Tuesday, 12 August 2008

সূরা ফালাক্ব

মহাপুণ্যতীর্থ মদীনাভূমিতে অবতীর্ণ হয়েছে এই সুরাখানি। এর মধ্যে আয়াত রয়েছে ৫টি।
আবু সালেহ সূত্রে কালাবী বর্ণনা করেছেন, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, একবার রসুল স. কঠিন অসুখে পড়লেন। এক রাতে স্বপ্নে দেখলেন, দুজন ফেরেশতা এলো। একজন বসলো তাঁর শিয়রে, আর একজন পায়ের কাছে। দুজনের মধ্যে কথোপকথন শুরু হলো এভাবে এঁর কী হয়েছে? ইনি তো অসুস্থ। কী অসুখ? যাদুগ্রস্ততা। কে যাদু করেছে? ইহুদী লবীদ ইবনে আসাম। কীভাবে? চামড়ার ফিতায় যাদুমন্ত্র করে পাথর চাপা দিয়ে রেখে দেওয়া হয়েছে অমুক কূপের ভিতরে। যাও, সেটিকে বের করে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দাও। রসুল স. এর তন্দ্রা ভেঙে গেলো। ভোর হলো। রসুল স. হজরত আম্মার ইবনে ইয়াসার ও তাঁর কয়েকজন সঙ্গীকে কথিত কূপে পাথরচাপা দিয়ে রাখা যাদুকৃত ফিতাটি উদ্ধার করে আনতে বললেন। তাঁরা অল্পক্ষণের মধ্যেই নির্দেশ প্রতিপালন করলেন। যাদুর ফিতাটি এনে দেখা গেলো, তার মধ্যে পেঁচানো রয়েছে একটি সূতা। সূতাটিতে রয়েছে এগারোটি গিঁট। এই ঘটনাটির প্রেক্ষিতেই অবতীর্ণ হয় সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস। এই দুই সুরায় আয়াত রয়েছে মোট এগারোটি। তিনি স. একটি করে আয়াত পড়তে লাগলেন। সঙ্গে সঙ্গে খুলে যেতে লাগলো একটি করে গিঁট। বায়হাকী তাঁর দালায়েলুন নবুওয়াত গ্রন্থে এরকমই বিবরণ দিয়েছেন।
তাফসীরে মাযহারী/৬৪৩
আবু নাঈম তাঁর দালায়েল গ্রন্থে আবু জাফর রাজী সূত্রে লিখেছেন, হজরত আনাস বলেছেন, একবার ইহুদীরা রসুল স. এর উপরে কিছু একটা করলো। তিনি স. পীড়িত হয়ে পড়লেন। শয্যাশায়ী রসুলের নিকটে অস্থির হয়ে যাতায়াত করতে লাগলেন সাহাবীগণ। এমন সময় একদিন হজরত জিবরাইল আর্বিভূত হলেন সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস নিয়ে। রসুল স. সুরা দুটি দিয়ে তাবীজ বানালেন। সঙ্গে সঙ্গে দূর হয়ে গেলো তাঁর পীড়া।
বাগবী লিখেছেন, মাতা মহোদয়া আয়েশা এবং হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, রসুল স. এর ছিলো এক ইহুদী অনুচর। ইহুদীরা তাকে হাত করলো। তার মাধ্যমে তারা সংগ্রহ করতে সক্ষম হলো রসুল স. এর মস্তকের কেশ এবং তাঁর চিরুনীর কয়েকটি দাঁত। ওগুলোর সাহায্যে তারা রসুল স. এর উপরে যাদু করে বসলো। এ অপকর্মের মূল হোতা ছিলো লবীদ ইবনে আসাম। এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করেই অবতীর্ণ হয় সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস।
স্বসূত্রে বাগবী লিখেছেন, জননী আয়েশা সিদ্দিকা বলেছেন, রসুল স. একবার রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। রোগের প্রকোপে কখনো কখনো স্মৃতিভ্রমও ঘটতে লাগলো তাঁর। তাই কখনো কোনো কাজ না করেও তাঁর মনে হতো করেছেন। তিনি স. আল্লাহ্‌ সকাশে বিশেষভাবে দোয়া প্রার্থনা করলেন। তারপর বললেন, আল্লাহ্‌র নিকট থেকে যা জানার দরকার ছিলো, তা আমি জেনে নিয়েছি। আমি বললাম, হে আল্লাহ্‌র রসুল! খুলে বলুন তো বিষয়টা কী? বললেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম, দুজন লোক এলো। একজন দাঁড়ালো আমার মাথার দিকে, আর একজন পায়ের দিকে। একজন বললো, ইনি কষ্ট পাচ্ছেন কেনো? অন্যজন বললো, ইনি যাদুগ্রস্ত। প্রথমজন বললো, কে যাদু করেছে? দ্বিতীয়জন বললো, ইহুদী লবীদ ইবনে আসাম। প্রথম জন কিসের উপর। দ্বিতীয়জন চিরুনী, চিরুনীতে লেগে থাকা চুল এবং পুরুষ খেজুর বৃক্ষের পুষ্পগুচ্ছের উপর। প্রথমজন ওগুলো কোথায় রাখা হয়েছে? দ্বিতীয়জন বনী যুরাইকের কূপ যরওয়ানের মধ্যে। জননী বললেন, স্বপ্ন দেখার পর রসুল স. ওই কূপের পাশে উপস্থিত হলেন। ফিরে এসে বললেন, আল্লাহ্‌র শপথ! কূপটির পানি তো মেহেদীর মতো লাল। আর সেখানকার খেজুর গাছগুলো দেখতে ভূতের মতো। আমি বললাম, হে আল্লাহ্‌র প্রিয়তম জন! আপনি ওই লোকটিকে প্রকাশ্যে অপরাধী বলে চিহ্নিত করছেন না কেনো? তিনি স. বললেন, আল্লাহ্‌ তো আমাকে সুস্থ করে দিয়েছেন। তাছাড়া জনগণের মধ্যে একটা বিশৃখলার সৃষ্টি হোক, তা আমি চাই না। বাগবী লিখেছেন, এক বর্ণনায় এসেছে, যাদুর পুঁটলিটি ছিলো কূপের তলদেশে একটি পাথরের নিচে চাপা দেওয়া অবস্থায়। লোকেরা তা তুলে আনলো। দেখা গেলো ওটার মধ্যে রয়েছে রসুল স. এর মাথার চুল ও চিরুনীর দাঁত।
হজরত ইয়াজিদ ইবনে আরকাম থেকে স্বসূত্রে বাগবী বর্ণনা করেছেন, এক ইহুদী রসুল স.কে যাদু করেছিলো। ফলে তিনি স. খুব ক্লেশ ভোগ করছিলেন। এমতাবস্থায় হজরত জিবরাইল এসে তাঁকে জানালেন, এক ইহুদী আপনার উপর
তাফসীরে মাযহারী/৬৪৪
যাদু করেছে। তিনি স. হজরত আলীকে পাঠিয়ে যাদুর সরঞ্জামগুলো উদ্ধার করে আনলেন। গ্রন্থিযুক্ত একটি সূতাতেই ছিলো যাদুর মূল মন্ত্র। একটা একটা করে গ্রন্থি খোলা হতে লাগলো। তিনিও একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠতে লাগলেন। এভাবে সকল গ্রন্থি খোলা হলে তিনি লাভ করলেন পূর্ণ নিরাময়। মনে হলো তিনি যেনো বন্ধনমুক্ত হলেন। বিষয়টি তিনি স. ওই ইহুদীকে জানতেই দিলেন না।
জননী আয়েশা থেকে বায়হাকীর দালায়েল গ্রন্থে এবং ইবনে মারদুবিয়ার বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, এক ইহুদী রসুল স. এর উপর যাদু করেছিলো। একটি তন্তুতে এগারোটি গিরা দিয়ে সে ওই তন্তুটিকে পাথরচাপা দিয়ে রেখেছিলো একটি কুয়ার তলায়। ফলে তিনি স. অপ্রকৃতিস্থিত হয়ে পড়লেন। কষ্ট পেতে লাগলেন খুব। এমন সময় নাজিল হলো সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস। হজরত জিবরাইল এসে যাদুর স্থানের সন্ধান দিলেন। রসুল স. হজরত আলীর দ্বারা তন্তুটি উদ্ধার বর্ণনায় এসেছে, তিনি স. যাদুরোগে কষ্ট পেয়েছিলেন দীর্ঘ ছয়টি মাস। তার মধ্যে তিন রাতের কষ্ট ছিলো অসহনীয়। ওই সময়েই অবতীর্ণ হয় ফালাক্ব ও নাস।
মুসলিম লিখেছেন, হজরত আবু সাঈদ খুদরী বলেছেন, হজরত জিবরাইল তখন উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কি খুব কষ্ট হচ্ছে? তিনি স. বললেন, হ্যাঁ। হজরত জিবরাইল বললেন, পাঠ করুন বিসমিল্লাহি আরক্বীকা মিন কুললি শাই ইয়ুজীকা মিন শাররি কুললি নাফস্‌ আও আইনিন হাসিদ আল্লাহু ইয়াশফীকা বিসমিল্লহি আরক্বীক।

No comments: