহণ করছি কেবল আল্লাহ্র, যিনি মানুষের কার্যাবলীর অধিপতি এবং মানুষের একমাত্র উপাস্য।
উল্লেখ্য, এই সূরার ৬টি আয়াতের মধ্যে ৫টিতেই উল্লেখ করা হয়েছে ‘আন্ নাস’ (মানুষ)। সর্বনাম ব্যবহার করা হয়নি একটিতেও। এভাবে এখানে বক্তব্যকে করে তোলা হয়েছে অধিকতর উদ্দেশ্যপূর্ণ ও গুরুত্ববহ, সর্বনাম ব্যবহার করলে যা হতো না। তাছাড়া এখানে প্রতিটি আয়াতের উদ্দেশ্যও পৃথক পৃথক। সর্বনাম ব্যবহার করলে উদ্দেশ্যের এই পৃথকতাও প্রকাশ পেতো না। বক্তব্যটি হয়ে যেতো একমুখী। তাই কোনো কোনো বিদ্বান বলেছেন ১. প্রথমোক্ত ‘আন্ নাস’ অর্থ মানব শিশু, যারা লালন পালনের মুখাপেক্ষী। সেজন্যই বলা হয়েছে ‘রব্বিন্ নাস’ (মানুষের প্রতিপালকের) ২. দ্বিতীয় আয়াতের ‘আন্ নাস’ অর্থ যুবক, যারা যুদ্ধ করে আল্লাহ্র পথে। রাষ্ট্ররক্ষায় তাদের প্রয়োজন অনিবার্য। তাই বলা হয়েছে ‘মালিকিন্ নাস’ (মানুষের অধিপতির) ৩. তৃতীয় আয়াতের ‘আন্ নাস’ অর্থ বয়োপ্রবীণ, যারা পার্থিব কর্মকাণ্ড থেকে অবকাশ পেয়ে নিমগ্ন হয় এক আল্লাহ্র একনিষ্ঠ ইবাদতে। তাই বলা হয়েছে ‘ইলাহিন্ নাস’ (মানুষের ইলাহের নিকট) ৪. পঞ্চম আয়াতের ‘আন্ নাস’ অর্থ পরিশুদ্ধ মানুষ, যারা শয়তানের শত্রু। তাই আশ্রয় কামনা করতে বলা হয়েছে এভাবে ‘মিন শাররিল ওয়াস্ওয়াসিল্ খন্নাস’ (যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে) ৫. ষষ্ঠ আয়াতের ‘আন্ নাস’ অর্থ শয়তান প্রভাবিত মানুষ। অর্থাৎ শয়তান যেমন মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়, তেমনি কুমন্ত্রণা দেয় তার দলভূত মানুষেরাও। তাই তাদের অপপ্রভাব থেকেও আশ্রয় প্রার্থনা করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে এখানে। রসুল স. বলেছেন, যদি অথর্ব বৃদ্ধ, দুগ্ধপোষ্য শিশু ও চারণশীল চতুষ্পদ জন্তু না থাকতো, তাহলে তোমাদের উপরে নেমে আসতো শাস্তি। হজরত আবু হোরায়রা থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আবু
তাফসীরে মাযহারী/৬৫০
ইয়াসা, বাযযার ও বায়হাকী। এর সমর্থনে রয়েছে আরো একটি অপরিণত সূত্রবিশিষ্ট হাদিস, যা জুহুরী সূত্রে বর্ণনা করেছেন আবু নাঈম। আবার এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘যদি বিশ্বাসী নর-নারী না থাকতো, যাদেরকে তোমরা জানতেনা ......’ শেষ পর্যন্ত।
বায়যাবী লিখেছেন, আলোচ্য সুরার বাক্যগুলোর গতিধারা থেকে একথাই প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ্পাক পুনরুত্থান ঘটাতে সম্পূর্ণ সক্ষম। আর বাক্যগুলোর ধারাবাহিক বিন্যাস থেকে প্রতীয়মান হয়, মানুষের জন্য মর্যাদার স্তরও রয়েছে অনেক। তবে এমন স্তরের রহস্যভেদ করতে পারেন কেবল তাঁরা, যাঁরা আল্লাহ্র পরিচয়ধন্য। তাঁরা আল্লাহ্র বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অনুগ্রহসম্ভারের প্রতি দৃষ্টিপাত করে অভিভূত হয়ে যান। হৃদয় ও মস্তিষ্ক দিয়ে বুঝতে পারেন, অবশ্যই আল্লাহ্ একমাত্র প্রভুপালয়িতা, যিনি কারোরই মুখাপেক্ষী নন, অথচ সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। সৃষ্টির প্রতিটি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করেন সেই আনুরূপ্যবিহীন আল্লাহ্ই, অন্য কেউ নয়। তিনিই মালিক, মোখতার এবং সর্বাধিপতি। সুতরাং তিনিই সকলের একমাত্র উপাস্য।
এরপরের আয়াতে (৪) বলা হয়েছেজ্জ ‘মিন শাররিল ওয়াস্ওয়াসিল খন্নাস’ (আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে)। এখানকার ‘আল ওয়াস্ওয়াসি’ নামপদ, অর্থ কুমন্ত্রণা। হ্রস্ব থেকে অতি হ্রস্ব ধ্বনির নাম ‘ওয়াস্ওয়াসা’, যা কেবল হৃদয়ে অনুভব্য, শ্রুতির অতীত। এখানে ‘ওয়াস্ওয়াসা’ বলে বুঝানো হয়েছে শয়তানের সেরূপ সূক্ষ্ম কুমন্ত্রণাকে। অথবা বলা যায়, আধিক্য বুঝানোর জন্যই এখানে ধাতুমূলকে ব্যবহার করা হয়েছে কর্তৃবাচক শব্দরূপের স্থলে। কিংবা এখানে সম্বন্ধপদ রয়েছে অনুক্ত। অর্থাৎ কুমন্ত্রণা প্রক্ষেপণকারী। এরকম বলেছেন জুজায।
এখানকার ‘আল খন্নাস’ (আত্মগোপনকারী) শব্দটি ‘আল ওয়াস্ওয়াসা’ (কুমন্ত্রণা) এর বিশেষণ। শব্দটির ধাতুমূল ‘খনসুন’ বা ‘খুনসুন’ অর্থ চুপিসারে পশ্চাদপসরণ করা। এটাই শয়তানের রীতি। যখন আল্লাহ্র জিকির করা হয়, তখন সে চুপিসারে পিছনে হটে যায়। এ জন্যই তাকে এখানে বলা হয়েছে ‘আত্মগোপনকারী’। হজরত আবদুল্লাহ্ ইবনে শাকীক বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, মানুষের হৃদয়ে আছে দুইটি কুঠরীজ্জ একটিতে থাকে ফেরেশতা, অপরটিতে শয়তান। মানুষ যখন আল্লাহ্র জিকিরে মগ্ন হয়, তখন শয়তান পিছনে সরে যায়। আর যখন মানুষ জিকির থেকে উদাসীন থাকে, তখন সে তার ঠোঁট দিয়ে হৃদয়ে ঠোকর মারতে থাকে। এভাবে হৃদয়ে প্রক্ষেপ করে প্ররোচনা। আবু ইয়ালা।।
এরপরের আয়াতে (৫) বলা হয়েছেজ্জ ‘আল্ লাজী ইউওয়াস্উইসু ফী সুদূরিন্ নাস’ (যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে)। একথার অর্থজ্জ মানুষ যখন আল্লাহ্র স্মরণচ্যুত হয়, তখন শয়তান তার অন্তরে দেয় কুমন্ত্রণা। এভাবে এখানে বিবৃত হয়েছে ‘ওয়াস্ওয়াসা’ পদের দ্বিতীয় বিশেষণ।।
তাফসীরে মাযহারী/৬৫১
শেষোক্ত আয়াতে বলা হয়েছে ‘মিনাল জ্বিন্নাতি ওয়ান্ নাস’ (জ্বিনের মধ্য থেকে এবং মানুষের মধ্য থেকে)। এই বাক্যটিও ‘ওয়াস্ওয়াসা’র বিবরণ, অথবা বিবরণ ‘আল্ লাজী’র। অর্থাৎ কুমন্ত্রণাদাতা জ্বিনের মধ্য থেকে যেমন হয়, তেমনি হয় মানুষের মধ্য থেকেও। যেমন এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘আমি মানুষ শয়তান ও জ্বিন শয়তানকে প্রত্যেক নবীর জন্য শত্রু বানিয়ে দিয়েছি’। সারকথা হচ্ছে, আলোচ্য সুরার মাধ্যমে আল্লাহ্ তাঁর প্রিয়তম রসুল এবং তাঁর অনুগামীগণকে জ্বিন ও মানুষের অনিষ্টতা থেকে আত্মরক্ষার নিমিত্তে আল্লাহ্ সকাশে আশ্রয় যাচনা করার নির্দেশনা দিয়েছেন।
একটি সংশয়ঃ একজন মানুষ আর এক জন মানুষের হৃদয়ে তো প্রবেশ করতে পারে না। তাহলে মানুষ কুমন্ত্রণাদাতা, এরকম বলার অর্থ কী?
সংশয়ভঞ্জনঃ মানুষও কুমন্ত্রণাদাতা। তবে তাদের কুমন্ত্রণা প্রভাব বিস্তার করে পরিবেশ-পরিসি'তি অনুসারে। মানুষের কথা অন্য মানুষের হৃদয়ে প্রভাব বিস্তার করেই। তখন হৃদয়ে কার্যকর হয় কুমন্ত্রণা। অথবা এখানকার ‘মিনাল জ্বিন্নাতি ওয়ান নাস’ কথাটি সম্পৃক্ত হবে আগের আয়াতের ‘ওয়াস্ওয়াসা’ পদের সাথে। অর্থাৎ মানুষের মনের ভিতর জ্বিন ও মানুষ বিভিন্ন কার্যোপলক্ষে কুমন্ত্রণা সৃষ্টি করে। কালাবী বলেছেন, আগের আয়াতের ‘কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে’ কথাটিতে যে মানুষ উদ্দেশ্য ‘জ্বিনের মধ্য থেকে এবং মানুষের মধ্য থেকে’ বাক্যে দেওয়া হয়েছে তারই পরিচয়। যেনো মানুষ জ্বিন ও মানুষ উভয়ের কুমন্ত্রণার ধারক। ‘নাস’ অর্থ আবার জ্বিনও হয়। যেমন এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘ওয়া আন্নাহু কানা রিজ্বালুম মিনাল ইনসি ওয়া ইয়াউজুনা বি রিজ্বালিম মিনাল জ্বিননি’। এই আয়াতে রিজ্বালুম মিনাল ইনসি’ (অনেক লোক) বলে বুঝানো হয়েছে জ্বিনদেরকে)। বাগবী লিখেছেন, এক বেদুইন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, একদিন তার সামনে একদল জ্বিন উপসি'ত হলো। সে জিজ্ঞেস করলো, তোমরা কে? তারা বললো, আমরা জ্বিনদের লোক। ফাররার বক্তব্যও এরকম। আবার এরকমও বলা যেতে পারে যে, এখানকার বক্তব্যটি হবেজ্জ আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি জ্বিনজাতীয় শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে এবং মানুষের অনিষ্ট থেকে।
হজরত উকবা ইবনে আমের বর্ণনা করেছেন, রসুল স. একবার বললেন, তোমরা কি জানো, আজ রাতে এমন কিছু অবতীর্ণ হয়েছে, যার মতো ইতোপূর্বে আর অবতীর্ণ হয়নি। শোনো, সদ্য অবতীর্ণ সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস। মুসলিম। আহমদের বর্ণনায় বিষয়টির উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে, রসুল স. একবার বললেন, আমি কি তোমাদের এমন সুরা শিক্ষা দিবো না, যার অনুরূপ কোরআনে, যবুরে এবং ইঞ্জিলে নেই? বর্ণনাকারী বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহ্র প্রিয়তম রসুল! অবশ্যই শিক্ষা দিন। তিনি তখন আবৃত্তি করলেন সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস।
তাফসীরে মাযহারী/৬৫২
উম্মতজননী হজরত আয়েশা সিদ্দিকা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. শয্যাগ্রহণের সময় সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস পাঠ করে দুই হাত একত্র করে তাতে ফুঁ দিতেন। তারপর দুই হাত দিয়ে মুছে ফেলতেন তাঁর পবিত্র শরীর। মুছতেন মস্তক, মুখমণ্ডল, দেহের উভয় পার্শ্ব, যতদূর হস্ত প্রসারিত করা যায়। এরূপ করতেন তিনি তিনবার। মুসলিম।
হজরত উকবা ইবনে আমের বর্ণনা করেছেন, এক যাত্রায় আমি ছিলাম রসুল স. এর সহগামী। জুহফা এবং আবওয়ার মাঝখানে পথ চলার সময় হঠাৎ শুরু হলো ঝড়। অন্ধকার আমাদেরকে ঢেকে ফেললো। রসুল স. সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস পাঠ করে আল্লাহ্র সাহায্য কামনা করতে লাগলেন। আমাকে বললেন, উকবা! তুমিও এমন করো। আমিও তাঁর অনুসরণ করলাম। ওভাবে কেউ কখনো আল্লাহ্ সকাশে সাহায্যপ্রার্থী হয়নি। আবু দাউদ।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে হাবীব বর্ণনা করেছেন, এক রাতে মুষল ধারায় বৃষ্টি শুরু হলো। চরাচর ঢেকে গেলো ঘোর অন্ধকারে। আমরা রসুল স. এর শরণাপন্ন হলাম। তিনি স. বললেন, বলো। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, কী বলবো? তিনি স. বললেন, সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস। তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসাঈ। যখন খুব বেশী দুর্বল হয়ে পড়লেন, তখন আমিই সুরা দু’টো পাঠ করে তাঁর উপর ফুঁক দিতে লাগলাম। কিন্তু ফুঁক দিতাম তাঁর হাতে, আর তাঁর হাতই বুলিয়ে দিতাম তাঁর পবিত্র শরীরে। বাগবী। তবুও আল্লাহ্র সঙ্গে তাদের কোনো পরিচয়ই নেই তিনি এই হাদিসটি হজরত আনাস থেকেও বর্ণনা করেছেন শব্দটিতে যের যুক্ত করা হয়েছে সে কারণেই এই তিনটি সুরা সকাল-সন্ধ্যায় তিন বার করে পাঠ করলে তোমরা রক্ষা পাবে যাবতীয় বিপদ-আপদ থেকে জননী আয়েশা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. যখন অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখন সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস পাঠ করে তাঁর নিজের উপরে ফুঁক দিতে লাগলেন
সূরা ফালাক্ব
সূরা ফালাক্বঃ আয়াত ১, ২, ৩, ৪, ৫
বল, ‘আমি শরণ লইতেছি ঊষার স্রষ্টার
‘তিনি যাহা সৃষ্টি করিয়াছেন তাহার অনিষ্ট হইতে,
‘অনিষ্ট হইতে রাত্রির অন্ধকারের, যখন উহা গভীর হয়
‘এবং অনিষ্ট হইতে সমস্ত নারীদের, যাহারা গ্রন্থিতে ফুৎকার দেয়
‘এবং অনিষ্ট হইতে হিংসুকের, যখন সে হিংসা করে।’
প্রথমে বলা হয়েছে ‘ক্বুল আঊ’জু বিরব্বিল ফালাক্ব’ (বলো, আমি শরণ নিচ্ছি ঊষার স্রষ্টার)। এখানে ‘আল ফালাক্ব’ অর্থ অন্ধকার বিদীর্ণকারী ঊষালোক। জাবের
তাফসীরে মাযহারী/৬৪৫
ইবনে হাসান, সাঈদ ইবনে যোবায়ের, মুজাহিদ এবং কাতাদা এরকমই বলেছেন। ‘ফালিক্বুল ইসবাহ্’ আয়াতেও শব্দটি এই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, ‘ফালাক্ব’ অর্থ বিদীর্ণ করা, ফেঁড়ে ফেলা। যেমন অর্থ গ্রহণ করা হয় ‘ফালিক্বুল হাববি ওয়ান নাওয়া’ আয়াত থেকে। যেমন সবজির বীজ ফেটে অংকুরোদ্গম ঘটে চারার। মেঘ ফেঁড়ে নামে বৃষ্টি। ভূমি বিদীর্ণ করে প্রবাহিত হয় স্রোতস্বিনী। গর্ভাশয় ফুঁড়ে বের হয় শিশু। জুহাক বলেছেন, এর মর্মার্থজ্জ সমগ্র সৃষ্টি। ওয়ালেবীর বর্ণনায় এসেছে, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন ‘ফালাক্ব’ জাহান্নামের একটি বন্দীশালা। কালাবী বলেছেন, দোজখের একটি উপত্যকা। ইবনে জারীরের বর্ণনায় এসেছে, হজরত আবু হোরায়রা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, নরকের একটি অন্ধ কূপের নাম ‘ফালাক্ব’। ইবনে জারীর ও বায়হাকী লিখেছেন, আবদুল জব্বার খাওলাদী বর্ণনা করেছেন, একবার দামেশকে আমাদের কাছে আগমন করলেন রসুল স. এর একজন শ্রদ্ধেয় সাহাবী। তিনি রা. লোকদেরকে পার্থিব কাজকর্মে অতিরিক্ত মগ্ন হতে দেখে বললেন, এতে এদের কোনো মঙ্গল নেই। এদের সম্মুখে কি ফালাক্ব নেই? জিজ্ঞেস করা হলো, হে মাননীয় রসুল-সহচর! ‘ফালাক্ব’ কী ? বললেন, ফালাক্ব হচ্ছেনরকের একটি কুয়া। ওই কুয়ার মুখ উন্মুক্ত করা হলে তার ভিতর থেকে এমন উত্তপ্ত আগুন বের হবে যে, তার ভয়ে নরক নিজেই আর্তনাদ করে উঠবে।
ইবনে আবী হাতেম ও ইবনে জারীরের বর্ণনায় এসেছে, হজরত কা’ব বলেছেন, আল ফালাক্ব জাহান্নামের একটি গৃহ। ওই গৃহের দরজা যখন খোলা হবে, তখন তার ভয়াবহ উত্তাপ দেখে জাহান্নামবাসীরা ভয়ে চীৎকার করে উঠবে। জায়েদ ইবনে আলী তাঁর পিতৃস্থানীয় ইমাম হোসাইন ইবনে হজরত আলীর বরাত দিয়ে বলেছেন, আল ফালাক্ব হচ্ছেজাহান্নামের তলদেশের একটি কূপ।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘রব্বিল ফালাক্ব’ (ফালাক্বের প্রভুপালনকর্তা)। এরকম বলা হয়েছে একথাটি বুঝাতে যে, জাহান্নাম ও ফালাক্বের যিনি অধিপতি, তিনিই কেবল বাঁচাতে পারেন এদু’টোর ভয়ংকর অকল্যাণ থেকে। কাজেই এদু’টোর অনিষ্টতা থেকে রক্ষা পেতে চাইলে শরণ গ্রহণ করতে হবে কেবল তাঁর।
পরের আয়াতে (২) বলা হয়েছেজ্জ ‘মিন শাররি মা খলাক্ব’ (তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে)। এখানে ‘মা খলাক্ব’ অর্থ যা কিছু তিনি সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ সমগ্র সৃষ্টি। এভাবে বক্তব্যটি দাঁড়ায়জ্জ আমি যাবতীয় সৃষ্টির অমঙ্গল থেকে ফালাক্বের মালিকের নিকট আশ্রয় ভিক্ষা চাই। উল্লেখ্য, কোনো সৃষ্টিই অনিষ্টতামুক্ত নয়। আদম অর্থাৎ অনস্তিত্বের কলংক রয়েছে প্রতিটি সৃষ্টির মূলে। তবে ওই কলংক থেকে সৃষ্টি মুক্তি নিতে পারে কেবল আল্লাহ্পাকের জ্যোতিসমাতের আলোকে আলোকিত হলে। তখন তার অপকর্ষতা রূপান্তরিত হয় উৎকর্ষতায়, যেমন আলোর উদ্ভাস ঘটলে অন্ধকারও হয়ে যায় আলো। যেমন
তাফসীরে মাযহারী/৬৪৬
এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘আল্লাহ্ তখন তার পাপকে পুণ্যে পরিণত করে দেন’। রসুল স. বলেছেন, আমার শয়তান মুসলমান হয়ে গিয়েছে। সে আমাকে ইষ্ট ব্যতীত অনিষ্টের পরামর্শ দেয় না। আল্লামা বায়যাবী লিখেছেন, আল্লাহ্পাক এখানেও কেবল সৃষ্টিজগতের অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় যাচনা করতে বলেছেন। আধ্যাত্মিক জগতের উল্লেখ করেননি। কেননা সেখানে কোনো অনিষ্টতাই নেই। সেখানে তো কেবল কল্যাণ আর কল্যাণ। সৃষ্টিজগতের অনিষ্টতা কখনো হয় ইচ্ছাকৃত, যেমন জুলুম, অথবা স্বভাবগত যেমন আগুনের দাহিকাশক্তি, বিষের সংহারক ক্ষমতা।
এরপরের আয়াতে (৩) বলা হয়েছেজ্জ ‘ওয়া মিন শাররি গসিক্বিন ইজা ওয়াক্বাব’ (অনিষ্ট হতে রাত্রির অন্ধকারের, যখন তা গভীর হয়)। ‘গসাক্ব’ এর আভিধানিক অর্থ পরিপূর্ণ হয়ে যাওয়া, ভরপুর হওয়া। যেমন এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘ইলা গসাক্বিল লাইলি’ (রাত্রের আঁধার পরিপূর্ণ হওয়া পর্যন্ত)। এভাবে ‘গসাক্বাল আ’ঈন’ অর্থ অশ্রুভরা আঁখি। ‘গসাক্বাল ক্বমার’ অর্থ পূর্ণ চন্দ্রালোক। কামুস অভিধানে লেখা রয়েছে ‘গসিক্ব’ অর্থ চাঁদ, এবং রাত; যখন অপসৃত হয় রক্তিম গোধূলি। ‘গাসাক্বুন’ এবং ‘আগসাক্বুন’ অর্থ অন্ধকার হয়ে যাওয়া।
কোনো কোনো বিদ্বান বলেছেন ‘গসাক্ব’ অর্থ প্রবাহিত হওয়া। এভাবে ‘গসাক্বাল লাইল’ অর্থ রাতের আঁধার ও কুয়াশায় ঘেরা। ‘গসাক্বাল আ’ঈন’ অর্থ অশ্রুপ্রবাহ। ‘গসাক্বাল ক্বমার’ অর্থ চাঁদের দ্রুত অস্তগমন। কেউ কেউ বলেছেন, ‘গসাক্ব’ অর্থ শীতলতা, যেমন শীতের রাত দিবস অপেক্ষা শীতল। চাঁদ সূর্য অপেক্ষা কোমল। রাত ও চাঁদকে ‘গসাক্ব’ বলা হয় এ জন্যই। এরই ভিত্তিতে চাঁদকে বলে ‘যামহারীর’জ্জ অত্যন্ত শীতল।
এখানে ‘গসাক্ব’ অর্থ হবে চাঁদ। কেননা মাতা মহোদয়া আয়েশার বর্ণনায় এসেছে, এক রাতে রসুল স. আমার হাত ধরলেন এবং চাঁদের দিকে দৃষ্টিপাত করে বললেন, আয়েশা! আল্লাহ্র নিকট ওই গসিক্বের অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা কোরো, যখন তা অস্তগামী হয়। স্বসূত্রে বাগবী।
‘ইজা ওয়াক্বাব’ অর্থ যখন তা গভীর হয়। অর্থাৎ যখন তা হতে থাকে দ্যুতিহীন, অদৃশ্য। বলা বাহুল্য, চাঁদ ক্ষয় হতে থাকে পূর্ণ কিরণ্ময় হওয়ার পর থেকে, পূর্ণিমা রজনী থেকে।
হজরত ইবনে আব্বাস, হাসান বসরী এবং মুজাহিদ বলেছেন ‘গাসাক্ব’ অর্থ রাত্রি। অর্থাৎ রাত্রির আগমনলগ্নে তার অন্ধকার আবৃত করে অপসৃয়মান আলোকে। ইবনে জায়েদ বলেছেন ‘গাসাক্ব’ অর্থ আকাশের নিচের দিকে অপসৃয়মান সপ্তর্ষিমণ্ডল, স্বল্প সময়ের মধ্যে যা চলে যায় অস্তাচলে। কারণ মানুষ বলে থাকে, সপ্তর্ষিমণ্ডলের অস্তগমনকালে প্রকোপ বাড়ে বিপদাপদের। আর সে বিপদ কেটে যায় তার উদয়কালে।
এরপরের আয়াতে (৪) বলা হয়েছেজ্জ ‘ওয়া মিন শাররিন্ নাফ্ফাছাতি ফীল উ’ক্বাদ’ (এবং অনিষ্ট হতে সমস্ত নারীর, যারা গ্রন্থিতে ফুৎকার দেয়)। এখানকার
তাফসীরে মাযহারী/৬৪৭
‘নাফ্ফাছাতি’ স্ত্রীলিঙ্গের বহুবচনীয় শব্দরূপ। শব্দটির বিশেষ্যপদ এখানে রয়েছে অনুক্ত। অর্থাৎ যাদুকর নর-নারী, যারা মন্ত্রতন্ত্র পাঠ করে এবং রসুল স. এর উপরে যাদু করার সময় সুতায় ফুৎকার দেয়। হজরত আবু উবায়দা বলেছেন, লবীদের নির্দেশে তার কন্যারাই এরকম করেছিলো।
শেষ আয়াতে (৫) বলা হয়েছে ‘ওয়া মিন শাররি হাসিদিন ইজা হাসাদ’ (এবং অনিষ্ট থেকে হিংসুকের, যখন সে হিংসা করে)। এরকম করে বলা হয়েছে এখানে একথাটি বুঝাতে যে, মনের ভিতরের গোপন হিংসা দগ্ধ করে হিংসাকারীকে। কিন্তু অন্যের জন্য তা ক্ষতিকর হয় তখন, যখন সে হিংসা প্রকাশ পায়। অর্থাৎ যখন সে অন্যের উপরে হিংসা চরিতার্থ করে।
উল্লেখ্য ‘তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে’ (আয়াত ২) কথাটির মধ্যে সব ধরনের অনিষ্টতার কথা বলা হয়েছে। তার পরেও বলা হয়েছে ‘গসিক্ব’ ‘নাফ্ফাছাত’ ও ‘হাসিদ’ এই তিনটি অনিষ্টতার কথা। এর কারণ হল , রসুল স. এর উপরে যে যাদু করা হয়েছিলো তার মধ্যে ওই তিন ধরনের অনিষ্টতাই ছিলো। ছিলো যাদু, প্রতারণা ও হিংসা। আবার ‘হাসিদিন’ ও ‘গাসিক্বিন’ অনির্দিষ্টবাচক এবং ‘আন নাফ্ফাছাতি’ নির্দিষ্টবাচক। এভাবে এখানে তাদেরকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করার কারণ হচ্ছে, লবীদের কন্যারা ছিলো নির্দিষ্ট ব্যক্তি। তাই তাদের অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় যাচনা করা হয়েছে নির্দিষ্টবাচক শব্দরূপের মাধ্যমে। রসুল স. এর প্রতি হিংসাপোষণকারীরা অসংখ্য। আর তারা সুচিহ্নিতও নয়। তাই তাদের অনিষ্টতা থেকে রক্ষা করার প্রার্থনা উপস্থাপন করা হয়েছে অনির্দিষ্টবাচক শব্দরূপের মাধ্যমে।
হজরত উকবা ইবনে আমের বলেছেন, আমি একবার রসুল স. এর পবিত্র সাহচর্যে উপসি'ত হয়ে বললাম, হে আল্লাহ্র প্রিয়তম রসুল! আমি সুরা ইউসুফ ও সুরা হুদ পাঠ করে থাকি। তিনি স. বললেন, আল্লাহ্র সঙ্গে সমর্ক রক্ষাকারীরূপে সুরা ফালাক্বের মতো আর কিছু নেই। আহমদ, দারেমী, নাসাঈ। আল্লাহ্ই ভালো জানেন।
বল, ‘আমি শরণ লইতেছি ঊষার স্রষ্টার
‘তিনি যাহা সৃষ্টি করিয়াছেন তাহার অনিষ্ট হইতে,
‘অনিষ্ট হইতে রাত্রির অন্ধকারের, যখন উহা গভীর হয়
‘এবং অনিষ্ট হইতে সমস্ত নারীদের, যাহারা গ্রন্থিতে ফুৎকার দেয়
‘এবং অনিষ্ট হইতে হিংসুকের, যখন সে হিংসা করে।’
প্রথমে বলা হয়েছে ‘ক্বুল আঊ’জু বিরব্বিল ফালাক্ব’ (বলো, আমি শরণ নিচ্ছি ঊষার স্রষ্টার)। এখানে ‘আল ফালাক্ব’ অর্থ অন্ধকার বিদীর্ণকারী ঊষালোক। জাবের
তাফসীরে মাযহারী/৬৪৫
ইবনে হাসান, সাঈদ ইবনে যোবায়ের, মুজাহিদ এবং কাতাদা এরকমই বলেছেন। ‘ফালিক্বুল ইসবাহ্’ আয়াতেও শব্দটি এই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, ‘ফালাক্ব’ অর্থ বিদীর্ণ করা, ফেঁড়ে ফেলা। যেমন অর্থ গ্রহণ করা হয় ‘ফালিক্বুল হাববি ওয়ান নাওয়া’ আয়াত থেকে। যেমন সবজির বীজ ফেটে অংকুরোদ্গম ঘটে চারার। মেঘ ফেঁড়ে নামে বৃষ্টি। ভূমি বিদীর্ণ করে প্রবাহিত হয় স্রোতস্বিনী। গর্ভাশয় ফুঁড়ে বের হয় শিশু। জুহাক বলেছেন, এর মর্মার্থজ্জ সমগ্র সৃষ্টি। ওয়ালেবীর বর্ণনায় এসেছে, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন ‘ফালাক্ব’ জাহান্নামের একটি বন্দীশালা। কালাবী বলেছেন, দোজখের একটি উপত্যকা। ইবনে জারীরের বর্ণনায় এসেছে, হজরত আবু হোরায়রা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, নরকের একটি অন্ধ কূপের নাম ‘ফালাক্ব’। ইবনে জারীর ও বায়হাকী লিখেছেন, আবদুল জব্বার খাওলাদী বর্ণনা করেছেন, একবার দামেশকে আমাদের কাছে আগমন করলেন রসুল স. এর একজন শ্রদ্ধেয় সাহাবী। তিনি রা. লোকদেরকে পার্থিব কাজকর্মে অতিরিক্ত মগ্ন হতে দেখে বললেন, এতে এদের কোনো মঙ্গল নেই। এদের সম্মুখে কি ফালাক্ব নেই? জিজ্ঞেস করা হলো, হে মাননীয় রসুল-সহচর! ‘ফালাক্ব’ কী ? বললেন, ফালাক্ব হচ্ছেনরকের একটি কুয়া। ওই কুয়ার মুখ উন্মুক্ত করা হলে তার ভিতর থেকে এমন উত্তপ্ত আগুন বের হবে যে, তার ভয়ে নরক নিজেই আর্তনাদ করে উঠবে।
ইবনে আবী হাতেম ও ইবনে জারীরের বর্ণনায় এসেছে, হজরত কা’ব বলেছেন, আল ফালাক্ব জাহান্নামের একটি গৃহ। ওই গৃহের দরজা যখন খোলা হবে, তখন তার ভয়াবহ উত্তাপ দেখে জাহান্নামবাসীরা ভয়ে চীৎকার করে উঠবে। জায়েদ ইবনে আলী তাঁর পিতৃস্থানীয় ইমাম হোসাইন ইবনে হজরত আলীর বরাত দিয়ে বলেছেন, আল ফালাক্ব হচ্ছেজাহান্নামের তলদেশের একটি কূপ।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘রব্বিল ফালাক্ব’ (ফালাক্বের প্রভুপালনকর্তা)। এরকম বলা হয়েছে একথাটি বুঝাতে যে, জাহান্নাম ও ফালাক্বের যিনি অধিপতি, তিনিই কেবল বাঁচাতে পারেন এদু’টোর ভয়ংকর অকল্যাণ থেকে। কাজেই এদু’টোর অনিষ্টতা থেকে রক্ষা পেতে চাইলে শরণ গ্রহণ করতে হবে কেবল তাঁর।
পরের আয়াতে (২) বলা হয়েছেজ্জ ‘মিন শাররি মা খলাক্ব’ (তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে)। এখানে ‘মা খলাক্ব’ অর্থ যা কিছু তিনি সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ সমগ্র সৃষ্টি। এভাবে বক্তব্যটি দাঁড়ায়জ্জ আমি যাবতীয় সৃষ্টির অমঙ্গল থেকে ফালাক্বের মালিকের নিকট আশ্রয় ভিক্ষা চাই। উল্লেখ্য, কোনো সৃষ্টিই অনিষ্টতামুক্ত নয়। আদম অর্থাৎ অনস্তিত্বের কলংক রয়েছে প্রতিটি সৃষ্টির মূলে। তবে ওই কলংক থেকে সৃষ্টি মুক্তি নিতে পারে কেবল আল্লাহ্পাকের জ্যোতিসমাতের আলোকে আলোকিত হলে। তখন তার অপকর্ষতা রূপান্তরিত হয় উৎকর্ষতায়, যেমন আলোর উদ্ভাস ঘটলে অন্ধকারও হয়ে যায় আলো। যেমন
তাফসীরে মাযহারী/৬৪৬
এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘আল্লাহ্ তখন তার পাপকে পুণ্যে পরিণত করে দেন’। রসুল স. বলেছেন, আমার শয়তান মুসলমান হয়ে গিয়েছে। সে আমাকে ইষ্ট ব্যতীত অনিষ্টের পরামর্শ দেয় না। আল্লামা বায়যাবী লিখেছেন, আল্লাহ্পাক এখানেও কেবল সৃষ্টিজগতের অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় যাচনা করতে বলেছেন। আধ্যাত্মিক জগতের উল্লেখ করেননি। কেননা সেখানে কোনো অনিষ্টতাই নেই। সেখানে তো কেবল কল্যাণ আর কল্যাণ। সৃষ্টিজগতের অনিষ্টতা কখনো হয় ইচ্ছাকৃত, যেমন জুলুম, অথবা স্বভাবগত যেমন আগুনের দাহিকাশক্তি, বিষের সংহারক ক্ষমতা।
এরপরের আয়াতে (৩) বলা হয়েছেজ্জ ‘ওয়া মিন শাররি গসিক্বিন ইজা ওয়াক্বাব’ (অনিষ্ট হতে রাত্রির অন্ধকারের, যখন তা গভীর হয়)। ‘গসাক্ব’ এর আভিধানিক অর্থ পরিপূর্ণ হয়ে যাওয়া, ভরপুর হওয়া। যেমন এক আয়াতে বলা হয়েছে ‘ইলা গসাক্বিল লাইলি’ (রাত্রের আঁধার পরিপূর্ণ হওয়া পর্যন্ত)। এভাবে ‘গসাক্বাল আ’ঈন’ অর্থ অশ্রুভরা আঁখি। ‘গসাক্বাল ক্বমার’ অর্থ পূর্ণ চন্দ্রালোক। কামুস অভিধানে লেখা রয়েছে ‘গসিক্ব’ অর্থ চাঁদ, এবং রাত; যখন অপসৃত হয় রক্তিম গোধূলি। ‘গাসাক্বুন’ এবং ‘আগসাক্বুন’ অর্থ অন্ধকার হয়ে যাওয়া।
কোনো কোনো বিদ্বান বলেছেন ‘গসাক্ব’ অর্থ প্রবাহিত হওয়া। এভাবে ‘গসাক্বাল লাইল’ অর্থ রাতের আঁধার ও কুয়াশায় ঘেরা। ‘গসাক্বাল আ’ঈন’ অর্থ অশ্রুপ্রবাহ। ‘গসাক্বাল ক্বমার’ অর্থ চাঁদের দ্রুত অস্তগমন। কেউ কেউ বলেছেন, ‘গসাক্ব’ অর্থ শীতলতা, যেমন শীতের রাত দিবস অপেক্ষা শীতল। চাঁদ সূর্য অপেক্ষা কোমল। রাত ও চাঁদকে ‘গসাক্ব’ বলা হয় এ জন্যই। এরই ভিত্তিতে চাঁদকে বলে ‘যামহারীর’জ্জ অত্যন্ত শীতল।
এখানে ‘গসাক্ব’ অর্থ হবে চাঁদ। কেননা মাতা মহোদয়া আয়েশার বর্ণনায় এসেছে, এক রাতে রসুল স. আমার হাত ধরলেন এবং চাঁদের দিকে দৃষ্টিপাত করে বললেন, আয়েশা! আল্লাহ্র নিকট ওই গসিক্বের অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা কোরো, যখন তা অস্তগামী হয়। স্বসূত্রে বাগবী।
‘ইজা ওয়াক্বাব’ অর্থ যখন তা গভীর হয়। অর্থাৎ যখন তা হতে থাকে দ্যুতিহীন, অদৃশ্য। বলা বাহুল্য, চাঁদ ক্ষয় হতে থাকে পূর্ণ কিরণ্ময় হওয়ার পর থেকে, পূর্ণিমা রজনী থেকে।
হজরত ইবনে আব্বাস, হাসান বসরী এবং মুজাহিদ বলেছেন ‘গাসাক্ব’ অর্থ রাত্রি। অর্থাৎ রাত্রির আগমনলগ্নে তার অন্ধকার আবৃত করে অপসৃয়মান আলোকে। ইবনে জায়েদ বলেছেন ‘গাসাক্ব’ অর্থ আকাশের নিচের দিকে অপসৃয়মান সপ্তর্ষিমণ্ডল, স্বল্প সময়ের মধ্যে যা চলে যায় অস্তাচলে। কারণ মানুষ বলে থাকে, সপ্তর্ষিমণ্ডলের অস্তগমনকালে প্রকোপ বাড়ে বিপদাপদের। আর সে বিপদ কেটে যায় তার উদয়কালে।
এরপরের আয়াতে (৪) বলা হয়েছেজ্জ ‘ওয়া মিন শাররিন্ নাফ্ফাছাতি ফীল উ’ক্বাদ’ (এবং অনিষ্ট হতে সমস্ত নারীর, যারা গ্রন্থিতে ফুৎকার দেয়)। এখানকার
তাফসীরে মাযহারী/৬৪৭
‘নাফ্ফাছাতি’ স্ত্রীলিঙ্গের বহুবচনীয় শব্দরূপ। শব্দটির বিশেষ্যপদ এখানে রয়েছে অনুক্ত। অর্থাৎ যাদুকর নর-নারী, যারা মন্ত্রতন্ত্র পাঠ করে এবং রসুল স. এর উপরে যাদু করার সময় সুতায় ফুৎকার দেয়। হজরত আবু উবায়দা বলেছেন, লবীদের নির্দেশে তার কন্যারাই এরকম করেছিলো।
শেষ আয়াতে (৫) বলা হয়েছে ‘ওয়া মিন শাররি হাসিদিন ইজা হাসাদ’ (এবং অনিষ্ট থেকে হিংসুকের, যখন সে হিংসা করে)। এরকম করে বলা হয়েছে এখানে একথাটি বুঝাতে যে, মনের ভিতরের গোপন হিংসা দগ্ধ করে হিংসাকারীকে। কিন্তু অন্যের জন্য তা ক্ষতিকর হয় তখন, যখন সে হিংসা প্রকাশ পায়। অর্থাৎ যখন সে অন্যের উপরে হিংসা চরিতার্থ করে।
উল্লেখ্য ‘তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে’ (আয়াত ২) কথাটির মধ্যে সব ধরনের অনিষ্টতার কথা বলা হয়েছে। তার পরেও বলা হয়েছে ‘গসিক্ব’ ‘নাফ্ফাছাত’ ও ‘হাসিদ’ এই তিনটি অনিষ্টতার কথা। এর কারণ হল , রসুল স. এর উপরে যে যাদু করা হয়েছিলো তার মধ্যে ওই তিন ধরনের অনিষ্টতাই ছিলো। ছিলো যাদু, প্রতারণা ও হিংসা। আবার ‘হাসিদিন’ ও ‘গাসিক্বিন’ অনির্দিষ্টবাচক এবং ‘আন নাফ্ফাছাতি’ নির্দিষ্টবাচক। এভাবে এখানে তাদেরকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করার কারণ হচ্ছে, লবীদের কন্যারা ছিলো নির্দিষ্ট ব্যক্তি। তাই তাদের অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় যাচনা করা হয়েছে নির্দিষ্টবাচক শব্দরূপের মাধ্যমে। রসুল স. এর প্রতি হিংসাপোষণকারীরা অসংখ্য। আর তারা সুচিহ্নিতও নয়। তাই তাদের অনিষ্টতা থেকে রক্ষা করার প্রার্থনা উপস্থাপন করা হয়েছে অনির্দিষ্টবাচক শব্দরূপের মাধ্যমে।
হজরত উকবা ইবনে আমের বলেছেন, আমি একবার রসুল স. এর পবিত্র সাহচর্যে উপসি'ত হয়ে বললাম, হে আল্লাহ্র প্রিয়তম রসুল! আমি সুরা ইউসুফ ও সুরা হুদ পাঠ করে থাকি। তিনি স. বললেন, আল্লাহ্র সঙ্গে সমর্ক রক্ষাকারীরূপে সুরা ফালাক্বের মতো আর কিছু নেই। আহমদ, দারেমী, নাসাঈ। আল্লাহ্ই ভালো জানেন।
Subscribe to:
Posts (Atom)