Saturday, 4 October 2008

সূরা কাফিরূন

৬ আয়াতবিশিষ্ট এই সুরাখানিও অবতীর্ণ হয়েছে মহাপুণ্যধাম মক্কায়।

হজরত ইবনে আব্বাস থেকে তিবরানী ও ইবনে আবী হাতেম বর্ণনা করেছেন, একবার কুরায়েশেরা রসুল স.কে আহ্বান জানালো এবং বললো, মোহাম্মদ! শোনো, আমরা তোমাকে এতো ধন-সম্পদ দিবো, যাতে করে তুমি হয়ে যেতে পারো মক্কার সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদপতি। আর যে রমণীকে তুমি বিয়ে করতে চাও, তার সঙ্গেই আমরা তোমাকে দিবো পরিণয়বদ্ধ করে। বিনিময়ে আমরা শুধু চাই, তুমি আমাদের দেব-দেবীদের দুর্নাম করবে না। অথবাঃ এক বৎসর তুমি আমাদের দেব-দেবীদের উপাসনা যদি করো, তবে পরের বছর আমরা উপাসনা করবো তোমার আল্লাহ্‌র। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের মধ্যে আর কোনো দ্বন্দ্ব ফ্যাসাদ থাকবে না। রসুল স. বললেন, দেখি! আমার পরম প্রভুপালয়িতা এ সম্পর্কে কী নির্দেশ দান করেন। ওয়াহাবের বক্তব্যানুসরণে আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, কুরায়েশরা বলেছিলো, তোমার ও আমাদের মধ্যে মীমাংসা হোক এভাবেঃ এক বছর তুমি আমাদের মাবুদ গুলোর ইবাদত করো, আর এক বছর তোমার আল্লাহ্‌র ইবাদত করবো আমরা। এভাবেই বছরের পর বছর বেঁচে থাকতে পারে আমাদের উভয়ের ধর্মমত।

সাঈদের বর্ণনা থেকে ইবনে আবী হাতেম উল্লেখ করেছেন, একবার ওলীদ ইবনে মুগীরা, আস ইবনে ওয়াইল, আসওয়াদ ইবনে আবুল মুত্তালিব এবং উমাইয়া ইবনে খালফ রসুল স. সকাশে উপস্থিত হয়ে প্রস্তাব রাখলো, মোহাম্মদ! এসো আমরা এক সঙ্গেই সব করি। পূজা করি আমাদের দেব-দেবীদের এবং তোমার আল্লাহ্‌র। তাদের এমতো অপবচনের প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়ঃ

সূরা কাফিরূনঃ আয়াত ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬

১. বল, ‘হে কাফিররা!
২. ‘আমি তাহার ‘ইবাদত করি না যাহার ইবাদত তোমরা কর
৩. এবং তোমরাও তাঁহার ইবাদতকারী নহ যাঁহার ইবাদত আমি করি,
৪. ‘এবং আমি ইবাদতকারী নহি তাহার, যাহার ইবাদত তোমরা করিয়া আসিতেছ।
৫. ‘এবং তোমরাও তাঁহার ইবাদতকারী নহ, যাঁহার ইবাদত আমি করি।
৬. ‘তোমাদের দীন তোমাদের, আমার দীন আমার।’

প্রথমে বলা হয়েছেঃ ‘ক্বুল ইয়া আয়্যুহাল কাফিরূণ’। একথার অর্থঃ হে আমার রসুল! আপনি তাদেরকে সম্বোধন করে বলুন, হে সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীরা! এভাবে এখানে সম্বোধন করতে বলা হয়েছে তাদেরকে, যারা রসুল স. এর কাছে উত্থাপন করেছিলো সত্য-মিথ্যার মিশ্রণের প্রস্তাব। আল্লাহ্‌পাক জানতেন, তারা চিরসত্যপ্রত্যাখ্যানকারী। তাই তিনি রসুল স. কে এখানে সম্বোধন করতে বলেছেন এভাবে।

পরের আয়াতে বলা হয়েছেঃ ‘আমি তার ইবাদত করি না, যার ইবাদত তোমরা করো’(২)। একথার অর্থঃ তোমরা ইবাদত করো অলীক দেব-দেবীদের। ওরকম অযথার্থ ইবাদত তো আমি করি না। করবোও না কোনো কালে। এখানে বক্তব্যটির শুরুতে ব্যবহার করা হয়েছে নেতিবাচক ‘লা’। এভাবে এখানে একথাটিই বুঝানো হয়েছে যে, অংশীবাদিতা ও বিশ্বাসের মিশ্রণ চিরনিষিদ্ধ। বায়যাবী লিখেছেন, শুধু ‘লা’ (না) ভবিষ্যতকালার্থক। অর্থাৎ এখন যা হচ্ছে না, তা ভবিষ্যতেও হবে না।
এরপরের আয়াতদ্বয়ে বলা হয়েছেঃ ‘এবং তোমরা তার ইবাদতকারী নও, যার ইবাদত আমি করি (৩) এবং আমি ইবাদতকারী নই তার, যার ইবাদত তোমরা করে আসছো’ (৪)। এই বক্তব্যটিও ভবিষ্যতকালজ্ঞাপক। অর্থাৎ আমি যে এক-একক-অবিভাজ্য সত্তার ইবাদত করি, তাঁর ইবাদত তোমরা যেমন এখন করো না, তেমনি করবে না ভবিষ্যতেও।

‘মান’ শব্দটি ব্যবহৃত হয় বিবেকসম্পন্নদের ক্ষেত্রে এবং বিবেকহীনদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় ‘মা’। কিন্তু এখানে বিবেকবানদের ক্ষেত্রে ‘মা’ ব্যবহৃত হয়েছে কেবল শাব্দিক সামঞ্জস্য রক্ষাকল্পে। অর্থাৎ এখানে ‘মা’ আনা হয়েছে আগের আয়াতের ‘মা’ এর সঙ্গে সমতা রক্ষার্থে। এভাবে লক্ষ্য রাখা হয়েছে কেবল পারসžরিক উপাস্যের গুণাগুণের প্রতি। বিবেকবান-বিবেকহীনের প্রসঙ্গটিকে সামনে আনা হয়নি। ‘মা’ এখানে ব্যবহৃত হয়েছে ধাত্যর্থে। এভাবে বক্তব্যটি দাঁড়িয়েছেঃ আমি যেমন কোনোদিন তোমাদের কাল্পনিক দেব-দেবীদের পূজা করবো না, তেমনি তোমরাও কোনোদিন আরাধনা করবে না মহাসৃষ্টির মহাপ্রভুপালয়িতার।

এরপরের আয়াতে (৫) বলা হয়েছেঃ ‘এবং তোমরাও তাঁর ইবাদতকারী নও, যাঁর ইবাদত আমি করি’। বাক্যটি আগের বাক্যেরই পুনরাবৃত্তি। অধিকাংশ ভাষাবিদ বলেন, কোরআন যেহেতু আরবী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে, সেহেতু এর প্রকাশভঙ্গি হবে আরবী ভাষার রীতি অনুসারেই। সম্বোধনরীতিও হবে তেমনই। আর আরবীতে বার বার একই কথা বলা হয় বক্তব্যের গুরুত্ব প্রকাশার্থে। যেমন বাক্যসংকোচনের উদ্দেশ্য থাকে বক্তব্যসংক্ষেপণ। এখানেও সেরকমই করা হয়েছে। কুরতুবী বলেছেন, এখানে একত্ববাদ ও বহুত্ববাদের বক্তব্যগত সম্মিলন ঘটার ফলে বাক্যগুলিও হয়ে পড়েছে পুনরাবৃত্তিমূলক। কেননা বক্তব্যটি এসেছে কাফের কুরায়েশদের একটি নির্দিষ্ট অপপ্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে। তারা বলেছিলো, একবছর আমরা হবো বহুত্ববাদী, আর এক বছর একত্ববাদী। কিন্তু এরকম হওয়া যে কোনোক্রমেই সম্ভব নয়, সে কথাটিও এখানে বার বার উচ্চারণ করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরকমও বলা হয়েছে যে, প্রতিটি বাক্যের প্রথম ‘মা’ যোজক এবং পরের ‘মা’ ধাতুমূলক। অর্থাৎ উপাস্যের একিভূতী এবং ইবাদতের একিভূতীর অবাস্তবতা বুঝানোই এখানে উদ্দেশ্য।

শেষোক্ত আয়াতে (৬) বলা হয়েছেঃ ‘তোমাদের দ্বীন তোমাদের, আমার দ্বীন আমার’। এই আয়াতের দু’টি বাক্যই বিজ্ঞপ্তিমূলক। কিন্তু এমতো ভাবনার কোনো অবকাশ নেই যে, বক্তব্যটির (তোমাদের দ্বীন তোমাদের) দ্বারা এখানে কাফেরদের কুফরীর ব্যাপারে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, অথবা মুসলমানদেরকে জেহাদ করতে নিষেধ করা হয়েছে। বরং বলা যেতে পারে, এই আয়াতে প্রকাশ করা হয়েছে পূর্ববর্তী বক্তব্যের গুরুত্ব ও পরিণতিকে। সুতরাং এই আয়াত দ্বারা জেহাদের আয়াতকে রহিত করা হয়েছে, এরকম ভাবা যেতেই পারে না। কুফরী যেহেতু কল্যাণকর নয়, সেহেতু এরকম চিন্তাও অসমীচীন যে, সমঝোতার মাধ্যমে এখানে ইমানদার ও কাফেরদেরকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে স্ব স্ব অবস্থানে থাকতে। তাই তো আমরা দেখতে পাই, এর পরেও রসুল স. বার বার কাফের কুরায়েশদেরকে ইমান ও ইসলামের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তারা তাঁকে এবং তাঁর প্রিয় সহচরবর্গকে দিয়েছে নানা প্রকারের যাতনা। সুতরাং আলোচ্য আয়াতের মর্মার্থ এরকম হওয়াই সমীচীন যেঃ তোমরা প্রতিফল লাভ করবে তোমাদের কৃতকর্মের এবং আমি লাভ করবো আমার কৃতকর্মের প্রতিফল।

ইতোপূর্বে সুরা যিলযালের তাফসীরের একস্থানে হজরত আনাস ও হজরত ইবনে আব্বাসের এক হাদিসে বলা হয়েছে, রসুল স. বলেছেন, পুণ্যের দিক দিয়ে সুরা কাফিরূন সমগ্র কোরআনের এক চতুর্থাংশের সমান। জননী আয়েশা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, কতোই না উত্তম হতো, যদি ফজরের দুই রাকাত সুন্নত নামাজে পাঠ করা হতো সুরা কাফিরূন এবং সুরা ইখলাস। ইবনে হিশাম। ওরওয়া ইবনে নওফেল ইবনে হজরত মুয়াবিয়া বর্ণনা করেছেন, আমার পিতা একবার রসুল স.কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, হে আল্লাহ্‌র বার্তাবাহক! আমাকে এমন একটি সুরা শিক্ষা দিন, যা আমি পাঠ করতে পারি রাতে শয্যাগ্রহণকালে। তিনি স. বলেছিলেন, সুরা কাফিরূন পাঠ করো। কেননা এতে রয়েছে অংশীবাদিতার প্রতি তীব্র অনীহা।

হজরত যোবায়ের বর্ণনা করেছেন, রসুল স. একবার আমাকে বললেন, তুমি কি চাও, প্রবাসকালে তোমার বাসস্থান হোক সর্বোন্নত এবং পাথেয় হোক সর্বাধিক? আমি বললাম, অবশ্যই। তিনি স. বললেন, সর্বদা পাঠ কোরো সুরা কাফিরূন, ইখলাস, নাসর, ফালাক্ব ও নাসঃ এই পাঁচটি সুরা। আর প্রতিটি সুরা আবৃত্তির শুরু থেকে শেষে পাঠ কোরো বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম। হজরত যোবায়ের বলেছেন, আমি ছিলাম বিত্তশালী। কিন্তু প্রবাসে আমি হয়ে যেতাম দুর্দশাকবলিত। পাথেয় হয়ে যেতো নিঃশেষ। কিন্তু যখন থেকে প্রবাসকালে আমি এই পাঁচটি সুরা পাঠ করতে শুরু করলাম, তখন থেকে দুর্দশা আমার নাগাল পেতো না। পাথেয় থাকতো প্রচুর। গৃহে প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত আমি প্রাচুর্যের মধ্যেই থাকতাম।

হজরত আলী বলেছেন, একবার রসুল স.কে দংশন করলো একটি বৃশ্চিক। তিনি স. সঙ্গে সঙ্গে লবণ ও পানি আনতে বললেন। আর ক্ষতস্থানে লবণ পানি প্রবাহিত করে দিতে দিতে দম করতে লাগলেন সুরা কাফিরূন, সুরা ফালাক, সুরা নাস পড়ে পড়ে। আল্লাহই সমধিক অবগত।

Friday, 3 October 2008

সূরা নাসর

তৃতীয় আয়াতে বলা হয়েছেঃ তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কোরো এবং তাঁর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা কোরো, তিনি তো তওবা কবুলকারী

এখানে ফাসাব্‌বিহ্‌ বিহামদি রব্বিকঅর্থ তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কোরোকথাটি প্রথম আয়াতের যখন’ (ইজা) শর্তের পরিণতিআর এখানকার বিহামদিকথাটির সম্পর্ক রয়েছে একটি অনুক্ত ক্রিয়ার সঙ্গেএভাবে কথাটি দাঁড়ায়ঃ হে আমার প্রিয়তম নবী! আপনি তখন পাঠ করুন সুবহানাল্লহি ওয়া বিহামদিহীঅর্থাৎ আল্লাহ্‌ আপনাকে যে অচিন্তনীয় মহাবিজয় দান করে আপনাকে অনুগৃহীত করলেন, তার জন্য আপনি বর্ণনা করুন তাঁর প্রশংসা, পবিত্রতা ও মহিমা

হজরত আনাস বলেছেন, মহানবী স. যখন মহাবিজয়ীর বেশে মক্কা নগরীতে প্রবেশ করেছিলেন, তখন জনতা তাঁর অতুলনীয় মর্যাদা ও সম্ভ্রম দর্শন করে বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলোআর তিনি স. এ দৃশ্য দেখে মনে মনে আল্লাহ্‌কে জানাচ্ছিলেন অসংখ্য কৃতজ্ঞতা, যা প্রকাশ পাচ্ছিলো তাঁর বাহ্যিক অবয়বেওতিনি স. তাঁর মস্তক মোবারক করে রেখেছিলেন নিম্নমুখীমনে হচ্ছিলো তা বুঝি স্পর্শ করে আছে উটের গদিঅত্যুত্তম সূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন হাকেমহজরত আবু হোরায়রা থেকে আবু ইয়ালা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. এর সবিনয় অবনমিত মস্তক তখন স্পর্শ করেছিলো তাঁর উটের আসনের মধ্যবর্তী স্থানআর যখন লোকেরা দলে দলে এসে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করলো, তখন তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে উচ্চারণ করেছিলেন, হে আমার পরমতম আরাধ্য! পারলৌকিক জীবনই হচ্ছে প্রকৃত জীবন

ওয়াস্‌তাগফিরহুঅর্থ এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কোরোএকথার অর্থঃ হে আমার প্রিয়তম রসুল! আপনি আপনার উম্মতের প্রতি অতিমমতাময়তার কারণে কখনো কখনো অত্যুৎকৃষ্ট আমল ছেড়ে গ্রহণ করেছিলেন কেবল উৎকৃষ্ট আমলকে, আপনার অতুলনীয় মর্যাদার পক্ষে যা ছিলো কিঞ্চিত অনুত্তমসে কারণে আপনি আজ আমা সকাশে মার্জনাপ্রার্থনা করুনঅথবাঃ আপনি ক্ষমাপ্রার্থনা করুন আপনার উম্মতের জন্যকেননা তাদের মধ্যে অনেকেই তো হবে গোনাহ্‌গারউল্লেখ্য, এমতো নির্দেশনার কারণেই রসুল স. প্রতিদিন সত্তরবার ক্ষমাপ্রার্থনা করতেনকোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে একশতবার ক্ষমা প্রার্থনা করার কথাএরূপ হাদিস হজরত আবু হোরায়রা, হজরত আনাস এবং হজরত শাদ্দাদ ইবনে আউস থেকে বর্ণনা করেছেন বোখারী, নাসাঈ, ইবনে মাজা, তিবরানী ও আবু ইয়ালা

লক্ষণীয়, এখানে ক্ষমাপ্রার্থনা করার আগে উল্লেখ করা হয়েছে প্রশংসাসহ পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করার কথাবিষয়টি বিসদৃশ মোটেও নয়কেননা এটাই হচ্ছে অবরোহণের (নুজুলের) প্রকৃত পদ্ধতিআর এমতো পদ্ধতি কার্যকর করতে গেলে কিছু না কিছু ভুল হতেই পারেতাই সব শেষে বলা হয়েছে ক্ষমা প্রার্থনার কথাউল্লেখ্য, এভাবে এখানে রসুল স.কে লক্ষ্য করে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে মলত তাঁর উম্মতকেইতবে উম্মতের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার সুন্নত পদ্ধতি হচ্ছে, প্রার্থনার পূর্বে পাঠ করে নিতে হবে দরূদ শরীফ

ইন্‌নাহু কানা তাও্‌ওয়াবাঅর্থ তিনি তো তওবা কবুলকারীঅর্থাৎ আল্লাহ্‌ ক্ষমাপ্রার্থীদের প্রার্থনা গ্রহণকারী তখন থেকে, যখন থেকে তিনি তাদের উপরে চাপিয়ে দিয়েছেন আমানত বহনের ভারছায়লাবী লিখেছেন, রসুল স. এর কণ্ঠে একবার এই আয়াতের পাঠ শুনে হজরত ইবনে আব্বাস কেঁদে ফেললেনতিনি স. জিজ্ঞেস করলেন, কাঁদলে কেনো? তিনি জবাব দিলেন, এই সুরায় তো রয়েছে আপনার মহাতিরোধানের সংবাদতিনি স. বললেন, তুমি ঠিকই বলেছোবায়যাবী লিখেছেন, এই সুরায় বলা হয়েছে ইসলামের আহ্বানের পরিপূর্ণতার কথাসে কারণেই বলা হয়, এখানে রয়েছে রসুল স. এর অন্তিমযাত্রার সংবাদঅন্য এক আয়াতে বিষয়টি প্রকাশ করা হয়েছে এভাবে আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম....আর এখানকার ক্ষমাপ্রার্থনা করোকথাটির মধ্যে সুস্পষ্টরূপে একথাটি ফুটে উঠেছে যে, তাঁর মহা অভিযাত্রা সন্নিকটবর্তী

বোখারী বর্ণনা করেছেন, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, মান্যবর ওমর আমাকে মহান বদরযোদ্ধাগণের অন্তর্ভূত বলে মনে করতেনএকবার এক সাধু পুরুষ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি একে বদর যোদ্ধাগণের মধ্যে গণনা করেন কেনো? এতো আমাদের সন্তানদের বয়সীওমর জবাব দিলেন, আপনারা যাদেরকে ভালো বলে জানেন, এতো তাদেরই দলেরতিনি আরো বলেছেন, একবার খলিফা ওমর বদর যোদ্ধাদেরকে নিমন্ত্রণ দিলেনতার সঙ্গে নিমন্ত্রণ জানালেন আমাকেওসর্বসমক্ষে আমার পরিচয় তুলে ধরাই ছিলো তাঁর এমতো নিমন্ত্রণের উদ্দেশ্যপানাহারপর্ব শেষে তিনি নিমনিত অতিথিবর্গকে উদ্দেশ্য করে বললেন, বলুন তো দেখি, সুরা নাসর সম্পর্কে আপনারা কে কী জানেন? একজন বললেন, যেহেতু আল্লাহ্‌ আমাদেরকে সাহায্য করেছেন এবং বিজয় দান করেছেন, সেহেতু আমাদেরকে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনারআর একজন বললেন, আমি এ সম্পর্কে কিছুই জানি নাঅন্যেরা রইলেন নীরবশেষে মান্যবর খলিফা আমাকে বললেন, এবার তুমি কী জানো, বলোআমি বললাম, সুরাখানি রসুল স. এর মহাতিরোভাবের ইঙ্গিতবাহী, আল্লাহ্‌ এখানে তাঁর রসুলকে জানাচ্ছেনঃ হে আমার প্রিয়তম রসুল! আমার সাহায্য সমাগতমক্কাবিজয়ও সুসম্পন্নসুতরাং আপনি আল্লাহ্‌র সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করুন, তাঁর সকাশে ক্ষমাপ্রার্থনা করুন আপনার প্রিয় উম্মতের জন্য, যিনি পরম ক্ষমাপরবশ ও ক্ষমাপ্রার্থীদের প্রার্থনা গ্রহণকারীআর আপনি প্রস্তুতি গ্রহণ করুন পরকালযাত্রারসে পরমলগ্ন যে অত্যাসন্ন খলিফা মহোদয় আমার কথা শুনে বললেন, বৎস! তুমি যা জানো, আমিও তা-ই জানি

ইমাম আহমদের বর্ণনায় এসেছে, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, যখন সুরা ইজা জ্বাআঅবতীর্ণ হলা, তখন রসুল স. আমাকে একানেডেকে বললেন, আমাকে এবার অন্তিমযাত্রার সংবাদ দেওয়া হলো

হজরত আনাস থেকে তিরমিজি বর্ণনা করেছেন, সুরা ইজা জ্বাআ নাসরুল্লহ্‌সমগ্র কোরআনের এক চতুর্থাংশজননী আয়েশা থেকে বোখারী উল্লেখ করেছেন, রসুল স. তাঁর রুকু ও সেজদায় পাঠ করতেন সুবহানাকা আল্লহুম্মা ওয়া বিহামদিকা আল্লহুম্মাগ্‌ফিরতাঁর নিকট থেকে মুসলিম বর্ণনা করেছেন, রসুল স. অত্যধিক পরিমাণে পাঠ করতেন সুবহানাল্লহি ওয়া বিহামদিহী আস্‌তাগফিরুল্লহা ওয়া আতূবু ইলাইহিরসুল স. বলেছেন, আমার পরম প্রভুপালয়িতা আমাকে বললেন, অচিরেই আপনি আপনার উম্মতের মধ্যে দেখতে পাবেন একটি নিদর্শনতখন পাঠ করবেন সুবহানাল্লহি ওয়া বিহামদিহী আস্‌তাগফিরুল্লহা ওয়া আতূবু ইলাইহিআমি সে নিদর্শন প্রদর্শন করেছিআর তা হচ্ছে ইজা জ্বাআ নাসরুল্লহি...... ইন্‌নাহু কানা তাওওয়াবাহাসান বসরী বলেছেন, যখন রসুল স. এর অন্তিমযাত্রার সময় হলো, তখন আল্লাহ্‌পাক তাঁকে জানালেন, আপনার শেষ বিদায়ের সময় অতীব সন্নিকটবর্তীসুতরাং আপনি অধিক হারে বর্ণনা করতে থাকুন আমার সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমাঅভিমুখী হন কেবল আমার, যেনো আপনার পৃথিবীর জীবনের সমাপ্তি ঘটে অত্যুত্তম পুণ্যসম্ভার সহযোগেনিশ্চয় আমি আমার প্রতি অভিমুখীদেরকে গ্রহণ করি পরম সমাদরেকাতাদা ও মুকাতিল বলেছেন, এই সুরা অবতীর্ণ হওয়ার পর রসুল স. পৃথিবীর আলো-ছায়ায় বাস করেছিলেন আর মাত্র দুইটি বছর

সূরা নাসর

এরপর রসুল স. কাবাগৃহের চাবি সংগ্রহের জন্য হজরত বেলালকে পাঠিয়ে দিলেন চাবিরক্ষক ওসমানের কাছেওসমান বললো, চাবি তো আমার মায়ের কাছেএকথা বলেই সে তার মায়ের কাছে চাবি চাইলোতার মা বললো, লাত ও উজ্‌জার শপথ! আমি কাবার চাবি তোমার হাতে কখনোই দিবো নাসে বললো, মা! চাবিটা দিয়ে দাওআজ লাত উজ্‌জা কেউ নেইচাবি না দিলে আমার গর্দান তো যাবেই, আমার এই ভাইয়ের গর্দানও আস্ত থাকবে নাওদিকে তাঁদের ফিরে আসতে বিলম্ব হচ্ছে দেখে রসুল স. সেখানে পাঠিয়ে দিলেন হজরত আবু বকর সিদ্দীক এবং হজরত ওমর ফারুককেতাঁরা ওসমানের বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে তাকে ডাকলেনতাঁদের কণ্ঠস্বর শুনে তার মা বললো, ওসমান! এই নাও চাবিওদের হাতে চাবি দেওয়ার চেয়ে তোমার হাতে দেওয়াই ভালোএভাবে চাবি উদ্ধার হলো এবং তা যথাসময়ে হস্তগত হলো রসুল স. এরতিনি স. ওই চাবি দিয়ে কাবাগৃহের বন্ধ তালা খুললেনওসমান ও তালহা বললো, হে আল্লাহ্‌র রসুল! এ অধিকার তো ছিলো আমাদেরইতিনি স. তাদের কথায় ভ্রূক্ষেপ করলেন না

এরপর রসুল স. হজরত ওমরকে আদেশ করলেন, কাবাগৃহের ভিতর থেকে সমস্ত বিগ্রহ ও চিত্র অপসারিত করোনির্দেশ প্রতিপালিত হলোশুরু হলো ধোয়া-মোছার কাজএভাবে একসময় আল্লাহ্‌র ঘর ও তৎসন্নিহিত প্রাঙ্গণ থেকে চিরতরে অপসারিত হলো বিগ্রহ-ধর্ম-সংস্কৃতির অপবিত্র চিহ্নাবলীরসুল স. হজরত জায়েদ এবং হজরত তালহাকে নিয়ে কাবাগৃহের ভিতরে প্রবেশ করলেনমধ্যখানে দাঁড়িয়ে পাঠ করলেন দুই রাকাত নামাজবললেন, এটাই কেবলাতারপর দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেনবললেন, আল্লাহ্‌ ব্যতীত আর কোনো উপাস্য নেইতিনি তাঁর প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিকে সত্যে পরিণত করেছেনতাঁর বান্দাকে বিজয়ী করেছেন তাঁর প্রতিপক্ষীয়দের উপরশোনো হে জনতা! আজ থেকে মূর্খতার যুগের সকল অপপ্রথা অবলোপিত হলোপরিত্যক্ত হলো প্রতিশোধমূলক রক্তের অধিকারআর সুদ ইত্যাদি পাওনা-দেনাকেও আজ আমি পদদলিত করলামসর্বপ্রথম আমি নিজে রবীয়া ইবনে হারেছের রক্তের দাবি প্রত্যাহার করে নিলামতবে কাবাগৃহের রক্ষণাবেক্ষণ ও হজযাত্রীদের পানি সরবরাহের দায়িত্বের কোনো পরিবর্তন হবে নাযারা এতোদিন ধরে এ দায়িত্ব পালন করতো, তারাই থাকবে তাদের স্ব স্ব দায়িত্বে

আরো শোনো, লাঠি-সোটার আঘাতে নিহত, অথবা ভুলক্রমে, কিংবা ইচ্ছাকৃত হত্যাসদৃশ হত্যার রক্তপণ একশত উটতার মধ্যে চল্লিশটিকে হতে হবে গর্ভবর্তীঅংশীদারকে লক্ষ্য করে ওছিয়ত করা যাবে নানবজাতক হবে তার, যার শয্যায় সে জন্মগ্রহণ করেছেব্যভিচারের শাস্তি মৃত্যু পর্যন্ত প্রস্তরাঘাতস্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রী তার সম্পদ অন্যকে দিতে পারবে নাঅমুসলিমদের বিপক্ষে সকল মুসলমান একটি বাহুর মতোসত্যপ্রত্যাখ্যানকারীদের বিপক্ষে কোনো বিশ্বাসী অথবা আশ্রিত সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীকে (জিম্মিকে) হত্যা করা যাবে নাবিপরীত ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে অংশীদারিত্ব অচলজাকাত-সংগ্রাহকরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে জাকাত সংগ্রহ করবেজাকাতদাতাদেরকে জাকাত-দপ্তরে ডেকে আনা যাবে নাতারাও জাকাত-সংগ্রাহকদেরকে উত্যক্ত করতে পারবে নাকোনো রমণীর মা বা খালাকে বিবাহ করার পর আর তাকে বিবাহ করা যাবে না

সাক্ষী উপস্থিত করা দাবিদারদের দায়িত্বসাক্ষী উপস্থিত না করতে পারলে শপথ করতে হবেশপথ কার্যকর করা হবে দাবি অস্বীকারকারীর উপরবিবাহ সিদ্ধঃ এমন কোনো পুরুষের সঙ্গে রমণীরা ভ্রমণে বের হতে পারবে নাফজর ও আসরের নামাজ সমাপন করার পর আর কোনো নফল নামাজ আদায় করা যাবে নাদুদিন রোজা রাখা নিষেধঃ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিননিষেধ মাত্র একটি লুঙ্গি, অথবা মাত্র একটি জামা পরিধানেরকেননা এতে করে লজ্জাস্থান উন্মুক্ত হওয়ার রয়েছে সমূহ সম্ভাবনাতেমনি নিষেধ একটি চাদর অথবা একটি কম্বল এমনভাবে পরিধান করাতে, যাতে দুই বাহু হয়ে যায় আবদ্ধ, যাতে প্রয়োজনের সময়েও হাত বের করা যায় না

হে কুরায়েশ জনগোষ্ঠী! আল্লাহ্‌ দয়া করে মূর্খতার যুগের অহমিকা ও জাত্যাভিমান থেকে তোমাদেরকে মুক্ত করেছেনমনে রেখো, তোমরা সকলে এক আদমের সন্তানআর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকেসুতরাং তোমাদের গর্ব করার কিছু নেইএরপর তিনি স. আবৃত্তি করলেন হে মানবজাতি! আমি তো তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে.....শেষ পর্যন্ত

এবার বলো, হে মক্কাবাসী! তোমরা আমার কাছ থেকে কীরূপ আচরণ আশা করো? জনতা জবাব দিলো, আপনি সজ্জন, সাধু, আপনার পিতা-পিতামহও ছিলেন এরকমইসুতরাং আপনার কাছ থেকে আমরা সেরকমই শিষ্টাচার আশা করিতিনি স. বললেন, আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেইআল্লাহ্‌ তোমাদেরকে ক্ষমা করুনতিনি তো দয়ার পারাবারযাও, তোমরা সকলেই মুক্তসভা শেষ হলোজনতা গাত্রোত্থান করলোতাদেরকে দেখে মনে হলো, যেনো তারা এই মাত্র উঠে এসেছে কবর থেকে

হজরত আবু হোরায়রা থেকে বোখারী বর্ণনা করেছেন, অজ্ঞতার যুগে বনী লাইছের জনৈক ব্যক্তি হত্যা করেছিলো বনী খাজাআর জনৈক ব্যক্তিকেমক্কা বিজয়ের দিবসে সুযোগ পেয়ে বনী খাজাআ তাদের অপ-প্রতিশোধ চরিতার্থ করলোতারা হত্যা করলো বনী লাইছের এক লোককেরসুল স. একথা জানতে পেরে তাঁর ভাষণে বললেন, হে জনতা! দ্যাখো, আবরাহাবাহিনীকে আল্লাহ্‌ এ শহরে প্রবেশই করতে দেননিঅথচ তিনি তাঁর রসুল ও তাঁর অনুগামীগণকে মক্কাবাসীদের উপরে বিজয়ী করেছেনভালো করে শুনে রাখো, আমার পূর্বে জোরপূর্বক মক্কায় প্রবেশ করে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নিএরকম অধিকার আমার পরেও কেউ পাবে নাআমার পূর্বে এখানে রক্তপাত ঘটানো কারো জন্য বৈধ ছিলো নাএরপরেও বৈধ হবে না কারো জন্যআর আমার জন্যও এ কাজ বৈধ ছিলো কেবল আজকের দিনের কিয়দংশের জন্যএরপর থেকে চিরদিনের মতো এখানে রক্তপাত হারামএখানকার বৃক্ষ, লতা-গুল্ম কিছুই কর্তন করা যাবে নাকারো পরিত্যক্ত সম্পদ জোরপূর্বক অধিকার করলেও নয়আরো শোনো, নরহত্যার বিনিময় রক্তপণ, অথবা হত্যাআবু শাহ নামক জনৈক ইয়েমেনী ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহ্‌র রসুলএকথাটা আমাকে লিখে দিনরসুল স. জনৈক সাহাবীকে নির্দেশ দিলেন বিধানটি লিখে দিতেএকজন কুরায়েশী দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহ্‌র প্রত্যাদেশবাহক! বৃক্ষ-লতা-গুল্ম কর্তনের বিধান থেকে ইজখের ঘাসকে বাদ দিলে ভালো হয়এটা আমাদের সাংসারিক প্রাত্যহিক কর্ম সমাধার জন্য অত্যাবশ্যকতিনি স. বললেন, ঠিক আছে, ইজখের ঘাস থেকে কর্তনের নিষিদ্ধতা উঠিয়ে নেওয়া হলো

এক বর্ণনায় এসেছে, এক লোক তখন দাঁড়িয়ে বললো, হে মহানবী! আমি এক রমণীকে রক্ষিতা হিসেবে রেখেছিলামতার কয়েকটি সন্তানও আছেএখন তার প্রতি আমার কর্তব্য কী? তিনি স. বললেন, বিবাহ ব্যতিরেকে কোনো রমণীকে রক্ষিতা রাখা যাবে নাএরকম রমণীর সন্তান্তসন্ততি হবে অবৈধবংশপরিচয় ও উত্তরাধিকারিত্ব থেকে তারা হবে বঞ্চিতআমার ধারণা, তোমরা আমার কথা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছোআমি আল্লাহ্‌ সকাশে আমার ও তোমাদের জন্য মার্জনা যাচনা করিরসুল স. ক্ষান্ত হলেনএরপর তাঁর নির্দেশে জনৈক ঘোষক ঘোষণা করলেন, কোনো মুসলমানের গৃহে প্রতিমা থাকতে পারবে নাযদি থাকে তবে সেগুলোকে ভেঙেচুরে নিক্ষেপ করতে হবে দূরে

জোহরের নামাজের সময় হলোহজরত বেলাল নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে কাবাগৃহের ছাদে উঠে আজান দিলেনকাবাপ্রাঙ্গণে উপবিষ্ট আবু সুফিয়ান, খালেদ ইবনে উসাইয়েদ ও হারেছ ইবনে হিশামের জাত্যাভিমান বিপর্যস্ত হলো তাদের মনেহলো, কালো মানুষের কাবাগৃহের ছাদে ওঠার অধিকার থাকবে কেনো? খালেদ ইবনে উসাইয়েদ বলেই ফেললো, আল্লাহ্‌ আমার পিতার সম্মান রক্ষা করেছেনএরকম অসহনীয় দৃশ্য দর্শনের পূর্বে তাঁকে তুলে নিয়েছেন পৃথিবী থেকেকেউ কেউ বললো, এখন বেঁচে থাকার আর কোনো অর্থ নেইহজরত আবু সুফিয়ান বললেন, আমি কোনো মন্তব্যই করবো নাবললেন এখানকার পাথরগুলোই একথা রাষ্ট্র করে দিবেহজরত জিবরাইল তাদের এমতো কথোপকথনের সংবাদ ঠিকই জানিয়ে দিলেন রসুল স.কেরসুল স. তাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, তোমরা যা কিছু বললে, তা আমাকে জানানো হয়েছেতোমরা তো বললে এই কথাগুলোঠিক বলিনি? আবু সুফিয়ান তার সাথীদেরকে বললেন, কী, আমি কি বলিনি, এখানকার পাথরগুলোও আমাদের কথা প্রচার করে দিবে? খালেদ ও হারেছ বললো, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি সত্যি সত্যিই আল্লাহ্‌র রসুল

হজরত আবু বকর সিদ্দীক তাঁর দৃষ্টিহীন পিতাকে হাত ধরে রসুল স. এর কাছে হাজির করলেনরসুল স. বললেন, আবু বকরতিনি তো বয়োবৃদ্ধতাঁকে এভাবে কষ্ট দিলে কেনো? আমি তো নিজেই তাঁর কাছে যেতে পারতামরসুল স. সস্নেহে তাঁর বুকে পিঠে হাত বুলালেনতিনিও অনায়াসে ইসলাম গ্রহণ করলেনতখন তাঁর মস্তক ও শ্মশ্রুর কেশরাজি হয়ে গিয়েছিলো ছাগামফূলের মতো শাদারসুল স. সেদিকে ইঙ্গিত করে বললেন, কালো রঙ ছাড়া অন্য যে কোনো রঙ দ্বারা রঙ পরিবর্তন করে দিয়ো

রসুল স. উপবেশন করলেন একটি উঁচু স্থানেঅপেক্ষাকৃত নিচু স্থানে বসলেন হজরত ওমর দলে দলে লোক এসে রসুল স. এবং হজরত ওমরের হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করতে লাগলোপুরুষদের পালা শেষ হলোএগিয়ে এলো মেয়েরাতাদের নিকট থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করা হলো তাদের হস্তস্পর্শ না করেই, কেবল মুখে মুখেমুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, হজরত আবু হোরায়রা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. সাফা পর্বতে আরোহণ করলেনকাবাগৃহের দিকে চেয়ে ভাবের আবেগে আপ্লুত হলেনহাত তুলে শুরু করলেন অন্তরঙ্গ প্রার্থনাপর্বতের সানুদেশে দণ্ডায়মান আনসার সাহাবীগণ সেই অপূর্ব মায়াভরা দৃশ্য দেখে এই ভেবে শংকিত হলেন যে, রসুল স. এর জন্মভূমির আকর্ষণ উত্তাল হয়ে উঠেছেএটাই তো স্বাভাবিকতিনি মনে হয় আমাদের সঙ্গে আর মদীনায় প্রত্যাবর্তন করবেন নাপ্রার্থনা শেষ হলোরসুল স. নিচে নেমে এসে মিলিত হলেন আনসারগণের সঙ্গেসম্বোধন করলেন, হে আনসার সম্প্রদায়! তাঁরা উচ্চকণ্ঠে জবাব দিলেন, হে মহানবী! এই যে আমরাতিনি স. বললেন, তোমরা তো এসকল কথা ভেবে শংকিত হয়েছিলে, না? তাঁরা স্বীকার করলেন, হে মহান রসুল! আপনি ঠিকই বলেছেনতিনি স. বললেন, নিশ্চয় তোমাদের আশংকা ভিত্তিহীনআমি তো আল্লাহ্‌র সনোষ কামনায় তোমাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছিতোমাদের ও আমার জীবন মরণ সব একাকার আনসারগণ কেঁদে ফেললেন

বললেন, হে আল্লাহ্‌র প্রিয়তম জন! আপনার প্রতি আমাদের উদগ্র ভালোবাসাই আমাদেরকে শংকাগ্রস্ত ও বিমর্ষ করে তুলেছিলোআমরা আমাদের অপভাবনার জন্য মার্জনাপ্রার্থীতিনি স. তাঁদের অজুহাত গ্রহণ করলেন

মক্কাবিজয়ের দিবসে রসুল স. তিন ব্যক্তির নিকট থেকে আর্থিক ঋণ গ্রহণ করে তা বণ্টন করে দিয়েছিলেন অস্বŽছল সাহাবীগণের মধ্যেসাফওয়ান ইবনে উয়াইনার নিকট থেকে নিয়েছিলেন পঞ্চাশ হাজার, আবদুল্লাহ্‌ ইবনে রবীয়ার নিকট থেকে চল্লিশ হাজার এবং হুয়াইতাব ইবনে আবদুল উজ্‌জার নিকট থেকে চল্লিশ হাজারএ সকল ঋণ তিনি পরিশোধ করেছিলেন হুনায়েন যুদ্ধের পররসুল স. সেদিন বলেছিলেন, আজকের দিনের পর মক্কার উপরে আর কোনো অভিযান পরিচালিত হবে নাহিজরতের প্রয়োজনও আজ থেকে শেষ হয়ে গেলো

আবু ইয়ালা ও আবু নাঈমের বর্ণনায় এসেছে, হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, মক্কাবিজয়ের পর শয়তান উচ্চস্বরে চীৎকার করে কাঁদতে শুরু করেতার সাঙ্গপাঙ্গরা এর কারণ জিজ্ঞেস করলে সে জবাবে বলে, আর কখনো আশা কোরো না যে, উম্মতে মোহাম্মদী শিরিকের দিকে ফিরে আসবেমাকহুল সূত্রে ইবনে আবী শায়বা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. যখন বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রবেশ করলেন, তখন ইবলিস তাঁর দিকে ছুঁড়ে মারতে লাগলো বিরাট বিরাট অগ্নিকুণ্ডহজরত জিবরাইল তৎক্ষণাৎ রসুল স.কে একটি দোয়া শিখিয়ে দিলেনদোয়াটি এরকম আঊজু বিকালিমাতিললাহিত্‌ তামমাতিল লাতী লা ইউজ্বাউইবু হুন্‌না বাররুউঁ ওয়ালা ফাজ্বির মিন শররি মা নাযালা মিনাস সাজা ওয়ামা ইয়ারুজ্বু ফীহা ওয়ামিন শাররি মা বাছ্‌ছা ফীল আরদ্ব ওয়ামা ইয়াখরুজ্বু মিনহা ওয়া মিন শাররিল লাইলি ওয়ান নাহার ওয়া মিন শাররি কুললি ত্বরিক ইয়াত্বরুকু বি খইর ইয়া রহমানইবনে আবী বাযযার সূত্রে বায়হাকী বর্ণনা করেছেন, মক্কাবিজয়ের দিন দেখা গেলো, বিদখুটে কদাকার এক হাবশী বৃদ্ধা তার নিজের মাথার চুল ছিঁড়ছে এবং চীৎকার করে কাঁদছেরসুল স.কে যখন তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো তখন তিনি স. বললেন, সে ছিলো পৌত্তলিক কুরায়েশদের আরাধ্য দেবীসে বলছে, তোমাদের শহরে আজ থেকে আমার উপাসনা হয়ে গেলো চিররুদ্ধ

সেদিন প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হলো আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে আদেশ করছেন, তোমাদের নিকটে রক্ষিত গচ্ছিত সম্পদ তার প্রাপককে ফিরিয়ে দাওরসুল স. তখন ওসমান ইবনে আবী তালহাকে ডেকে এনে তার হাতেই পুনঃ অর্পণ করলেন কাবা গৃহের চাবিবললেন, কিয়ামত পর্যন্ত এ চাবি রক্ষিত হতে থাকবে তোমার বংশধরের মধ্যেইজালেম ব্যতীত অন্য কেউ তোমাদের কাছ থেকে এ চাবি ছিনিয়ে নিতে পারবে নাচাবিবহনের এ মহান দায়িত্বের জন্য আল্লাহ্‌ তোমাদেরকেই মনোনীত করেছেনএই উপলক্ষে যা কিছু তোমাদের হস্তগত হবে, তা তোমাদের জন্য বৈধএরকমও বর্ণিত হয়েছে যে, হজরত জিবরাইল তখন বলেছিলেন, যতোদিন পর্যন্ত এ গৃহ স্থায়ী থাকবে, ততোদিন পর্যন্ত এ গৃহের তত্ত্বাবধায়নের দায়িত্ব পালন করবে ওসমান ও তাঁর বংশধরেরাউল্লেখ্য, হজরত ওসমান পরলোক গমনের প্রাক্কালে কাবাগৃহের চাবি হস্তান্তর করেন তাঁর ভাই হজরত শায়বার হাতেতাঁর বংশধরেরাই এ পর্যন্ত চাবি বহন করে আসছেনবহন করবেন মহাপ্রলয়কাল পর্যন্ত

বোখারীর বর্ণনায় এসেছে, রসুল স. মক্কায় অবস্থান করেছিলেন ঊনিশ দিনওই সময় তিনি নামাজ আদায় করতেন কসর হিসেবেআবু দাউদের বর্ণনায় এসেছে, তিনি স. তখন মক্কায় অবস্থান করেছিলেন সতেরো রাত এবং বোখারীর অপর বর্ণনায় এবং তিরমিজির বিবরণে বলা হয়েছে, তিনি স. তখন মক্কায় যাপন করেছিলেন আঠারো রাতএমতো বর্ণনাবৈষম্য নিরসনার্থে বলা যায়, আগমন ও প্রস্থানের দিন বিয়োগ করলে সতেরো রাতই হয়, আর যোগ করলে হয় ঊনিশ দিনআর প্রহর হিসেবে গণনা করলে হয় আঠারো

মক্কাবিজয়ের পর সমগ্র আরব স্তম্ভিত হয়ে গেলোলোকেরা বলাবলি করতে লাগলো, যে আল্লাহ্‌ আবরাহার হস্তিযুথকে ধ্বংস করে দিয়েছেন, সেই আল্লাহ্‌ই মোহাম্মদকে দান করলেন মহাবিজয়এখন তোমরাই বলো, তাঁর কর্তৃত্ব স্বীকার করা ছাড়া আমাদের গত্যন্তর আছে কি? সত্যি সত্যিই তিনি আল্লাহ্‌ কর্তৃক প্রেরিত রসুলএরকম কথাবার্তা ও সিদ্ধান্ত চলতে লাগলো বিভিন্ন গোত্র-উপগোত্রগুলোর মধ্যেশেষে সকলে একে একে দ্বিধাহীন চিত্তে এসে আশ্রয় গ্রহণ করতে লাগলো ইসলামের চির-সুশীতল ছায়ায়এই সুরার দ্বিতীয় আয়াতে সে কথাটিই বলে দেওয়া হয়েছে

বলা হয়েছে এবং তুমি মানুষকে দলে দলে আল্লাহ্‌র দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেইকরামা ও মুকাতিল বলেছেন, এখানে মানুষঅর্থ ইয়েমেনবাসীরসুল স. একবার বলেছিলেন, ইয়েমেনবাসীরা তোমাদের কাছে এসেছেএরা অতীব বিনম্র এবং ইমান গ্রহণের ক্ষেত্রে কোমল হৃদয়বিশিষ্টজ্ঞানের উৎপত্তি ইয়েমেন দেশেশোনো, উটের মালিকের কাছ থেকে প্রকাশ পায় উন্নাসিকতা ও আত্মম্ভরিতা এবং ছাগলের মালিকের নিকট থেকে প্রকাশ পায় সহিষ্ণুতা ও শিষ্টাচার

সূরা নাসর

রসুল স. রোজাদার ছিলেন। রোজা রেখেছিলেন সাহাবীগণও। সকলে ইফতার করলেন কাদীর নামক স্থানে পৌঁছে।

রসুল স.এর প্রিয় পিতৃব্য হজরত আব্বাস ছিলেন হাজীদের পানি পান করানোর দায়িত্বে। তিনি ওই সময় বেরিয়ে পড়েছিলেন মক্কা থেকে। উদ্দেশ্য ছিলো হিজরত। সৌভাগ্যবশত তিনি রসুল স. এর সাক্ষাত পেলেন জুহফা নামক স্থানে। তাঁর চাচাতো ভাই আবু সুফিয়ান ইবনে হারেছ এবং তাঁর পুত্র জাফর ইবনে আবু সুফিয়ান রসুল স. এর সঙ্গে মিলিত হলেন আবওয়ায়। তাঁরাও ইসলাম গ্রহণ করলেন। অপর এক বর্ণনায় এসেছে, আবু সুফিয়ান এবং আতেকার পুত্র আবদুল্লাহ্‌ ইবনে উমাইয়া আবওয়া নামক স্থানে রসুল স. এর সঙ্গে সাক্ষাত করলেন। তিনি স. তাদের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, ওদের কোনো প্রয়োজন আমার নেই। ওরা আমার সম্পর্কে অনেক অবান্তর কথা বলেছে। আমার মর্যাদাহানি করেছে। তাঁরা শরণ গ্রহণ করলেন উম্মতজননী উম্মে সালমার। জননী তাঁদের পক্ষে সুপারিশ করলেন। রসুল স. আর তাঁদেরকে প্রত্যাখ্যান করলেন না।


কাদীরে পৌঁছেই যুদ্ধের পতাকা উড্ডীন করবার আদেশ দিলেন রসুল স.। পতাকা ভাগ করে দিলেন বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে। তাঁর ব্যক্তিগত দলের পতাকাবাহী হলেন হজরত যোবায়ের। এরপর যাত্রা শুরু করলেন। ইশার নামাজের সময় পৌঁছে গেলেন মাররুজ জাহরান নামক স্থানে। তখন পর্যন্ত কুরায়েশরা রসুল স. এর অভিযান সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেনি। ওই রাতেই আবু সুফিয়ান ইবনে হারব, হাকীম ইবনে হাযাম এবং বুদাইল ইবনে ওয়ারাকা গোপনে সংবাদ সংগ্রহের জন্য মক্কা থেকে বের হলো। রসুল স. তাঁর সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে অগ্নিকুণ্ড প্রজ্জ্বলিত করার আদেশ দিলেন। আদেশ প্রতিপালিত হলো। এক সঙ্গে আগুন জ্বলে উঠলো প্রায় দশ হাজার স্থানে। হজরত আব্বাস আপন মনে বলে উঠলেন, এই রাত্রিশেষের ভোর হবে কুরায়েশদের জন্য অত্যন্ত অশুভ। আল্লাহ্‌র শপথ! আজ যদি মোহাম্মদ মহাপ্রতাপের সঙ্গে মক্কায় প্রবেশ করে, তবে কুরায়েশদের দাপট নিভে যাবে চিরতরে। এরপর তিনি একটি খচ্চরের পিঠে চড়ে সম্মুখের দিকে অগ্রসর হলেন এই উদ্দেশ্যে যে, যদি মক্কার দিকে গমনকারী কোনো জ্বালানী সংগ্রহকারী, দুগ্ধ বিতরণকারী, অথবা অন্য কোনো পথিকের মাধ্যমে কুরায়েশদেরকে এই সংবাদটি পৌঁছে দেওয়া যায় যে, বাঁচতে যদি চাও, তবে আল্লাহ্‌র রসুলের নিকট উপস্থিত হয়ে নিরাপত্তাপ্রার্থী হও। কিছুদূর অগ্রসর হতেই তিনি আবু সুফিয়ানের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন। তিনি বলছিলেন, আল্লাহ্‌র শপথ! আজ রাতের মতো আলোর মেলা আমি জীবনে দেখিনি। হজরত আব্বাস তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, শোনো আবু সুফিয়ান! মোহাম্মদ তাঁর বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে এসেছেন। তাঁকে প্রতিহত করা অসম্ভব। আবু সুফিয়ান বললেন, তাহলে উপায়? হজরত আব্বাস বললেন, তুমি যদি ধরা পড়ো, তবে নিশ্চয় তোমার মস্তক ছেদন করা হবে। তার চেয়ে আমার বাহনে উঠে পড়ো। আমি তোমাকে তাঁর কাছে পৌঁছে দেই। তুমি তাঁর কাছে নিরাপত্তা ভিক্ষা করো। আবু সুফিয়ান তাঁর প্রস্তাবে সম্মত হলেন। রসুল স. এর কাছে পৌঁছার আগেই তাঁরা ধরে পড়ে গেলেন হজরত ওমরের চোখে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, আরে, আরে, এতো দেখছি আল্লাহ্‌র দুশমন। বিনা চেষ্টায় এসে গ্যাছে আমাদের দখলে। একথা বলেই তিনি আবু সুফিয়ানকে আঘাত করার জন্য ছুটে এলেন। তার আগেই হজরত আব্বাস তাঁকে নিয়ে দ্রুত উপস্থিত হলেন রসুল স. সকাশে। রসুল স. তাঁর কথা শুনে বললেন, আজ রাতের জন্য আপনি তাঁকে আপনার সঙ্গেই রাখুন।

সকাল হলো। হজরত আব্বাস আবু সুফিয়ানকে নিয়ে উপস্থিত হলেন রসুল স. এর মহান সান্নিধ্যে। রসুল স. বললেন, হে কুরায়েশ গোত্রপতি! এখনো কি লা ইলাহা ইল্লাল্লহ্‌ মোহাম্মাদুর রসুলুল্লহ্‌ কলেমায় বিশ্বাসী হবার সময় আসেনি? আবু সুফিয়ান বললেন, আমার পিতামাতা আপনার উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত হোক। আপনি সহিষ্ণু, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী। আল্লাহ্‌র শপথ! আমার ধারণা, দ্বিতীয় কোনো আল্লাহ্‌র অস্তিত্ব যদি থাকতো, তবে তুমিই হতে সেই আল্লাহ্‌। রসুল স. বললেন, আমি যে আল্লাহ্‌র রসুল, এ বিষয়ে তোমার হৃদয়ে এখনো কি প্রতীতি জন্মেনি? আবু সুফিয়ান বললো, না। এখনো আমার মনে রয়ে গেছে কিছুটা খটকা। হজরত আব্বাস বললেন, আরে অবুঝ! ইসলাম গ্রহণ করো। মস্তক ছেদিত হওয়ার আগেই বলো লা ইলাহা ইল্লাল্লহ্‌ মুহাম্মাদুর রসুলুল্লহ্‌। আবু সুফিয়ান আর কথা বাড়ালেন না। পবিত্র কলেমা উচ্চারণ করলেন উদাত্ত কণ্ঠে। হজরত বুদাইল ও হাকীম তো ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এর আগেই।

তিবরানী লিখেছেন, রসুল স. তখন বলেছিলেন, হে আল্লাহ্‌র বান্দাগণ! আবু সুফিয়ান ওই পিলু গাছের আড়ালেই আছে। তাকে বন্দী করে আনো। ইবনে আবী শায়বা বর্ণনা করেছেন, আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীদেরকে বন্দী করেছিলেন রসুল স. এর দেহরক্ষীগণ। আর সেদিন তাঁর দেহরক্ষীগণের প্রধান ব্যবস্থাপক ছিলেন হজরত ওমর। তাঁর বর্ণনায় আরো এসেছে, আবু সুফিয়ান তখন বলেছিলেন, আব্বাস কোথায়? আর এক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, আবু সুফিয়ানকে যখন রসুল স. এর কাছে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো, তখন তাঁর সাথে হজরত আব্বাসও ছিলেন। রসুল স. তখন ঘোষণা দিয়েছিলেন, ওই ব্যক্তিদেরকে নিরাপত্তা দেওয়া হলো, যারা আশ্রয় গ্রহণ করবে কাবাপ্রাঙ্গণে, আবু সুফিয়ানের গৃহে, অথবা নিজ নিজ বাড়িতে। আবু সুফিয়ান মক্কায় পৌঁছে ঘোষণা করেছিলেন, হে কুরায়েশ জনতা! আজ মোহাম্মদ এমন একটি শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে আগমন করেছেন, যার অগ্রযাত্রা প্রতিহত করার সাধ্য তোমাদের নেই। সুতরাং তোমরা তাঁর ঘোষিত নিরাপত্তা গ্রহণ করো। আশ্রয় নাও কাবাপ্রাঙ্গণে, আমার বাড়িতে, অথবা নিজ নিজ ঘরে। লোকজন সেরকমই করলো।

হাকীম ইবনে হাযাম এবং বুদাইল ইবনে ওয়ারাকা রসুল স. এর পবিত্র হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করলেন। রসুল স. তাঁদেরকে আহবায়করূপে প্রেরণ করলেন কুরায়েশদের কাছে। তাঁরা মক্কায় উপনীত হলেন। এরপর তিনি স. মুহাজির ও আনসার বাহিনীর সৈনাপত্যের দায়িত্ব দিলেন হজরত যোবায়েরকে। নির্দেশ দিলেন, মক্কার উজানে হাজ্জন নামক স্থানে পৌঁছে পতাকা উত্তোলন কোরো। পুনরাদেশপ্রাপ্তির পূর্বে স্থানত্যাগ কোরো না। তিনি পতাকা হাতে অগ্রসর হলেন। ওই হাজ্জন এলাকা দিয়েই রসুল স. মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন। সেখানে তাঁর জন্য নির্মাণ করা হয়েছিলো তাঁবু। তিনি স. তখন হজরত খালেদ ইবনে ওলীদকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তুমি বনী খাজাআ ও বনী সুলাইমকে নিয়ে প্রবেশ কোরো মক্কার ভাটি এলাকা দিয়ে। কুরায়েশ এবং আবদে মানাফের বংশদ্ভূতরা ইতোপূর্বে বনী বকরকে ভাটি অঞ্চলের দিকে তাড়িয়ে দিয়েছিলো। সেজন্যই রসুল স. হজরত খালেদকে ভাটির দিক থেকে অগ্রাভিযান শুরু করতে বলেছিলেন। আরো বলেছিলেন, যদি তোমাদের বিরুদ্ধে কেউ লড়তে না আসে, তবে তোমরাও লড়াই কোরো না।

রসুল স. তখন হজরত সা’দ ইবনে উবাদার হাতেও নিশান তুলে দিয়েছিলেন। তিনি স. কিছুসংখ্যক সৈন্য নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন কাদার পথ দিয়ে। প্রবেশ কালে জনতার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আজ লড়াইয়ের দিন। আজ নিষিদ্ধতা বৈধ (আজ রক্তপাতের নিষিদ্ধতা স্থগিত)। জনৈক মুহাজির একথা শুনে বললেন, হে আল্লাহ্‌র রসুল! শুনুন, সা’দ কী বলছে? সে তো কুরায়েশদের উদ্দেশ্যে এরকম বলতে পারে না। রসুল স. তখন হজরত আলীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ঠিক আছে। পতাকা উত্তোলন করো তুমি। অগ্রসর হও কাদার পথ দিয়ে। হজরত আলী তাই করলেন। তারপর তাঁর পতাকা উড্ডীন করলেন কাবাপ্রাঙ্গণের রুকনে ইয়েমেনে।

আবু ইয়ালা বর্ণনা করেছেন, হজরত যোবায়ের বর্ণনা করেন, রসুল স. তখন ঝাণ্ডা তুলে দিয়েছিলেন আমার হাতে। আর তিনি স. মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন দু’টি ঝাণ্ডা নিয়ে। আলী আমার আগে মক্কার চড়াই অঞ্চলে পৌঁছুতে পারেননি। আর নিম্নাঞ্চল দিয়ে প্রবেশকালে খালেদ সম্মুখীন হয়েছিলেন প্রচণ্ড প্রতিবন্ধকতার। কুরায়েশ ও অন্যান্য অংশীবাদী গোত্রের লোকেরা তাঁর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। তিনিও তাদের উপরে আক্রমণ পরিচালনা করেছিলেন বীর বিক্রমে। ওই সংঘর্ষে নিহত হয় কুরায়েশদের চব্বিশ জন এবং হুজাইল গোত্রের চার জন। ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, ওই সংঘর্ষে নিহত হয়েছিলো বারো অথবা তেরো জন। এর পরেই অংশীবাদীরা পরাভব স্বীকার করে। কেউ কেউ পালিয়ে যায়। তখন মুসলমানদের মধ্যে শহীদ হয়েছিলেন জুহাইনা গোত্রের হজরত সালমা ইবনে খাইলা, হজরত ইবনে জাবের ফেহরী এবং হজরত হারীশ ইবনে খালেদ। অবশ্য রসুল স. তাঁর সকল সেনানায়ককে নির্দেশ দিয়েছিলেন, মক্কায় প্রবেশকালে কাউকে হত্যা করা যাবে না। তবে কেউ আক্রমণ করলে কেবল তাকে হত্যা করা যাবে। আবার তিনি স. নির্দিষ্ট করে কয়েকজনের নাম উচ্চারণ করে বলেছিলেন, ওদেরকে কোনোক্রমে রেহাই দেওয়া যাবে না, তারা যদি কাবাগৃহের গেলাফের নিচেও আশ্রয় নেয়, তবুও। তাদের নামঃ ১. আবদুল্লাহ্‌ ইবনে আবী সাররাহ্‌। সে মুসলমান হওয়ার পরে ধর্মত্যাগ করেছিলো। মক্কাবিজয়ের দিবসে হজরত ওসমানের সুপারিশে তাকে রেহাই দেওয়া হয়। এরপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ২. ইকরামা ইবনে আবু জেহেল। মক্কাবিজয়ের দিন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ৩. হুয়াইরিছ ইবনে নকীদ। হিজরতের পূর্বে সে মুসলমানদেরকে খুবই কষ্ট দিয়েছিলো। তাকে হত্যা করেছিলেন হজরত আলী। ৪. হাকীম ইবনে সাবাবা। সে মুসলমানও হয়েছিলো। জি-কারার যুদ্ধে জনৈক আনসারী ভুলক্রমে শত্রুসেনা মনে করে হত্যা করেছিলেন তার ভাইকে। ওই মান্যবর আনসারী থেকে সে রক্তপণ আদায় করেছিলো। তারপর সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করে তাঁকেই আবার হত্যা করে সে ধর্মত্যাগী হয়ে যায়। তাকে হত্যা করে তার নিজের সম্প্রদায়ের গাইলা ইবনে আবদুল্লাহ্‌। ৫. হুব্বার ইবনে আসওয়াদ, খুবই নিষ্ঠুর চরিত্রের লোক ছিলো সে। মুসলমানদেরকে সে অত্যাচারে অত্যাচারে অতিষ্ঠ করে তুলতো। রসুল স. এর প্রিয় পুত্রী হজরত জয়নাবকে সে এমন আঘাত করেছিলো যে, এতে তাঁর গর্ভপাত ঘটে। ওই আঘাতজনিত রোগেই তিনি পরলোকগমন করেন। মক্কারবিজয়ের দিন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। রসুল স. তাঁকে মার্জনা করেন। ৬. হারেছ ইবনে তিল্লাল খাজায়ী। তাকে হত্যা করেছিলেন হজরত আলী। ৭. কবি কা’ব ইবনে জুহাইর। সে রসুল স.কে অপবাদ দিয়ে কবিতা রচনা করতো। মক্কাবিজয়ের দিন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রসুল স. এর প্রশংসায় রচনা করেন অনবদ্য কবিতা। ৮. ওয়াহশী ইবনে হারব। তিনি ছিলেন রসুল স. এর প্রিয় খুল্লতাত শহীদশ্রেষ্ঠ হজরত হামযার হত্যাকারী। মক্কাবিজয়ের দিন তিনি তায়েফে পালিয়ে গিয়েছিলেন। পরে তায়েফ থেকে ফিরে আসেন এবং আশ্রয় গ্রহণ করেন ইসলামের চিরনিরাপত্তা ও শান্তির ছায়ায়। ৯. আবদুল্লাহ্‌ ইবনে হানযাল। প্রথমে তার নাম ছিলো আবদুল উজ্‌জা। ইসলাম গ্রহণের পর রসুল স. তাঁর নাম রাখেন আবদুল্লাহ্‌। একবার রসুল স. তাকে জাকাত সংগ্রাহকরূপে এক স্থানে পাঠালেন। সহযোগীরূপে সঙ্গে দিলেন হজরত আবদুল্লাহ্‌ খাজায়ীকে। তিনি ছিলেন পাচক। পথিমধ্যে উভয়ে এক সরাইখানায় যাত্রাবিরতি করলেন। একদিন দুপুর বেলা জাকাতসংগ্রাহক আবদুল্লাহ্‌ পাচক হজরত আবদুল্লাহ্‌কে বললো একটা কিছু জবাই করে তার গোশত রান্না করো। কিন্তু পাচক হজরত আবদুল্লাহ্‌ তাঁর নির্দেশ পালনে আলস্য করলেন। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে সে তাঁকে হত্যা করলো। আর পালিয়ে গেলো ধর্মত্যাগী হয়ে। তার সঙ্গে থাকতো দু’জন নৃত্যগীতপটিয়সী ক্রীতদাসী। তারা তাদের গানের মাধ্যমে রসুল স. এর কুৎসা রটনা করতো। মক্কাবিজয়ের দিবসে রসুল স. মুরতাদ আবদুল্লাহ্‌ এবং ওই ক্রীতদাসীদ্বয়কে হত্যার নির্দেশ দেন। হজরত সাঈদ ইবনে হারেছ মাখজুমী ও হজরত আবু বারযাহ্‌ আসলামী ওই মুরতাদ ও তার একজন ক্রীতদাসীকে হত্যা করতে সমর্থ হন। অপর ক্রীতদাসী যায় পালিয়ে। পরে সে ইসলাম গ্রহণ করে। ১০. আমর ইবনে হাশেমের মুক্তকৃতা ক্রীতদাসী সারা। সে ছিলো মক্কার প্রসিদ্ধ গায়িকা। তার কাছ থেকেই উদ্ধার করা হয়েছিলো হজরত হাতেব ইবনে আবী বালতার চিঠি। মক্কাবিজয়ের পর সে মুসলমান হয়ে গিয়েছিলো। ১১. হজরত আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা। সে উহুদ যুদ্ধে চর্বণ করেছিলো রসুল স. এর প্রিয় পিতৃব্য শহীদশ্রেষ্ঠ হজরত হামযার কলিজা। রসুল স. তাঁকে মার্জনা করেছিলেন। ১২. সাফওয়ান ইবনে উমায়ইয়া। মক্কাবিজয়ের দিন সে জেদ্দায় পালিয়ে গিয়েছিলো। ভেবেছিলো, সে হয়তো সেখান থেকে কোনো জাহাজযোগে ইয়েমেনের দিকে পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করতে সক্ষম হবে। রসুল স. তাকে নিরাপত্তা দেন হজরত উমাইর ইবনে ওয়াহাবের সুপারিশে। তাই সে জেদ্দা থেকে ফিরে আসে এবং ইসলাম গ্রহণের বিষয়ে চিন্তাভাবনার জন্য অবকাশ প্রার্থনা করে দুই মাসের। রসুল স. তাকে চার মাসের অবকাশ দেন। পরে তিনি মুসলমান হয়ে যান।




ইমাম আহমদ ও তিরমিজির বর্ণনায় এসেছে, রসুল স. মক্কায় প্রবেশ করেন পাগড়ীপরিহিত অবস্থায়। বোখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, তখন তাঁর পবিত্র মস্তকে শোভা পাচ্ছিলো শিরোস্ত্রাণ। পরে পাগড়ী। প্রবেশকালে তিনি স. বার বার আবৃত্তি করেন সুরা নাসর। পরিশেষে রসুল স. হাজ্জন নামক স্থানে তাঁর জন্য নির্মিত তাঁবুতে অবস্থান গ্রহণ করলেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর দুই মহাপুণ্যবতী সহধর্মিণীঃ হজরত উম্মে সালমা ও হজরত মায়মুনা। জনৈক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, হে মহাবিজয়ী! আপনি কি আপনার পৈত্রিক নিবাসে উঠবেন না? তিনি স. বললেন, আকীল কি সে সুযোগ রেখেছে? কোথায় গিয়ে উঠবো? উল্লেখ্য, আকীল রসুল স. এর পিতৃপুরুষদের বাড়িঘর বিক্রি করে দিয়েছিলো। জনৈক সাহাবী বললেন, হে মহাবাণীবাহক! সেখানে তো অনেকেরই বাড়িঘর রয়েছে। আপনি তো যে কোনো বাড়িতে গিয়ে উঠতে পারেন। তিনি স. বললেন, না। আমি কারো বাড়িতেই উঠবো না। তাই হলো। রসুল স. তাঁর তাঁবুতেই অবস্থান করতে লাগলেন। নামাজের সময় সেখান থেকেই তিনি স. উপস্থিত হতেন কাবা গৃহে। প্রথম দিন তিনি স. তাঁর তাঁবুতে কিছুক্ষণ বিশ্রামগ্রহণের পর স্নান করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। পানি সংগ্রহ করা হলো। তাঁর প্রিয় পুত্রী হজরত ফাতেমা পর্দার ব্যবস্থা করলেন। স্নান সমাপনের পর তিনি স. পাঠ করলেন আট রাকাত চাশতের নামাজ। মুসলিম।

বোখারীর বর্ণনায় এসেছে, তাঁর চাচাতো বোন হজরত উম্মে হানী বলেছেন, তিনি স. সেদিন স্নান করেছিলেন আমার গৃহে এসে। এরপর নামাজ পাঠ করে তিনি স. উটের পিঠে চড়ে গমন করেন কাবাপ্রাঙ্গণে এবং উষ্ট্রারোহী অবস্থাতেই যষ্টি দ্বারা হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করে তাতে চুম্বন দান করেন। উচ্চারণ করেন তকবীরধ্বনি। সাথে সাথে তার প্রতিধ্বনি ওঠে তাঁর সহচরবর্গের কণ্ঠে। তিনি স. সাতবার কাবাগৃহ প্রদক্ষিণ করেন। প্রদক্ষিণ করেন তাঁর সহচরবৃন্দও। প্রতিবারেই তিনি স. হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করেন তাঁর যষ্টি দ্বারা। কাবাপ্রাঙ্গণে তখন প্রতিষ্ঠিত ছিলো ক্ষুদ্র-বৃহৎ তিন শত ষাটটি প্রতিমা। তিনি সেগুলোকে আঘাত করেন যষ্টি দ্বারা। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিমাগুলো হয়ে পড়ে ছিন্ন-ভিন্ন এবং ভূতলশায়ী। তাঁর পবিত্র কণ্ঠে তখন বার বার উচ্চারিত হতে থাকে ‘জ্বাআল হাক্বক্বু ওয়া যাহাক্বাল বাতিল’ (সত্য সমাগত, মিথ্যা তিরোহিত)। রসুল স. এর যষ্টির আঘাত ছাড়াই তখন অনেক প্রতিমা ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়ে। ফুজালা ইবনে ওমর লাইছি মনে মনে ইচ্ছা করে, তাওয়াফরত অবস্থাতেই সে রসুল স.কে হত্যা করবে। ধীরে ধীরে ভিড় ঠেলে পৌঁছে গেলো তাঁর কাছে। তিনি স. ডাকলেন, ফুজালা! সে জবাব দিলো, এই যে আমি। তিনি স. জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মন কী বলছে? সে বললো, তেমন কিছু না। আমি তো আল্লাহ্‌র নাম স্মরণ করছি। তার কথায় রসুল স. মৃদু হাসলেন। বললেন, লজ্জিত হও। আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করো। তিনি স. ফুজালাকে আরো কাছে ডেকে এনে তাঁর পবিত্র হস্ত স্থাপন করলেন তাঁর বক্ষদেশে। পরে হজরত ফুজালা নিজেই বর্ণনা করেছেন, রসুল স. তাঁর পবিত্র হস্ত আমার উপর থেকে উঠিয়ে নেওয়ার আগেই আমি গভীর বিস্ময়ের সঙ্গে অনুভব করলাম, এখন তিনি স.ই আমার সর্বাপেক্ষা প্রিয়তম জন। অংশীবাদীরা পর্বত শিখর থেকে এসবকিছুই চাক্ষুষ করেছিলো।

তাওয়াফ পর্ব সমাপ্ত হলো। চতুষ্পার্শ্বে তখনও প্রচণ্ড ভীড়। রসুল স. তাঁর উট থেকে অবতরণ করলেন। উটটিকে কোথাও বসানোর স্থান পাওয়া গেলো না। তাই সেটিকে রেখে আসা হলো কাবা চত্বরের সীমানার বাইরে। রসুল স. মাকামে ইব্রাহিমে উপস্থিত হলেন। তখন তার মাথায় ছিলো উষ্ণীষ। তিনি স. সেখানে দুই রাকাত নামাজ পাঠ করলেন। গেলেন জমজম কূপের পাশে। কূপের ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখে বললেন, যদি আবদুল মুত্তালিবের গোষ্ঠীর জন্য এটা গর্বের বিষয় না হতো, তবে আমি আজ নিজ হাতে এক ডোল পানি উত্তোলন করতাম। এক ডোল পানি উত্তোলন করলেন হজরত আব্বাস, অথবা হারেছ ইবনে আবদুল মুত্তালিব। রসুল স. পান করলেন পবিত্র জমজমের জল। বাদবাকীটুকু দিয়ে সামাধা করলেন ওজু। ওজুর ব্যবহৃত জলাহরণের জন্য সাহাবীগণের মধ্যে লেগে গেলো ঠেলাঠেলি, প্রতিযোগিতা। যারা সে জলের অংশ পেলেন, তারা তা সঙ্গে সঙ্গে মেখে নিলেন নিজেদের মাথায়, চোখে-মুখে-শরীরে। কুরায়েশেরা এমতো অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে বিস্ময়াভিভূত হয়ে গেলো। বলতে লাগলো, আমরা কোনো রাজাকেও এরকম সম্মান পেতে দেখিনি। শুনিওনি। হোবল ছিলো পৌত্তলিকদের সর্ববৃহৎ প্রতিমা। প্রতিমাটি ছিলো কাবাগৃহের সামনের দিকে প্রধান ফটকের কাছে। রসুল স. এর নির্দেশে সেটিকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়া হলো।

হজরত আলী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. কাবাগৃহের ছাদে উঠলেন। আমাকেও বললেন, ওঠো। উঠলাম। ছাদের উপরে ছিলো আর একটি বড় প্রতিমা। আমি সেটিকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিচে ফেলে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো প্রতিমাটি। রসুল স. উদাত্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করলন ‘সত্য সমাগত, অসত্য তিরোহিত। অসত্যের তিরোহিতি তো অবধারিত’।